Get Updates
Get notified of breaking news, exclusive insights, and must-see stories!

বাতিল জিনিস দিয়ে শিল্প সৃষ্টি! বাধা সত্ত্বেও 'কাটুম কুটুম' সাধনায় মগ্ন আদিবাসী শিল্পী

শুধুমাত্র দেখার চোখ থাকলেই 'বাতিলে'র খাতায় নাম লেখানো জিনিসকে দিয়েও শিল্প সৃষ্টি সম্ভব। আর সেই কাজটাই নীরবে দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন বাঁকুড়ার এক অখ্যাত শিল্পী পবন লোহার। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কাটুম কুটুম'কে জীবনের প্রেরণা করে 'কাটুম কুটুম' সাধনায় জীবনের একটা বড় সময় ব্যয় করে ফেলেছেন বিষ্ণুপুর এলাকার চূয়া মসিনা গ্রামের দরিদ্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের পবন লোহার।

তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাড়িতে সেভাবে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল না কোনওকালেই। কিন্তু পবন লোহার চেয়েছিলেন পড়াশোনা শিখে কিছু একটা করতে। সঙ্গে ছিল ছবি আঁকার প্রতি অদ্ভুত টান। মনে মনে শিল্পী হতেই চেয়েছিলেন পবন। এর মাঝেই ১৯৭৮ সালে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। কিন্তু এরপর কী করবেন?

bankura

সেই সময় গ্রামেরই একজন তখন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় অধ্যাপনা করেন। পবনের আঁকা ছবি দেখে তিনি এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন তাঁকে। মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষে পবন রওনা হলেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে। শান্তিনিকেতনে পৌঁছে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটে অবনীন্দ্রনাথের কাটুম-কুটুমের সঙ্গে। তিনি বলেন, কাটুম কুটুম দেখে বেশ আশ্চর্য লেগেছিল। সেইসঙ্গে আকর্ষণও বোধ করেছিলেন। কিন্তু ওখানে পড়াশোনার সুযোগ পেলেও আর্থিক স্বচ্ছলতার অভাবে শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছা তাঁকে ছাড়তে হল।

গ্রামে ফিরে এসে আবারও ছবি আঁকার চেষ্টা করেছিলেন পবন লোহার। কিন্তু কোনওরকমের প্রশিক্ষণ ছাড়া ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তেমন উন্নতি তিনি করতে পারবেন না বলেই মনে করেছিলেন। কিন্তু জীবনের মোড় ঘোরে ১৯৮৪ তে। ওই বছর ছাঁদার গ্রামে শিল্পী উৎপল চক্রবর্তীর শিল্প প্রতিষ্ঠান 'অভিব্যক্তি' আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে আবারও কাটুম-কুটুমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। মনে পড়ে গেল সেই শান্তিনিকেতনের মিউজিয়ামে দেখা অবন ঠাকুরের সৃষ্টিগুলির কথা। সেই বছরই স্থানীয় একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেলেন পবন লোহার। আর তার পাশাপাশি শুরু করলেন কাটুম-কুটুম তৈরি।

সেই থেকে এখনও পর্যন্ত একই কাজ করে চলেছেন তিনি। এখন সংগ্রহ এত বেশি যে বাড়িতে আর জায়গা হয় না। কিন্তু কাউকে এই শিল্প বিক্রি করেননি। উপার্জন তো ঠিকই চলে যায়। কিন্তু তিনি চান কাজ থেকে উৎসাহী ছেলেমেয়েরা শিখুক। কাটুম-কুটুম শেখানোর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির কথাও ভেবেছিলেন পবন লোহার। বছর পনেরো আগে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ১০০ বছরের লিজে কিছুটা জায়গাও পেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতার অভাবে শেষ পর্যন্ত আর সেটা হয়ে ওঠেনি। একজন তফসিলি উপজাতির মানুষের নেতৃত্বে এত বড় একটা কর্মজজ্ঞ মেনে নিতে পারেননি তাঁরা।

তবে আগামী বছরের শুরুতেই পবন লোহারের চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। তারপর আবার নতুন করে কাজ শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। বলছিলেন, "কোন গাছের ডাল বেছে নেব, কোন গাছের শিকড় - সেসব চিনতে শিখতে হয়। গাছের ডালে অনেক ক্ষেত্রেই তাড়াতাড়ি ঘুনপোকায় আক্রান্ত হয়। তাই তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকড় ব্যবহার করেন। আর সেক্ষেত্রেও নজর রাখতে হয়, শিকড় শুকনো এবং শক্ত হলে বেশিদিন টেকে। মৃত্যুর আগে এইসব বিষয় ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের শিখিয়ে যেতে চান তিনি। আর সেইসঙ্গে এই প্রায় অনাদৃত শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চান।

পবন লোহারের কথায়, নানা জায়গায় প্রদর্শনীতে ঘুরে দেখেছেন, এ জিনিসের চাহিদা আছে। বাজারে নিয়ে যেতে পারলে মানুষ কিনবে। তিনি বিক্রি করতে না চাইলেও অনেকে কিনতে চেয়েছেন। এই শিল্পকে ঘিরে যদি কিছু মানুষ উপার্জনের রাস্তা খুঁজে পায়, তাহলে তো খুশি না হওয়ার কিছু নেই।

না, এই ৩৬ বছরের সাধনার জন্য তেমন কোনও সম্মান বা স্বীকৃতি পাননি তিনি। তাঁর শিল্পকে যেমন অনেকে পছন্দ করেছেন, অনেকেই আবার তাতে তেমন পাত্তাও দেননি। কিন্তু সামান্য গাছের শিকড় থেকে জন্তু-জানোয়ার বা মানুষের প্রতিকৃতি খুঁজে দেখার জন্য যে চোখ থাকার দরকার, সেটা তো একজন প্রকৃত শিল্পীরই থাকে।

তবু হয়তো পাশ্চাত্য ঘরনায় এই শিল্প স্বীকৃতি পায়নি বলেই আমাদের দেশেও অনাদৃত। ঠিক যেমন অনাদৃত ঐতিহ্যবাহী পট-শিল্প। কাটুম-কুটুমের অবশ্য দীর্ঘ ইতিহাস নেই। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেই এর জন্ম। কিন্তু এর সম্ভাবনা বিস্তর। সেই পথ দিয়ে কতদূর এগিয়ে যেতে পারবেন পবন লোহার, সেটাই দেখার। সমাজের সঙ্গে লড়াই করে এই শিল্পকে কি স্বীকৃতি এনে দিতে পারবেন তিনি?

More From
Prev
Next
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+