ভারতে শান্তিতেই আছেন, তবে বাংলাদেশের অবস্থা দেখে পুরনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে আবেগের বাঁধ ভাঙছে এপারের বাসিন্দাদের
বাংলাদেশ! ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই বাংলাদেশ নামটিকে ঘিরে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বারবার উত্তাল হয়েছে। বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে দেশভাগের সময় পর্যন্ত কয়েক কোটি মানুষ পূর্ববঙ্গ থেকে নিপীড়িত, বিতাড়িত হয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে নতুন জীবনের আশায় এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম এবং মেঘালয়ের মতো রাজ্যগুলিতে। তবে সবচেয়ে বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে শরণার্থী তকমা জুটিয়ে হাজির হন এই পশ্চিমবঙ্গে।
তাঁদের সিংহভাগই আর কোনওদিন সে দেশে ফেরত যাননি। আর কোনওদিন সে দেশে ফেরত যেতেও চান না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে নৃশংস পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল সেই সময়ের হিন্দু সংখ্যালঘুদের, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে অনেককে যেতে হচ্ছে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পরে ফের একবার যেভাবে অশান্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ এবং যেভাবে অসুরক্ষিত অনুভব করছেন সে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তা দেখে চিন্তায় ঘুম উড়েছে ভারতে বসবাসকারী হিন্দুদের। আর যেন কোনও মানুষকে নির্মমভাবে জীবন বলিদান করতে না হয়, এই একটাই আবেদন সকলের কাছে রাখছেন তাঁরা। একই সঙ্গে তাঁদের আবেদন, বাংলাদেশে সুরক্ষিত হোক সংখ্যালঘুদের অধিকার।

সুশীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন, ১৯৭১ সালের সময় বাংলাদেশের নির্মম অত্যাচারের ঘটনায় নিপীড়িত হয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে সীমান্ত পার করে ভারতে এসেছিলেন। সেদেশে তাঁদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। অনেক জায়গা জমি ছিল। আত্মীয় পরিজন সকলে এক হয়ে নোয়াখালীতে বসবাস করতেন। কিন্তু সেই সময় পাকিস্তানি সেনা এবং রাজাকাররা তাঁদের ওপর আক্রমণ করে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, মারধর করে। যার ফলে তাঁকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। পরে তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশে ফেরত গিয়ে থাকতে শুরু করলেও ফের একবার তাঁকে লাঞ্ছনা শিকার হতে হয় সংখ্যাগুরুদের হাতে। তারপরে তিনি আর সে দেশে থাকেননি, চলে আসেন ভারতে।
সুশীল বাংলাদেশের ঘটনা দেখে বলছেন, এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা সনাতনী। হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশে যেভাবে নির্যাতিত, আমি এখুনি একটি চ্যানেলে দেখলাম যেভাবে এক গর্ভবতী মহিলার পেটে লাথি মারা হয়েছে এবং তিনি বেহুঁশ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন, এটাই সবচেয়ে বড় হৃদয় বিদারিত ঘটনা। আমি একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দাবি করছি, এখনই আমার সনাতনী ভাইদের উদ্ধার করা হোক। হিন্দুর গায়ে যেন আঁচ না লাগে। যদি ওখানে হিন্দুদের গায়ে আঁচড় লাগে তাহলে আমি এখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভারতছাড়ো আন্দোলন শুরু করব।
এখানেই না থেমে সুশীল আরও বললেন, ১৯৭১ সালে তখন আমার বয়স ১০ বছর কী ১২ বছর, তখন রাজাকাররা আমাদের উপর অত্যাচার করেছে, যেভাবে আমরা অত্যাচারিত হয়েছি তা বলার নয়। পুরুষদের জ্যান্ত বস্তার মধ্যে ভরে নদীর মধ্যে ফেলে দিয়েছে, জ্যান্ত কুপিয়ে মেরেছে, মায়েদের ইজ্জত নিয়েছে। সেই সময় বহু মায়েরা পাকিস্তানি সেনার হাতে গর্ভবতী হয়েছেন। তখন আমার বয়স কম হলেও সে কথা আমি স্মরণ রেখেছি।
ততক্ষণে কথা বলার সময় স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আবেগের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে সুশীলের। তিনি বলে চলেছেন, আমার বাড়ি ছিল টুঙ্গিপাড়া থানার অন্তর্গত পাটগাদি নবুখালি গ্রামে। আমার বড় বাড়ি ছিল। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সেনা বাড়িতে এসে খড়ের গাদায় আগুন দিয়ে দেয়। পরে সেই আগুন নদীর জল দিয়ে নেভানো হয়। শুধু আমাদের গ্রাম নয় পুরো বাংলাদেশকে ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তখন শুধু একটাই স্লোগান ছিল- হিন্দুকে কাটো, মারো, হত্যা করো। এদের নাম ছিল রাজাকার।

বনগাঁর বাসিন্দা অনিমা দাসও একই অভিজ্ঞতা স্বীকার। তিনি নিজে মহিলা। প্রাণ হাতে নিয়ে সেই সময় পেটে কন্যা সন্তানকে নিয়ে তুমুল বিপর্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে চলে আসতে হয়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা মনে করলে এখনও তিনি আঁতকে ওঠেন। অনিমা দেবী বললেন, তখন আমার ছেলে ছোট, মেয়ে পেটে ছিল। দারুণ সাবধানে আমরা এদেশে এসেছি। ওদেশে তখন বিরাট মারামারি, ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে সব। তাই ভয়ে আমাদের শ্বশুর এখানে পাঠিয়ে দিলেন। এদিকে চলে আসলাম। অনেক লোকেদের মেরে ফেলেছে। বিরাট খারাপ অবস্থা ছিল তখন।
মহিলাদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি শোনালেন অনিমা দেবীও। তাঁর কথায়, আমরা মেয়েরা বাইরে বেরোতাম না, ছেলেদের দেখলেই মেরে ফেলে দিতো। খুব অত্যাচার করেছে সেসময়। অনিমা দেবী আর কোনওদিন সেদেশে গিয়ে থাকতে চাননি। কয়েকবার গিয়েছেন বাংলাদেশে। তবে থাকার ইচ্ছা আর কোনওদিন হয়নি। ভারতেই সুখে শান্তিতে থাকছেন তিনি। অনিমা দেবী বললেন, ওখানে আমার দাদারা আছে, গিয়েছিলাম কয়েকবার। আমার ভালো লাগে না। আশেপাশে মুসলমান। ওই দেশের নাম আর শুনতে ভালো লাগে না। একইসঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, হিন্দুরা কেন ওই দেশে রয়েছে? চলে আসুক এদিকে। কিন্তু কেন আসে না কে জানে!
কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে আসে অনিমা দেবীর। নিজেই বললেন, বয়সের কারণে বেশি ঘটনা আর মনে করতে পারেন না। আবার একটু থেমেই বললেন, সেসব আর মনে করতেও চাই না। কী আর বলব, সেই সব কথা যখন মনে পড়ে, কেমন একটা হয় মনের মধ্যে। রাস্তার উপরে মায়ের সামনে ছেলেকে যদি মারে, তাহলে কেমন হয় মনের অবস্থা! এইসব আমরা দেখেছি। তাই ওই দেশের কথা সত্যিই আর ভালো লাগে না।
আমরা কথা বলেছিলাম সীমান্তবর্তী এলাকার একাধিক মানুষের সঙ্গে। তাঁদের সকলের মনের কথা, সুর সব এক। ধর্মীয় ভিত্তিতে নিপীরণের শিকার হয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে ভারতে পালিয়ে আসতে হয়েছিল অনেককে। একদিকে বাংলাদেশ থেকে এদেশে চলে আসার যন্ত্রণা, আবার একইসঙ্গে স্বস্তিবোধ এই ভেবে যে, ভারতে তাঁরা ভালো আছেন, শান্তিতে আছেন। আর এদের মধ্যে কেউ বাংলাদেশে ফেরত যেতে চান না। বরং ওদেশে যাঁরা আছেন, সেই হিন্দুদের ভারতে চলে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন এদেশে থাকা হিন্দুরা। হারাধন বিশ্বাস যেমন বললেন, আমার বাবা ওদেশ থেকে এসেছিল। আমার জন্ম এখানে। আমি সেসময়ের গল্প শুনেছি। হিন্দুদের কোনওদিন শিক্ষা হবে না। স্বাধীনতার সময়, পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তার পরেও এখনের মতো ঘটনা ঘটেছে। তারপরও সেদেশের হিন্দুরা ভারতে চলে আসেননি। আর সেজন্যই ফের তাঁদের নতুন করে বিপদের সামনে পড়তে হয়েছে।

পরেশ দাশ যেমন ১৯৫৬ সালে এদেশে আসেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, মুসলমানরা আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে। আমার সামনেই দাদুকে কুপিয়ে হত্যা করে দেয়। তারপরই ভয়ে আমরা জমি ফেলে পালিয়ে আসি। আমার কাকাতো বোনকে সামনে অত্যাচার করেছে। আমরা এখানে অনেক শান্তিতে আছি। কয়েকদিন আগেই এক আত্মীয় ফোন করেছিল। জানাল, এখানে অত্যাচার হচ্ছে, কুপিয়ে মেরে ফেলছে। মাসখানেক আগে ঘরে ঢুকে কাকাকে খুন করে গিয়েছে নোয়াখালিতে। জায়গা দখল করতে চেয়ে কাকাকে খুন করে ফেলেছে। আমি বলেছি, প্রাণ হাতে চলে আসো। প্রাণ না থাকলে জমি নিয়ে কী করবে?

নিউটাউনের অদূরে একটি গ্রামে থাকেন রসময় বিশ্বাস। ১৯৭১ সালের পরপর তিনিও একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে ভারতে চলে এসেছিলেন। তিনি বলছেন, হিন্দু হলেই অত্যাচার চলত। স্বাধীনতার পরও কেউ হিন্দুদের ওপর দরদ দেখায়নি। পাকিস্তানি সেনা-জামাত বাহিনী হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করেছে। জন্মভিটে ফেলে সকলকে আসতে হয়েছে। লুকিয়ে, রাতের অন্ধকারে, না খেয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে। জামাতরা হিন্দুদের জায়গা চিহ্নিত করে দিতো। সেই অনুযায়ী পাক বাহিনী হামলা চালিয়েছে। তবে সেই দিন আর ভারতে এসে তাঁদের দেখতে হয়নি। এখানে তাঁরা সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন। তবে এখনও অনেক চেনা মানুষ বাংলাদেশে রয়েছেন। ফলে সকলের মতো তিনিও চান, ভারত সরকার উদ্যোগ নিন যাতে বাংলাদেশেও হিন্দু মানুষেরা শান্তিতে থাকতে পারে।












Click it and Unblock the Notifications