মানবিকতার নিদর্শন, ইউক্রেন সেনার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে বাঙ্কারেই আশ্রয় ভারতীয় যুবতীর
মানবিকতার নিদর্শন, ইউক্রেন সেনার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে বাঙ্কারেই আশ্রয় ভারতীয় যুবতীর
হারিয়ে গিয়েছে আগেকার সেই চেনা ছন্দ, বিকেল হলেই কিয়েভের ফুটপাথে গাছের ছায়ায় পাতা বেঞ্চগুলো এখন তাদের ভাগ্য নিয়ে চিন্তা করছে। নীল আকাশে রুশ মিসাইলের আগুন আর বাতাসে বারুদের গন্ধে দমবন্ধ আবহাওয়া। প্রতি মুহূর্তে গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা একরাশ আতঙ্ক। পরের দিনের সূর্য দেখতে পাবেন তো? এই ভেবেই রাত জেগে কাটাচ্ছেন ইউক্রেনবাসী। আর এরই মাঝে তথৈবচ অবস্থা অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারত থেকে আসা পড়ুয়া ও অন্যান্য মানুষদের। ভারতীয় দূতাবাস থেকে ফর্ম ফিল আপের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে সকলকে। কিন্তু তাও উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। এই কী হবে কী হবে রব চারদিকে। আর তারমধ্যে সামনে আসছে এমন সব ছবি যা হতবাক করছে পৃথিবীকে। আর এবার দেশের এক যুবককে ঘিরে এক ঘটনা সামনে এল।

সহানুভূতির নিদর্শন
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের মাটিরে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের আবহাওয়া ঘনিয়েছে সেই দেশের আকাশে। লাহগাতার মিসাইল বর্ষণ আর গোলাগুলির আওয়াজে ক্ষীণ হয়ে আসছে উইক্রেনের সাধারণ মানুষের আর্তনাদ। ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক ভাবে মিত্র রাশিয়া ও ইউক্রেন, দুই দেশের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে ভারত। এমনকি পুতিনকে অস্ত্র ছেড়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে গোটা ঘটনা সামলানোর অনুরোধ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর ঠিক তখনই ভারতের এক নাগরিকের পদক্ষেপকে স্যালুট জানাচ্ছে গোটা বিশ্ব।

ট্রিবিউনের রিপোর্ট
রবিবার ট্রিবিউন একটি রিপোর্ট সামনে এনেছে, আর যাতেই রীতিমত তোলপাড় বিশ্ব রাজনীতি। নেহা নামে ভারতের এক যুবতী ইউক্রেন যান বেশ কিছুদিন আগে। সেখানে গিয়ে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন সেই বাড়ির মালিক বর্তমানে স্বেচ্ছায় রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাত থেকে নিজের দেশ ইউক্রেনকে রক্ষা করার জন্য যোগদান করেছেন ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে। কিন্তু পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী এবং তিন সন্তান। এতদিন যে বাড়ির মালিক ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন, নিজের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ ভাগ করে নিয়েছেন, তাঁদের এই যুদ্ধের সময় একা ফেলে চলে আসতে মোটেই রাজি হননি নেহা। আর তাই বাড়ির মালিকের স্ত্রী এবং তাঁর তিন সন্তানের সঙ্গে বাঙ্কারে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেহা। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই মাত্র সতেরো বছর বয়সে এই ভারতীয় যুবতীর সাহসকে কুর্নিশ জানাচ্ছে গোটা বিশ্ব।

নেহার সিদ্ধান্ত
আগের বছর ডাক্তারি পড়ার জন্য ইউক্রেন আসেন নেহা। কিন্তু সেখানে তিনি কোনও হোস্টেল না পেয়ে শেষমেশ ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের এক এক কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারের বাড়িতে একটি রুম ভাড়া নিয়েছিলেন। এতদিন সেখানে অই বাড়িতে বাড়িওয়ালা এবং তাঁর স্ত্রী ও তিন সন্তানের সঙ্গে ভালোই দিন কাটছিল নেহার। কিন্তু বাধ সাধল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জেদ। বৃহস্পতিবার সরাসরি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ লাগার পর ভারতের প্রায় সকলেই দেশে ফেরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন কিন্তু সেখানে ব্যাতিক্রম হলেন নেহা। আসলে বছর কয়েক আগেই নেহা তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। কর্মসূত্রে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কম্যান্ডার ছিলেন। আর সেই কারণেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে বাড়ির কেউ যদি যুদ্ধে যান তাহলে পরিবারের মানসিক অবস্থা কেমন হয়। আর সেই জন্যই হয়ত তাঁর এই সিদ্ধান্ত, এমনটাই মনে করেছেন অনেকে।

'ছেড়ে যাব না'
"আমি বাঁচতে পারি বা না পারি, কিন্তু আমি এই শিশুদের এবং তাদের মাকে এমন পরিস্থিতিতে ছেড়ে দেব না," সাহসী কন্ঠে মাকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন নেহা। প্রসঙ্গত, নেহার মা হরিয়ানার চরখি দাদরি জেলায় একজন স্কুল শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। নেহা তাঁর এক বন্ধুকে জানিয়েছেন, "আমরা বাইরে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমরা ভালো আছি," আর নেহার এই সিদ্ধান্তে গর্বে বুক ফুলছে আমাদের দেশেরও।

সবিতা দেবীর পোস্ট
নেহার এক পারিবারিক বন্ধু সবিতা দেবী এই কঠিন সিদ্ধান্তে নেহার পাশেই দাঁড়িয়েছেন। একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'তখন ভোর ৪টে হবে, চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটছে সময়। ঘুম হয়নি সারারাত, অস্থির লেগেছে। আমার খুব কাছের এক বন্ধুর মেয়ে তার বাড়িওয়ালার স্ত্রী এবং ৩ সন্তানের সঙ্গে বাঙ্কারে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাড়ির মালিক সম্প্রতি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। নেহা এই কঠিন পরিস্থিতিতে একা দেশে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইশ্বর ওদের মঙ্গল করুন।'












Click it and Unblock the Notifications