বর্ধমানে তৃণমূল কর্মী খুনে অভিযুক্তকে সমাজসেবী বললেন মন্ত্রী ও বিধায়ক! ক্ষুব্ধ নিহতের পরিবার
দলীয় কর্মী খুনে অভিযুক্ত তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল রবকে নাকি খুঁজছে পুলিশ। অথচ খুনের ঘটনার পর কয়েকদিন আত্মগোপন করে থাকলেও এখনও তিনি বহাল তবিয়তেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন শহরে। সম্প্রতি তাঁকে দেখা গিয়েছিল বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক খোকন দাসের সঙ্গে। এবার একধাপ এগিয়ে তিনি শুধু মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিতই রইলেন না, পেলেন সমাজসেবী তকমা! খুনের ঘটনায় তাই স্বাভাবিকভাবেই যোগ হল প্রভাবশালী তত্ত্ব।

দলীয় কর্মী খুনে অভিযুক্ত 'সমাজসেবী'!
মন্ত্রী, বিধায়কের সঙ্গে দলীয় কর্মী খুনে অভিযুক্ত একই মঞ্চে থাকায় ফের চাঞ্চল্য পড়েছে বর্ধমানে। বর্ধমান পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগের ঘটনাই সামনে এনেছিল তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল। পুর প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য আইনুল হককে অপসারণের দাবিতে তৃণমূলেরই একাংশ পুরসভা ঘেরাও থেকে শুরু করে টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধও করেছিল। সিপিআইএম জমানায় আইনুল হকের জন্য অনেক কর্মীকে খুন বা অত্যাচারিত হতে হয়েছিল, তাই তাঁকে এখন মানা সম্ভব নয় বলে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন দলের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা বিধায়ক খোকন দাস-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত আব্দুল রব। আইনুল হক বলেছিলেন, তাঁকে দলে নিয়েছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন। এর বেশি কিছু বলব না। পুরসভায় রদবদলের পর বর্ধমান শহরে আইনুল হকের পক্ষে ও বিপক্ষে মিছিল বের হয়। আইনুল বিরোধী শিবিরকে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক খোকন দাসের বিরুদ্ধে। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সম্প্রতি তৃণমূলেরই একাংশ দলের অপর অংশের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করে। যাতে খালাসিপাড়ার অশোক মাঝি নামে এক দলীয় কর্মীর মৃত্যু হয়। খোকন দাস, আব্দুল রব, শিবশংকর ঘোষদের পরিকল্পনাতেই হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী কাউন্সিলর মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেছিলেন, পুরসভা থেকে ফেরার পথে খালাসিপাড়া এলাকায় অতর্কিতে তাঁর উপর ৫০-৬০ জন সশস্ত্র অবস্থায় হামলা চালায়। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন দলীয় কর্মী অশোক মাঝি ও তাঁর স্ত্রী চন্দনা মাঝি। তাঁদেরও বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অশোক পরে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে মারা যান। হামলাকারীরা খোকন দাস, শিবশংকর ঘোষ, আব্দুল রব, ইফতিকার আহমেদদের অনুগামী বলে পরিচিত। পুলিশ ঘটনার তদন্তে নেমে শিবশংকর-সহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। ইফতিকারের খোঁজ মিলছে না। আব্দুল রব কয়েকদিন আত্মগোপনের পর প্রকাশ্যে এসে বিধায়ক আর মন্ত্রীর সঙ্গে স্টেজ শেয়ার করছেন!

পুলিশ সন্ধান না পেলেও বুক ফুলিয়ে রব
গতকাল বর্ধমানে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ, বিধায়ক খোকন দাস, জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি দেবু টুডু, জেলা পরিষদের মেন্টর উজ্জ্বল প্রামাণিক। সেই মঞ্চেই বেশ কয়েকজন প্রোমোটারের সঙ্গে ছিলেন দলীয় কর্মী খুনে অভিযুক্ত আব্দুল রব। বর্ধমানে প্রোমোটার-রাজে শাসক দলের কিছু নেতা মদত দেন বলে অভিযোগ বিরোধীদের। সেই মঞ্চেই নারু ভকত-সহ কয়েকজন প্রোমোটারের সঙ্গে আব্দুল রবকেও সমাজসেবী বলে আখ্যায়িত করেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ ও বিধায়ক খোকন দাস। দলের কর্মী খুনের ঘটনার পর কিছুদিন প্রকাশ্যে না এলেও তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দলের পতাকা তুলে ভাষণ দিতে দেখা গিয়েছিল আব্দুল রবকে। একটি রক্তদান শিবিরে তিনি হাজির ছিলেন বিধায়কের সঙ্গে। এবার মন্ত্রীর সঙ্গে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নিহত তৃণমূল কর্মীর পরিবার ও তৃণমূলের একাংশ মনে করছেন, দলের কর্মী খুনে অভিযুক্ত জেলায় দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল রব যে মন্ত্রী ও বিধায়কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছেন তা তদন্তে না প্রভাব ফেলে। যেখানে পুলিশ রবের সন্ধান পাচ্ছে না বলে দাবি করছে সেখানে তিনি শহরেই অনুষ্ঠানে থাকছেন, গোটা বিষয়টি তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সন্দেহ জাগানোর পক্ষেও যথেষ্ট। একই অভিযোগে শিবশংকর ঘোষ গ্রেফতার, বেপাত্তা ইফতিকার, আর বহাল তবিয়তে রব, এই ঘটনা পরম্পরা নিয়ে তৃণমূলের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে, বিশেষ করে যাঁদের উপর হামলা হয়েছিল।

খোঁজ নেবে তৃণমূল
এ ব্যাপারে তৃণমূলের জেলা মুখপাত্র প্রসেনজিৎ দাস বলেন, পুলিশ পুলিশের মতো কাজ করছে। কে দোষী, কে অভিযুক্ত, কাকে ধরতে হবে এটা পুলিশেরই কাজ। আমাদেরই নিহত কর্মীর পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আরও কাউকে গ্রেফতার করতে হলে সেটা পুলিশই ঠিক করবে। কারণ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ। আইন আইনের পথে চলবে। পুলিশ এখানে স্বাধীনভাবে কাজ করে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সিবিআইকে নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলায় তেমন কিছু হয় না। ফলে পুলিশই এই মার্ডার কেসে যাকে ধরার মনে করেছে ধরেছে, যাদের ধরতে হবে বলে মনে করবে ধরবে। আমি বর্ধমানে নেই। সেখানে কী ঘটেছে জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখে পরে বলতে পারব। জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের আশ্বাস, দলীয় কর্মী খুনে দোষীদের যথাযোগ্য শাস্তিই হবে। যদিও এমন আশঙ্কাও থাকছে দলের কর্মী খুনে অভিযুক্তকে পাশে নিয়ে বিধায়ক বা মন্ত্রী কি তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টাই করছেন না? উত্তর দেবে সময়। উদ্বেগ নিয়েই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ন্যায়বিচারই প্রত্যাশা করছে নিহত দলীয় কর্মীর পরিবার।
{quiz_683}












Click it and Unblock the Notifications