ভারতের দীর্ঘতম রাস্তা চলে গিয়েছে কলকাতার বুক চিরে, যার উল্লেখ আছে মহাভারতেও
ভারতের দীর্ঘতম রাস্তা চলে গিয়েছে কলকাতার বুক চিরে, যার উল্লেখ আছে মহাভারতেও
ভারত তথা এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং দীর্ঘতম প্রধান সড়ক পূর্বে উত্তরাপথ, সড়ক-ই-আজম, বাদশাহী সড়ক, সড়ক-ই-শেরশাহ নামে পরিচিত ছিল। আজও তা ভারতের দীর্ঘতম পথ হয়েই রয়েছে। ইতিহাসে তো বটেই, আজও বর্তমান। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বলে পরিচিত এই সড়ক কলকাতার বুক চিরে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত।

গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের বিস্তার
বিগত ২৫০০ বছর ধরে এটি মধ্য এশিয়াকে ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪০০ কিলোমিটার বা ১৪৯১ মাইল। বাংলাদেশের মায়ানমার সীমান্তের টেকনাফ থেকে পশ্চিমে কাবুল, আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাস্তা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং ঢাকা, ভারতের কলকাতা, এলাহাবাদ, দিল্লি এবং অমৃতসরের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করে পাকিস্তানের লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি ও পেশোয়ারের সঙ্গেও সংযোগসাধন করেছে এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড।

প্রাচীন ভারতে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
প্রাচীন ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় থেকে এই রোডের অস্তিত্ব রয়েছে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে উত্তরাপথ নামক এই প্রাচীন পথ ধরে হাইওয়ে তৈরি করেছিলেন। এই পথকে তিনি গঙ্গার মুখ থেকে সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত প্রসারিত করেছিলেন। এই রাস্তার আরও উন্নতি হয়েছিল সম্রাট অশোকের অধীনে। পুরনো রুটটি সুরি, সোনারগাঁও ও রোহতাসের সঙ্গে পুনরায় সংযোগসাধন করা হয়েছিল। মাহমুদ শাহ দুরানির অধীনে তা পুনর্নির্মিত হয়। ১৮৬০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ আমলে রাস্তাটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বর্তমানে বাংলাদেশের এনওয়ান, ফেনী, (চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা), এনফোর এবং এন৪০৫ (ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ), এন৫০৭ (সিরাজগঞ্জ থেকে নাটোর) এবং এনসিক্স (ভারতের পূর্ণিয়ার দিকে নাটোর থেকে রাজশাহী)-র সঙ্গে মিলেছে। ভারতের এনএইচ১২ (পূর্ণিয়া থেকে বকখালি), এনএইচ-২৭ (পূর্ণিয়া থেকে পাটনা), এনএইচ-২৯ (কলকাতা থেকে আগ্রা), এনএইচ-৪৪ (আগ্রা থেকে জলন্ধর হয়ে নতুন দিল্লি, সোনিপথ, পানিপথ, আম্বালা এবং লুধিয়ানা) এবং ওয়াঘা হয়ে এনএইচ-৩ (জালন্ধর থেকে আত্তারি, ভারতের অমৃতসর পাকিস্তানের লাহোরের দিকে), এন-৫ (লাহোর, গুজরানওয়ালা, গুজরাট, লালামুসা, ঝিলাম, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ার এবং আফগানিস্তানের জালালাবাদের দিকে খাইবার পাস) এবং আফগানিস্তানের গাজানি থেকে এএইচ-১ (তোরখাম-জালালাবাদ থেকে কাবুল) পর্যন্ত বিস্তৃত।

ভারতের জাতীয় মহাসড়ক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড উপরিউক্ত সমস্ত অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যাতায়াত ও ডাক যোগাযোগ উভয়ই সহজতর হয়েছে। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এখনও বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশে পরিবহনের জন্য প্রধান সড়ক, যেখানে রাস্তার কিছু অংশ প্রশস্ত করা হয়েছে এবং জাতীয় মহাসড়ক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রাচীন কালে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দ্বারা উত্তরাপথ বিস্তার লাভের আগেও বৌদ্ধ সাহিত্য এবং ভারতীয় মহাকাব্যে উল্লেখ রয়েছে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের। মহাভারতে উত্তরাপথ বা উত্তর রাস্তা বলে উল্লেখ রয়েছে। তা প্রমাণ করে বর্তমানে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের অস্তিত্ব ছিল। এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ভারতের পূর্বাঞ্চলকে মধ্য এশিয়া এবং প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিল।

মৌর্য সাম্রাজ্যে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
আধুনিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের অগ্রদূত ছিলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তাঁর দ্বারা সূচনা হয়েছিল গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ভারত বিস্তারের। এটি সুসা থেকে সার্ডিস পর্যন্ত বিস্তৃত মহাসড়কের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় ভারত এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অংশ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। উত্তর-পশ্চিমের শহর তক্ষশীলা এবং পুরুষপুরা (আধুনিক পেশোয়ার) যা বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত, তার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড।

আটটি ধাপে উত্তরাপথ নির্মাণ করেন চন্দ্রগুপ্ত
তক্ষশীলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সড়কপথে ভালোভাবে যুক্ত ছিল। মৌর্যরা তক্ষশীলা থেকে পাটলিপুত্র (বর্তমান ভারতের পাটনা)-এর মধ্যে তখন যোগাযোগ ছিল। এই অতি প্রাচীন মহাসড়কের রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছিল চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে। এই রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের কথা পাওয়া যায় মেগাস্থিনিসের পাণ্ডুলিপিতে। গ্রীক কূটনীতিক মেগাস্থিনিস মৌর্য দরবারে পনেরো বছর অতিবাহিত করেছিলেন। আটটি ধাপে নির্মিত এই রাস্তাটি পুরুষপুরা, তক্ষশীলা, হস্তিনাপুর, কান্যকুব্জ, প্রয়াগ, পাটলিপুত্র এবং তাম্রলিপ্ত শহরগুলির যোগ করেছিল।

অশোক ও কনিষ্কের আমলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
চন্দ্রগুপ্তের পথটি প্রাচীন উত্তরাপথ বা উত্তর পথের উপর দিয়ে নির্মিত হয়েছিল, যা পাণিনি উল্লেখ করেছিলেন। সম্রাট অশোক সেই রাস্তার বৃক্ষ রোপণ, প্রতি অর্ধেক কোসে কূপ নির্মাণ হয়েছিল। অনেক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে, এই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বরাবর পান্থশালা বা বিশ্রাম-গৃহও নির্মাণ হয়েছিল। সম্রাট কনিষ্কও উত্তরাপথ সংস্কার করেছিলেন।

সুর ও মুঘল সাম্রাজ্যে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
সুর সাম্রাজ্যের মধ্যযুগীয় শাসক শের শাহ ১৬ শতকে চন্দ্রগুপ্তের রয়্যাল রোড পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সোনারগাঁও এবং রোহতাসে পুরানো রুটটি আবার নতুন করে চালু করা হয় এবং এর প্রস্থ বৃদ্ধি পায়। এই রাস্তার ধারে ফলদ গাছ ও ছায়া গাছ লাগানো হয়। প্রতি দু-ক্রোশে একটি সরাই নির্মিত হয়। মহাসড়কের কিছু অংশে বাগানও তৈরি করা হয়। সরাইয়ে যারা থাকতেন তাদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হত। শের শাহের তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ বাংলা-অভিমুখী রাস্তায় অতিরিক্ত সরাই নির্মাণ করেন। মুঘলদের অধীনে আরও সরাই নির্মিত হয়েছিল। জাহাঙ্গীর তার শাসনামলে একটি ফরমান জারি করেন যে, সমস্ত সরাই পোড়া ইট ও পাথর দিয়ে তৈরি করা হবে। লাহোর এবং আগ্রার মধ্যবর্তী এলাকায় চওড়া পাতার গাছ লাগানো হয়েছিল এবং তিনি মহাসড়কের পথে অবস্থিত সমস্ত জলাশয়ের উপর সেতু নির্মাণ করেছিলেন। সেইসময় এই রোডকে সড়ক-ই-আজম এবং মুঘলদের আমলে বাদশাহী সড়ক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
১৮৩০-এর দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক উভয় উদ্দেশ্যে ধাতব রাস্তা নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করে। তখনই রাস্তাটি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিত হয়। কলকাতা, দিল্লি হয়ে কাবুল, আফগানিস্তান পুনর্নির্মিত হয়েছিল এই মহাসড়ক। পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট এবং একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পূর্ববর্তী থমাসন কলেজ অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, যা বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি রুরকি নামে পরিচিত) স্থানীয় সার্ভেয়ার, ইঞ্জিনিয়ার এবং ওভারসীয়ারদের নিয়োগ করে কাজ শেষ করে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড
ভারতজুড়ে এই মহাসড়ক বিস্তৃত। মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে ওই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। কলকাতার বুক চিরে চলে যাওয়া এই রাস্তার পাশে ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে একত্রিত করে ২০১৫ সালে উত্তরাপথ, বাদশাহী সড়ক, সড়ক-ই-আজম, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড-সমন্বিত শিরোনাম ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অস্থায়ী তালিকায় জমা দেওয়া হয়েছিল।

গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড আবার জিটি রোডও
মনোবিজ্ঞানীরা কখনও কখনও নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জিটি রোডের আশেপাশের এলাকাটিকে 'জিটি রোড বেল্ট' হিসাবে উল্লেখ করেন। উদাহরণস্বরূপ, হরিয়ানার নির্বাচনের সময় আম্বালা থেকে সোনিপথ পর্যন্ত জিটি রোডের উভয় পাশের এলাকাকে হরিয়ানার 'জিটি রোড বেল্ট' হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এমন আরও ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে জিটি রোড বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলা তথা কলকাতা ও হাওড়ার পার্শ্ববর্তী জেলাতেও জিটি রোডের উল্লেখ রয়েছে।
-
'মালদহ কাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার, পালানোর সময় বাগডোগরা থেকে ধৃত -
আরও একটি সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন, আর কত নাম নিষ্পত্তি হওয়া বাকি? -
বাংলায় ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী -
ভোটের আগেই কমিশনের কড়া নির্দেশ! অনুমতি ছাড়া জমায়েত নয়, নিয়ম ভাঙলেই গ্রেফতার, রাজ্যজুড়ে জারি কঠোর নির্দেশ -
দাগি নেতাদের নিরাপত্তা কাটছাঁট কতটা মানল পুলিশ? স্টেটাস রিপোর্ট চাইল নির্বাচন কমিশন -
যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই বড় রদবদল! মার্কিন সেনা প্রধানকে সরাল ট্রাম্প প্রশাসন, কারণ কী, জল্পনা তুঙ্গে -
আরও একটি মার্কিন F-35 যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের, কী বলছে আমেরিকা? -
এপ্রিলে শক্তিশালী ত্রিগ্রহী যোগ, শনি-সূর্য-মঙ্গলের বিরল মিলনে কাদের থাকতে হবে সতর্ক? -
এপ্রিলেই বাড়ছে গরমের দাপট! আগামী সপ্তাহেই ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ার আশঙ্কা, কী জানাচ্ছে হাওয়া অফিস -
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব! শিল্পে ধাক্কা, একলাফে বাড়ল ডিজেলের দাম, কত হল? জানুন -
পুর-নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ভোটের আগে তৃণমূলের দুই হেভিওয়েট নেতাকে ইডির তলব -
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ! MRI Scan-এর খরচ আকাশছোঁয়া হতে পারে, বিপাকে পড়তে পারেন রোগীরা












Click it and Unblock the Notifications