সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন ভিত নড়িয়েছিল বুদ্ধদেব সরকারের, রাজ্য ছাড়ে টাটা
রাজ্যের উন্নয়ন ইস্যুতে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। চোখের সামনে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতেও দেখেছেন তিনি। মানুষের মনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ প্রত্যক্ষ করেছেন এক সময়। রাজনীতি থেকে কার্যত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্বেচ্ছাঅবসর নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম অন্যতম দুটি পর্যায়।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই কথা কখনওই বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই মানুষের জনসমর্থন পেয়েছিলেন। আর বামফ্রন্ট সরকার জনসমর্থন হারিয়েছিল।

শিল্পতালুক তৈরি হবে রাজ্যে। শিল্পায়নের বিপ্লব হবে পশ্চিমবঙ্গে। এসইজেড প্রকল্প সিঙ্গুরে সাফল্যের সঙ্গে চলবে। এই ভাবনা সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর ছিল। ২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্টের স্লোগান ওঠে 'কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ'। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রভূত জনসমর্থন দিয়েছিল বামফ্রন্টকে। ইতিহাস তৈরি করে ২৩৫ টি আসনে বামফ্রন্ট সরকার জয়ী হয়েছিল। বিরোধীরা সেই সময় খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।
আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেই সময় টাটা রাজ্যে শিল্পের জন্য এগিয়ে আসে। এক অভূতপূর্ব ঘটনা। সিঙ্গুরে টাটাকে জমি দেওয়া হবে। সেই কথা জানানো হয়। গাড়ি কারখানা তৈরি হবে সিঙ্গুরে। ন্যানো গাড়ি গোটা বিশ্বজুড়ে চলবে। এই বার্তা রটে গিয়েছিল। টাটা গোষ্ঠীকে ১২০০ একর জমি দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। কারখানা তৈরি শুরু হয়। শুধু টাটা নয়, একাধিক অনুসারী শিল্প সেখানে আসতে শুরু করে। এসইজেড প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে শুরু করে৷
জমি হস্তান্তর, চেক বিলি একাধিক বিষয়ে মতান্তর শুরু হয়। ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক জমিদাতারা ভাগ হয়ে যান। ৪০০ একর জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ কৃষকরা বেঁকে বসে। শুরু হয় সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন। শিল্পের জন্য দুই ফসল, তিন ফসলি জমি সরকার জোর করে অধিগ্রহণ করেছে। এই অভিযোগ উঠতে শুরু করে।
বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসরে নেমে পড়েন। সিঙ্গুরের কারখানার গেটের শুরু হয় ধর্ণা অবস্থান। বিক্ষোভ চলে জাতীয় সড়ক আটকে রেখে। সিঙ্গুরে আন্দোলন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী কালে তিনি ২৬ দিন অনশন পর্যন্ত করেন ধর্মতলা চত্বরে। কারখানা তৈরির ক্ষেত্রে একের পর এক বাধা আসতে শুরু করে।
পরিস্থিতি শান্ত না হলে টাটা গোষ্ঠী রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে। এই কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় গোটা রাজ্যজুড়ে এক অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা। তৎকালীন রাজ্যপাল ছিলেন গোপালকৃষ্ণ গান্ধী। শাসক বিরোধী দুই পক্ষকে মীমাংসার জন্য তিনি রাজভবনে ডেকেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বৈঠক হয় রাজ্যপালের উপস্থিতিতে।
সেখানেও কোনও সুরাহা মেলেনি। বিরোধিতার পথ আঁকড়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের বক্তব্য রেখে রাজভবন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ম্লান মুখে সেই সময় দেখা গিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। সিঙ্গুরের কারখানা তারপরে আর এগোয়নি। টাটা গোষ্ঠী কারখানা তৈরির কাজ বন্ধ করে দেয়। যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ারদের সেখান থেকে বার করে নিয়ে যায় সংস্থা।
বলা ভালো, তারপর থেকে রাজ্যে আর কোনও বৃহৎ ভারী শিল্পের কাজ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের চরিত্র শিল্পবিরোধী। এই তকমাও একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশের শিল্পপতিদের কাছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ব্যর্থ হয়েছিলেন আন্দোলন রুখতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি বোঝাতে পারেননি। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভিত প্রথমবার নড়েছিল সিঙ্গুর ইস্যুতে।












Click it and Unblock the Notifications