ট্রুডোর ছায়া পেরিয়ে নতুন সমীকরণ, কার্নির কূটনৈতিক কৌশলে ভারত ও কানাডা সম্পর্কে রিসেট
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ভারত সফরের সূচিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো পাঞ্জাব সফর নেই। তাঁর পূর্বসূরিদের প্রথা ভেঙে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন ঘরোয়া ভোটরাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা হিসেবে। স্পষ্ট ইঙ্গিত, এই সফরের লক্ষ্য আবেগ নয়, অর্থনীতি, প্রতীক নয়, বাস্তব স্বার্থ।
গত এক বছরে কার্নি ধাপে ধাপে সরিয়ে দিয়েছেন জাস্টিন ট্রুডো আমলে তৈরি হওয়া টানাপোড়েনের ভার। ২০২৩ সালে খালিস্তানি জঙ্গি হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ড ঘিরে যে কূটনৈতিক ঝড় ওঠে, তার জেরে দুই দেশই কড়া অবস্থান নেয় কূটনীতিক বহিষ্কার, ভিসা পরিষেবা স্থগিত, পাল্টা অভিযোগ। সম্পর্ক নেমে যায় তলানিতে। কিন্তু মাত্র দশ মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কার্নির তৃতীয় বৈঠক প্রমাণ করে বরফ গলেছে, স্রোত ঘুরেছে।

মুম্বই সফরের আগে অটোয়ার বার্তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ কানাডার মাটিতে সহিংস অপরাধের সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র নিয়ে আগের অভিযোগ থেকে কার্যত সরে আসে সরকার। এক সময় লরেন্স বিশনোই চক্রের সঙ্গে ভারতীয় কর্তাদের যোগাযোগের অভিযোগ তুলেছিল ট্রুডো প্রশাসন, ভারত তা নাকচ করে। উত্তেজনার জেরে উভয় দেশই কূটনীতিক বহিষ্কার করে। এখন সেই সুর নরম।
এমনকি ২৬/১১ মুম্বই হামলার অভিযুক্ত তাহাওউর রানার নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের পদক্ষেপও নেয় কার্নি সরকার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রত্যর্পণের পর ভারতে বিচারাধীন এই মামলায় অটোয়ার অবস্থান পরিবর্তনকে অনেকেই দেখছেন আস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে।
দীর্ঘদিন ধরেই কানাডার রাজনীতিতে খালিস্তান ইস্যু ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলেছে। ট্রুডো পর্বে সেই প্রশ্নই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে 'বাধা'র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রুডো প্রকাশ্যে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পর কূটনৈতিক অচলাবস্থা চরমে ওঠে। ভারত ৪১ জন কানাডীয় কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারকে প্রত্যাহার করতে বলে, ভিসা পরিষেবাও স্থগিত হয়।
কার্নি ২০২৫ সালের মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেন। তাঁর কৌশল সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু নয়, পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে আনা।
গত বছরের জুনে কানানাস্কিসে জি ৭ সম্মেলনে কার্নির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী মোদীর উপস্থিতি ছিল টার্নিং পয়েন্ট। পরে জি 20 সামিটের ফাঁকে দ্বিতীয় বৈঠকে দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য স্থির করে। উচ্চকমিশনার পুনর্বহাল ও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা ফের শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে বিদেশমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের পর্যায়ে ধারাবাহিক সংলাপ চলছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বাণিজ্যিক চাপ কানাডাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। রপ্তানির ৭৫ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে, জ্বালানি রপ্তানির ৯৮ শতাংশের গন্তব্যও সেখানেই। এই অতিনির্ভরতা কমাতে কার্নি বিকল্প অংশীদার খুঁজছেন।
চিন সফর, বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্ক শিথিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েন বেড়েছে। একইসঙ্গে ভারতও বাণিজ্য সহযোগিতার পরিসর বাড়াচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও ওমানের সঙ্গে। ফলে নয়াদিল্লি ও অটোয়ার স্বার্থ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে বহুমুখী বাণিজ্য ও কৌশলগত ভারসাম্য।
কার্নির এই ভারত সফরে ইউরেনিয়াম সরবরাহ, এলএনজি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বহু ক্ষেত্রেই চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতিকে 'অ্যাঙ্কর' করে রাজনৈতিক মতভেদকে পেছনে ফেলার প্রচেষ্টা স্পষ্ট।
ট্রুডো পর্বের তিক্ততার 'ভূত' চাপা দিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতির পথে হাঁটছেন কার্নি। খালিস্তান ইস্যুতে আবেগ নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থে জোর এই সমীকরণই আপাতত ভারত ও কানাডা সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের ভিত্তি।












Click it and Unblock the Notifications