মমতা বিজেপির শহীদ শ্রদ্ধায় খেপছেন কেন? ২১ জুলাই আপনিও তো করেছেন একই কাণ্ড
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবে দেখছিলেন বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার সময়ে নয়াদিল্লিতে থাকা যায় কি না।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবে দেখছিলেন বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার সময়ে নয়াদিল্লিতে থাকা যায় কি না। কিন্তু আঠাশ তারিখে ইতিবাচক কথা বললেও ঊনত্রিশ তারিখে তিনি ফের বেঁকে বসে মোদী সরকারের বিরোধিতা করলেন। কারণ? বাংলার রাজনৈতিক হিংসায় ৫৪জন বিজেপি কর্মীর পরিবারকে মোদীর শপথগ্রহণে আমন্ত্রণ করেছে গেরুয়া বাহিনী। এই খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে মমতা টুইট করে বিজেপিকে নাম না করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং বলেন যে তিনি দিল্লি যাচ্ছেন না গণতন্ত্রের উৎসবে যোগ দিতে।
মমতার বক্তব্য, বাংলায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যে এবং যেই মৃত্যুগুলির কথা বিজেপি বলছে, সেগুলি হয়েছে ব্যক্তিগত রোষ বা পারিবারিক কলহের দোষে; রাজনৈতিক হত্যার কথা একেবারেই ভুল। স্বভাবতই, একই মঞ্চে 'শহীদ'দের পরিবার এবং মমতার উপস্থিতি তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমোর পক্ষে যথেষ্ট অস্বস্তিদায়ক হত।

এই একই কৌশলে এক সময়ে তৃণমূল বাম ও কংগ্রেসকে নাজেহাল করেছে
দলে দলে তৃণমূলের গড় ভেঙে বিজেপিতে যোগদান এবং এখন বাংলার রাজনৈতিক হিংসার বলিদের পরিবারকে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্যে যে গেরুয়া শিবিরের এক প্রচ্ছন্ন পরিকল্পনা রয়েছে, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সত্যি বলতে, একসময়ে তৃণমূল কংগ্রেস খোদ এই কৌশলগুলির মধ্যে দিয়ে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসকে জেরবার করার উদ্যোগ নিয়েছে। আর আজ, বিজেপিও ঠিক সেই পন্থাই নিয়েছে। একুশে জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাম আমলে পুলিশের গুলিতে মৃত কংগ্রেস কর্মীদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিন তৈরী করেন এবং পরে সেটিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার করেন বাম ও কংগ্রেস দুইয়ের বিরুদ্ধেই। আজ ৩০ মে তৃণমূলের সেই রাজনীতির পাল্টা জবাব দিচ্ছে বিজেপি।
নির্বাচনে হার-জিৎ রয়েছেই। কিন্তু এবারের লোকসভা নির্বাচনের পরে যেভাবে তৃণমূলের ঘর ভাঙছে, তাতে একটি বিশেষত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউই আর দলের কথা ভাবছেন না; এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের মতে জাহাজ টলমল করে উঠলে 'ইঁদুর'রা সব জলে ঝাঁপাচ্ছে এবং তারা সেখানে ডুবেই মরবে। আদর্শের রাজনীতি এই দলছুটরা করছেন না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

ইঁদুর-টিদুর বলে লাভ নেই; তৃণমূলের আদর্শের রাজনীতি ঠিক হলে এটাও ঠিক
ফিরহাদবাবুর এই মন্তব্যটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দলছুটদের দলে নিয়ে রাজনীতি করা যদি আদর্শের রাজনীতি না হয়, তবে সে আদর্শের রাজনীতি তৃণমূলও অতীতে করেনি। বাম কিংবা কংগ্রেস থেকে দাপুটে নেতারা তৃণমূলে এসে সাংসদ-বিধায়ক হয়েছেন অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে। দলের নিচুতলার একনিষ্ঠ কর্মীরা দলের সংগঠন পোক্ত করলেও উপর থেকে তারকা প্রার্থী চাপিয়ে তৃণমূল সস্তায় বাজিমাত করতে চেয়েছে। তা এইগুলি যদি আদর্শের রাজনীতি হয়, তাহলে বিজেপি আর কী দোষ করল? মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাদের দল ভাঙা হচ্ছে বলে তৃণমূল যে অভিযোগ তুলছে, তা ধোপে ঠেকে কম কারণ কয়েকদিন আগে পর্যন্তও পশ্চিমবঙ্গে তাদের গড়কে দুর্ভেদ্য বলেই জানত মানুষ। নিজের গড়েই বিপক্ষ তৃণমূলকে বন্দুক দেখিয়ে ঘায়েল করছে?

আসলে যেই মুহূর্তে বামেদের পতন হয়েছে, তৃণমূলেরও দেখা দিয়েছে চ্যালেঞ্জ
সমস্যাটা আসলে অন্যত্র। তৃণমূল কংগ্রেস দলটির চিরাচরিত আদর্শ ছিল একটিই -- বামেদের বিরোধিতা করা। না, সেই বিরোধিতা আদর্শজনিত নয়; স্রেফ রাজনৈতিক, নির্বাচনী নিরিখে। যদ্দিন বামেরা ক্ষয়িষ্ণু ছিল এবং পরাজিত হওয়ার পরেও অবশিষ্ট ছিল, ততদিন তৃণমূলের রাজনীতিও কার্যকরী ছিল কিন্তু বাম পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার পরে দুশমন-বিহীন তৃণমূলের পক্ষেও অস্তিত্বরক্ষা আশঙ্কাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির মধ্যে মমতা এক নতুন দুশমন আবিষ্কার করার চেষ্টা করলেও তার রাজনৈতিক মোকাবিলা করতে তিনি বরাবরই অসফল। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদীর আগমনের পরে সেই চিরাচরিত আমরা-ওরার রাজনীতি আর কাজ করেনি কারণ প্রধানমন্ত্রীর একটি জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হয়ে গিয়েছে দ্রুত। মমতা অন্যদিকে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ভোটটির কথা ভেবে এসেছেন এবং সম্মুখ সংঘাতে গিয়েছেন মোদীর সঙ্গে এই ভেবে যে চোখ বুজে বাংলার মানুষ তাঁকেই সমর্থন করবে। হয় তাঁর ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট বুঝতেই পারেনি বাস্তব অবস্থা নতুবা মোদীর জাতীয় আবেদনের ব্যাপারটা তাঁর দলের কাছে এখনও অধরা।
শুধুমাত্র বাম বিরোধিতার মন্ত্রে দলের সংগঠনকে ধরে রেখেছিল তৃণমূল এতদিন। আর এখন প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়ায় বিজেপির মতো ক্যাডার-কেন্দ্রিক দলের কাছে রীতিমতো নাজেহাল হতে হচ্ছে তাদের।
ইতিহাস এভাবেই বুঝি ঘুরে ঘুরে আসে।












Click it and Unblock the Notifications