সাক্ষাৎকারের পারফরম্যান্সে রাহুল গান্ধী এবারে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে অন্তত পাঁচ গোল দিয়েছেন
দু'হাজার চোদ্দ সালে যখন কংগ্রেসের তৎকালীন সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী একটি ইংরেজি খবরের চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন অনেকেই।
দু'হাজার চোদ্দ সালে যখন কংগ্রেসের তৎকালীন সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী একটি ইংরেজি খবরের চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন অনেকেই। রাহুলের আত্মবিশ্বাসের অভাব, থতমত খেয়ে কথা বলা দেখে তাঁকে নিয়ে খিল্লি আরও বাড়ে। অন্যদিকে, ঝড়ের বেগে সামনের দিকে এগোতে থাকা নরেন্দ্র মোদীর তখন পৌষমাস চলছে। দুর্নীতির অভিযোগে বিদীর্ণ কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-২ সরকারকে বাঁচানো তখন কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না, রাহুলেরও নয়।

এরপর পাঁচটি বছর কেটে গিয়েছে। নয়াদিল্লির মসনদে এখন মোদী আসীন। দেশে চলছে ফের একটি সাধারণ নির্বাচন। আর এবারে রাহুল গান্ধী, যিনি এখন কংগ্রেসের সভাপতি, খেলছেন অন্য মেজাজে। ২০১৪-র সেই সাক্ষাৎকারের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে তিনি এখন অবলীলায় সামলাচ্ছেন সংবাদমাধ্যমের নানা প্রশ্নের বাউন্সার। এবং পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে পাল্টা দিচ্ছেনও।অন্যদিকে, মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে যে তিনি সাজানো সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এবারে, সংবাদমাধ্যমের কঠিন প্রশ্ন যাতে সামলাতে না হয়।
কংগ্রেসকে এককালে মিডিয়া-বান্ধব ধরা হতো না; কিন্তু রাহুল সেই খোলস ভাঙছেন
ব্যাপারটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথাগতভাবে দেখা যায় যে কংগ্রেস দলের নেতৃত্ব ততটা মিডিয়া-বান্ধব নন যতটা বিজেপি। গান্ধী পরিবারের সদস্যদের ক্যামেরার সামনে বসে সাক্ষাৎকার দিতে কতবার দেখা গিয়েছে তা বোধহয় আঙুলে গুনে বলে দেওয়া যাবে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলা হত যে আসলে জনগণের থেকে তাঁরা এতটাই দূরে, যে গণ পরিসরে তাঁদের উত্তীর্ণ হতে দেখা যায় না। অন্যদিকে, বিজেপির নেতাদের সহজেই হাতের কাছে পাওয়া যায় বলে সাধারণ অভিমত। ২০০২ সালের দাঙ্গার প্রসঙ্গে মোদীর সঙ্গে দেশের অনেক বড় সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক খারাপ হলেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে মোদী তাদের সঙ্গে তাঁর আপন শর্তে মিশেছেন।
রাহুল গান্ধী অবলীলায় সাক্ষাৎকার সামলাচ্ছেন; মোদী যেন কিছুটা ভীতু
এবারের লোকসভা নির্বাচনের সময়ে কিন্তু দেখাযাচ্ছে উল্টো ছবি। রাহুল গান্ধী একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে চলেছেন এবং তা কোনও বদ্ধ ঘরে বসে নয়, একদম জনসাধারণের মাঝখানে। তাঁর ভাষা, কথার সারবত্তা এখন অনেক পরিণত।নিজের এবং দলের অবস্থানের কথা বোঝাচ্ছেন সোজা ভাষায়; বোঝাই যাচ্ছে পাঁচ বছর আগের আড়ষ্টতা তাঁর আর নেই এবং বিরোধী রাজনীতিবিদের মতো খেলছেন দু'হাত খুলে। গোলরক্ষার দায় যে এবার মোদীর!
রাহুল নিজের এজেন্ডার কথা বলে আসছেন বারবার; মোদী বলছেন লঘু কথা
রাহুলের এই সমস্ত সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে যে তিনি নিজের এজেন্ডা থেকে সরছেন না এক চুলও। প্রতিটি সাক্ষাৎকারে তুলছেন রাফালে চুক্তির প্রসঙ্গ; মোদীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি; নোটবন্দির প্রসঙ্গ।
অন্যদিকে, মোদী কিন্তু এবারে যেন অনেকটাই সাবধানী। তাঁকে কড়া প্রশ্নের মুখোমুখী প্রায় হতেই হচ্ছে না; তিনি আম খেতে ভালোবাসেন কি না, সেটা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে এবং করছেন প্রখ্যাত অভিনেতা অক্ষয়কুমার। অভিযোগ করা হচ্ছে যে সাজানো সাক্ষাৎকার দিয়ে মোদী আসল ইস্যুগুলি থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন কারণ পাঁচ বছর আগে দেওয়া তাঁর "আচ্ছে দিন"-এর প্রতিশ্রুতির প্রায় কিছুই পূর্ণ হয়নি। আবার এমন সমস্ত মন্তব্য করছেন যা একজন প্রধানমন্ত্রীর মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মানায় না। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার চ্যালেঞ্জ কি তাহলে মোদীকে চাপে ফেলে দিয়েছে?
রাহুল গান্ধীর পরিণত কথাবার্তা শুনে হয়তো বলার সময় এসেছে যে তাঁকে "পাপ্পু" বলে কটাক্ষ করার দিন হয়তো শেষ। ভারতীয় রাজনীতির কড়া ঘর্ষণে কেউই বেশিদিন আনকোরা ও আনারি থাকে না; রাহুলও নেই। এবং সাক্ষাৎকারের প্রতিযোগিতায় যদি বিজয়ী ঘোষণা করতেই হয় এই বছরের লোকসভা নির্বাচনে, তবে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে কংগ্রেস সভাপতি অন্তত পাঁচ গোল দিয়েছেন।












Click it and Unblock the Notifications