বুয়েটে শিক্ষার্থী নির্যাতনের সংস্কৃতি: প্রশাসনের ব্যর্থতা কতটা?

বুয়েটে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা অনেকেরই, বিশেষ করে ছেলেদের হলে নিয়মিত একটি অভিজ্ঞতা হল র‍্যাগিং। ভিন্নমত প্রকাশে মারধরের ঘটনাও নিয়মিত। এই নির্যাতনের সংস্কৃতির দায় কার?

বুয়েটে শিক্ষার্থীরা চারদিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।
Getty Images
বুয়েটে শিক্ষার্থীরা চারদিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সময়সীমা ছিল বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।

কিন্তু প্রশাসন এখনো পর্যন্ত এসব দাবির বিষয়ে কোন জবাব না দেয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে এদিনও মুহুর্মুহু স্লোগান শোনা গেছে।

যে শিক্ষার্থীরা চারদিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর তাদের অনেকেরই, বিশেষ করে ছেলেদের হলে নিয়মিত একটি অভিজ্ঞতা হল র‍্যাগিং।

মৌখিক ভাবে হেনস্থা থেকে শুরু করে, বিব্রতকর পরিস্থিতির মতো ঘটনা দিয়ে অনেকের ক্যাম্পাস জীবন শুরু হয়েছে। সেই খবর এখন ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে।

ভিন্নমত প্রকাশ করার জন্য বা কোন সাধারণ বিবাদের ঘটনা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের হাতে মারধরের ঘটনাও নিয়মিত ব্যাপার ছিল।

নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থীর বয়ান

এরকম একটি ঘটনার বর্ণনা করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী।

তিনি বলছেন, "ধর্মকে যারা কটাক্ষ করে তাদের বিরুদ্ধে আমি ফেসবুকে একটি পোষ্ট দিয়েছিলাম। এটার জেরে আমাকে রাতের বেলা রুমে ডেকে নেয়া হয়েছিলো। তারা আমাকে জেরা করে। আমার ল্যাপটপ, ফোন, ইমেইল, আমার ব্রাউজার হিস্টরি, আমার ফেসবুকের কর্মকাণ্ড সবকিছু তার চেক করে। চেক করে কোন কিছুই পায়না।"

বুয়েট ক্যাম্পাসের মুল সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
Getty Images
বুয়েট ক্যাম্পাসের মুল সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

তিনি বলছেন, অন্য আরও কিছু বিষয়ে ফেসবুক পোষ্টের জের ধরে তাকে সেই রাতে পেটানো হয়েছিলো।

তার বর্ণনা দিয়ে এই শিক্ষার্থী বলছিলেন, "তারা আমাকে সারা রাত ধরে পেটায়, নির্যাতন করে। এখনো আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। এই ঘটনাটা হয়ত এতদিন পরে আর তীব্র থাকবে না। কিন্তু আমি এখনো থ্রেট ফিল করি।"

প্রশাসনের ব্যর্থতা কতটা?

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, এমন ঘটনা প্রতিহত করা পুরোটাই প্রশাসনের দায়ভার।

কিন্তু তারা তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করে একজন শিক্ষার্থী বলছেন, "আমাদের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢোকানো মানে আমাদের পরিবার আমাদের তাদের হাতে ছেড়ে দিলো। আমি আশা করবো যে আমার প্রশাসন আমার কোন বিপদ হলে এগিয়ে আসবে।"

"আমি রাত দুইটায় ফোন দেই বা রাত চারটায় কল দেই এবং সঠিক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? প্রশাসন বলল আমাদের থেকে ছাত্রলীগের ক্ষমতা বেশি। তারা এত উচ্চ পর্যায়ে থেকে যদি ভয় পায় তাহলে আমরা কেন ভয় পাবো না?"

আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষকে।
Getty Images
আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষকে।

আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে নির্যাতন ও র‍্যাগিং-এর সংস্কৃতির কথা।

প্রশাসনিকভাবে বিচারের অভাবকে একটি বড় কারণ বলছেন অনেক শিক্ষার্থী। বুয়েটের সিএসই বিভাগের একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে একটি সার্ভার গড়ে তোলে বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

আরো পড়ুন:

ওয়েবসাইট ব্লক: নির্যাতনের অভিযোগ চাপা দেয়া হচ্ছে?

'যত ভয় দেখানো হচ্ছে, আমরা তত ভয় পাচ্ছি'

রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত বুয়েট শিক্ষক সমিতির

এতে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা নিজের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারেন।

বুধবার পর্যন্ত সেখানে ১০৬টি অভিযোগ এসেছে, যার অনেকগুলোই জমা পড়েছে আবরার ফাহাদ নিহত হবার পর। কিভাবে বহুদিন ধরে এমন ঘটনা বুয়েটের মতো ক্যাম্পাসে চলে আসছে?

বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলছেন, শিক্ষার্থীরা ভয়ে বেশিরভাগ সময় অভিযোগ নিয়ে আসেন না। তবে এক্ষেত্রে প্রশাসনের এক ধরনের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করছেন অধ্যাপক রহমান।

তিনি বলছেন, "নতুন যারা আসে তাদের উপরেই এই র‍্যাগিং-এর নামে শারীরিক নির্যাতনটা বেশি হয়। আর এটা করে তাদের ইমিডিয়েট উপরের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। নতুন শিক্ষার্থীরা তখন যে একজন প্রভোস্টের কাছে অভিযোগ করবে বা আমার কাছে অভিযোগ করবে সেই রকম পরিবেশ হয়ত আমরা তাদেরকে তৈরি করে দিতে পারিনি। এক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে আমাদের শিক্ষক ও আমাদের প্রশাসনিক যে কাঠামো রয়েছে সেটার ব্যর্থতা কিছুটাতো আছেই। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।"

বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান
BBC
বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান

নির্যাতনের সংস্কৃতির আরেক দিক

আবরার হত্যাকাণ্ডের আগে আর একটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলেছিল। সেটি হল আহসানউল্লাহ হলে মেরে এক শিক্ষার্থীর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়ার ঘটনা।

অধ্যাপক রহমান বলছেন, এই ঘটনার পর তিনি হলে প্রভোস্টদের নিয়মিত টহলের অনুরোধ করেছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে কাউন্সেলিং-এ বসেছিলেন।

তিনি বলছেন সেসময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বিশেষ মানসিকতা তিনি দেখতে পেয়েছেন।

আরো পড়ুন:

আবরার হত্যায় শাস্তি হবে, আন্দোলন কেন? - হাসিনা

আবরার হত্যা: বহিষ্কার করে দায়িত্ব এড়াচ্ছে ছাত্রলীগ?

তিনি বলছেন, "যে ছেলেটি এখন র‍্যাগিং দিচ্ছে সে তার ইমিডিয়েট আগের ব্যাচ থেকে এরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে চাপা একটা ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকে যে কবে নতুন স্টুডেন্ট পাবো। তাদেরকে যতক্ষণ না সে একইভাবে হেনস্থা করতে পারছে, ততক্ষণ তার মধ্যের ক্ষোভটা যাচ্ছে না।"

ছাত্রনেতাদের দৌরাত্ম্য ও সরকারের ভূমিকা

এটি হয়ত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে এখন প্রচুর ঘটনার জন্য সরকারী দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের বিপক্ষে অভিযোগ উঠছে।

আহসানুল্লাহ হলের প্রভোস্ট এবং পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এম শাহজাহান মণ্ডল
BBC
আহসানুল্লাহ হলের প্রভোস্ট এবং পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এম শাহজাহান মণ্ডল

আবরার হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার বেশ কিছু নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

যাদের ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তখন অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন।

এক অর্থে তারা একটি বিকল্প প্রশাসন চালাচ্ছে বলে মনে হয়। হলে সিট বরাদ্দ থেকে শুরু করে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি পর্যন্ত তাদের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে।

আহসানুল্লাহ হলের প্রভোস্ট এবং পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এম. শাহজাহান মণ্ডল বলছেন শিক্ষকরাও অনেক সময় এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে আপোষ করেন।

তিনি বলছেন, "যারা পলিটিক্স করছে তারা হয়ত খুব তাড়াতাড়ি ক্যারিয়ারে উন্নতি চায়। বিশেষ করে আর্থিক দিক দিয়ে। আর একটা বিষয় হল যখন যে সরকারি দলে থাকে, যারা স্ট্রং পলিটিক্স করে তাদের তারা প্রমোট করে। অনেক শিক্ষকও তরুণ বয়সেই রাজনীতিতে ঢুকে যাচ্ছে।"

"আমরা যারা শিক্ষক অনেক সময় আমরা শিক্ষকের দায়িত্বের কথা ভুলে যাই। অ্যাম্বিশনের কারণে অনেক সময় আমরা আপস করি।"

বিভিন্ন হলে ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা দেখভালের জন্য দায়িত্বরত শিক্ষকদের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর না নেয়া এবং তাদের প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব একটি কারণ হিসেবে এখন চিহ্নিত হচ্ছে।

একই সাথে ছাত্র সংগঠনের কাছে তারা এক অর্থে অসহায়ও বোধ করেন বলে মনে করছেন অধ্যাপক মণ্ডল।

তিনি বলছেন, "সরকারের একটা শক্ত সমর্থন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন পাচ্ছে। যেটা সবসময় থাকলে আমরা ছাত্র নেতাদের কাছে আমাদের ভয়েস আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারি। সরকার এখন তার ছাত্র সংগঠনের ব্যাপারে যে কঠোর ভূমিকা নিয়েছে সেটি আরও আগে হলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।"

অন্যান্য খবর:

বাংলাদেশের বিমানবন্দর কিভাবে অন্যরা ব্যবহার করবে

রিশা হত্যায় অভিযুক্ত ওবায়দুল হকের ফাঁসির আদেশ

বিন লাদেনকে ধরিয়ে দেয়া ডাক্তারের আপিল

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+