আরাবুলদের পুষে রাখার মাশুল দিতে হবে তৃণমূলকে
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছোট্ট সংস্করণ ভাঙড়। রাজ্যের শাসকদল ভাঙড় কাণ্ডকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাণ্ডের সঙ্গে মেলাতে অনিচ্ছুক হলেও আপামর রাজ্যবাসী কিন্তু সেই ভাবনার অবিচল।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছোট্ট সংস্করণ ভাঙড়। রাজ্যের শাসকদল ভাঙড় কাণ্ডকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাণ্ডের সঙ্গে মেলাতে অনিচ্ছুক হলেও আপামর রাজ্যবাসী কিন্তু সেই ভাবনার অবিচল। ভাঙড়ে নতুন করে গোলমাল হয়নি ঠিকই, তবে থমথমে ক্ষোভের ছবি ভাস্বর ভাঙড়ের আনাচে-কানাচে। তাদের সব ক্ষোভ এখন প্রাক্তন বিধায়ক আরাবুল ইসলাম ও বর্তমান বিধায়ক আবদুর রেজ্জাক মোল্লার উপর![পুলিশের রুটমার্চের পরই ফের উত্তপ্ত ভাঙড়, মাছিডাঙায় রাস্তা কাটলেন গ্রামবাসীরা]
দু'দিন আগে দেখা গেল এক নকশালপন্থী দলের ডাকা সমাবেশে যোগ দিল তামাম গ্রামবাসী। তাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীকে সরকারি নির্দেশের মাধ্যমে প্রকল্প বন্ধের কথা জানাতে হবে। জীবিকা ফিরিয়ে দিতে হবে। ধৃতদের ছেড়ে দিতে হবে। যাদের নামে মামলা হয়েছে তাদের নিঃর্শত মামলা তুলে নিতে হবে। এলাকায় পুলিশি দমনপীড়ন করা যাবে না।[কে চালাল গুলি? উর্দিই বা কার? ভাঙড়বাসীর ধন্দ কাটছে, শুরু রাজনৈতিক তরজা]

বিক্ষোভের আঁচ একটু জুড়োলেও সব মিলিয়ে চরম অস্বস্তিতে রাজ্য সরকার এবং শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। ভাঙড় কাণ্ডের দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছে তৃণমূল। কারণ ভাঙড় কাণ্ডে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছাপ পড়ুক চান না মমতা। তৃণমূল নেতৃত্ব জানে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাণ্ড যেমন তাদের ক্ষমতায় আসতে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে, তেমনই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম সমতূল্য কোনও আন্দোলন তদের ক্ষমতা থেকে ছিটকে দিতে পারে।[কেন ভাঙড়ে যাচ্ছেন না মুখ্যমন্ত্রী? হিম্মত নিয়ে প্রশ্ন তুললেন সূর্যকান্ত মিশ্র]
ভাঙড় কাণ্ডের জন্য ভাঙড়বাসী আরাবুলকেই প্রাধানত দয়ী করছে। কারণ আরাবুলই সময় সুযোগ মতো তিন ফসলি জমির পর জমি ভয় দেখিয়ে কম দামে দখল নিয়ে রেখেছে। কোথাও তা চড়া দামে বিক্রি করেছে। কোথাও চড়া দামে বিক্রির ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছে। বিক্রি করা জমিতে দামি আবাসন গড়ে উঠেছে। সেই সব আবাসনের ওপর দিয়ে হাইভোল্টেজ তার গেলে আবাসন ব্যবসা মার খাবে। মানুষ কিনতে চাইবে না বুঝে আবাসন মালিকরা আরাবুলকে ব্যবস্থা নিতে বলে। এরপরই আরাবুল লোক খেপানো শুরু করে।[ভাঙড়ে যে গুজবের কারণে পাওয়ার গ্রিডের জমি নিয়ে আন্দোলনে গ্রামবাসীরা]
প্রোমোটারদের স্বার্থে এখন ময়দানে নেমে পড়েছেন আরাবুল। তিন ফসলি জমি ছলেবলে কেড়ে নেওয়ায় তাঁর প্রতি ক্ষোভ ছিলই মানুষের মধ্যে। এই সুযোগে সেই সব মানুষ প্রতিবাদে নেমে পড়ে। সেই প্রতিবাদ জমি ফিরে পাওয়ার জন্য। আবার মালিকদের স্বার্থে প্রতিবাদ বদলে যায় সাধারণ মানুষের স্বার্থের দিকে। আরাবুলের হাত থেকেও সম্পূর্ণ বেরিয়ে যায় আন্দোলনের রাশ।
তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশই মেন নিচ্ছেন, আরাবুলই যত নষ্টের গোড়া। তাকে প্রশ্রয়ও দেওয়া, পুষে রাখার ফল এসব। হাড়ে হাড়ে তা বুঝলেও, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে। নানাভাবে চাপ দিয়ে, লোভ দেখিয়ে ভাঙড়বাসীকে নিরস্ত করতে চাইছে তৃণমূল নেতৃত্ব। এর মধ্যে আগুনে ঘি ছড়িয়েছেন বিধায়ক ও মন্ত্রী আবদুর রেজ্জাক মোল্লার এক নিন্দনীয় বিবৃতি। আন্দোলনকারীদের হাইব্রিড বাচ্চা বলে কটাক্ষ করেছিলেন তিনি।
নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের প্রতিবাদ স্বতঃস্ফুর্ত আর ভাঙড়ের জমি আন্দোলন হাইব্রিড বাচ্চাদের কুকীর্তি? এই বক্তব্যে মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ যে আরাবুলের পাশে তাঁরা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রেজ্জাক মোল্লাকেও। একদা আদর্শবান বামপন্থী রাজনীতির ব্যক্তিত্ব, যিনি হজ করে এসেছেন, বর্তমানে মন্ত্রীও, তার কাছ থেকে মানুষ ভদ্রতাই আশা করে। তার বদলে রেজ্জাক মোল্লা মানুষকে অপমান করলেন। তিনি যা বললেন, তা মানবতার পরিপন্থী।
এখন ভাঙড়ে হাওয়ায় ভাসছে, গ্রেফতার হতে পারেন আরাবুল। পরিস্থিতি সামাল দিতে আরাবুলকে গ্রেফতারের সবুজ সংকেত দিয়েছে রাজ্য সরকার। নজর ঘোরানোর জন্য গ্রেফতার। মানুষকে আপাতত শান্ত করার জন্য ক'দিন হাজতবাস। পরিস্থিতি শান্ত হলে তারপর ফের বের করে আনা হবে তাঁকে। কিন্তু ভাঙড়ের মেজাজ বলছে অন্যকথা। এবার আর আরাবুলকে গ্রেফতারে ভাঙড়বাসীর ক্ষতে প্রলেপ পড়বে না।
ভাঙড়বাসী এবার একটা হেস্তনেস্ত চায়। তিন ফসলি জমি ফিরে চায়। তৃণমূল কংগ্রেস সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাণ্ডে 'অনিচ্ছুক' শব্দের আমদানি করেছিল। ভাঙড়ের মাথা তুলেছে সেই 'অনিচ্ছুকরাই'। তাদের দাবি পাওয়ার গ্রিড তৈরি হওয়ার তিন বছর আগে তারা রাজ্য প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে ন'দফা কারণ দেখিয়ে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিল। দাবি তুলেছিল তারা অনিচ্ছুক। তাদের রুজির তিন ফসলি জমি ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
তাদের বক্তব্য, টাটার প্রকল্প যদি বন্ধ করে দেওয়া যায়, দশ বছর পর কংক্রিট সরিয়ে যদি জমি চাষযোগ্য করে তোলা যায়, তবে পাওয়ার গ্রিড সরিয়ে তাদের জমি ফেরানো যাবে না কেন? এই প্রশ্নের মুখে পড়েই এখন সরকার পিছু হটছে। প্রয়োজনে 'তাজা ছেলে'র বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে কোমর বাঁধছে দল। বিষবৃক্ষ এখন বিষ ছড়াচ্ছে। ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছেড়ে কি কোনও লাভ আছে!












Click it and Unblock the Notifications