পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ! বহু পর্যটক আটকে; আসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তরের পাহাড়ে প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টি।আর এর জেরে কার্যত মাত্র ১২ ঘণ্টায় ২৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে দার্জিলিং, মিরিক, সুখিয়াপোখরিসহ একাধিক পাহাড়ি এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত। ধসে ভেঙে পড়েছে সেতু, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সহ প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ জন। স্থানীয়দের দাবি, এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৯৮ সালে, প্রায় ২৭ বছর আগে।

পুজোর আনন্দ মিলিয়ে যেতেই ফের প্রকৃতির রুদ্র রূপে বিপর্যস্ত হল উত্তরবঙ্গ। শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে দার্জিলিংয়ের মিরিক ও সুখিয়াপোখরি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানাগেছে। বহু হোমস্টে ভেসে গেছে, ধসে পড়েছে দুধিয়া নদীর ধারে থাকা বিএসএফ ক্যাম্পও।
জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনা ও পুলিশ ইতিমধ্যেই উদ্ধারকাজে নেমেছে, তবে আবহাওয়ার অবনতি বারবার বাধা দিচ্ছে তাতে।
পাহাড়ে একের পর এক ধসে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং, কালিম্পং ও সিকিম প্রায় সব দিকের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ।
১০ নম্বর জাতীয় সড়কের একাধিক স্থানে তিস্তার জল রাস্তার ওপর দিয়ে বইছে, ফলে বন্ধ শিলিগুড়ি সিকিম রুট। বিকল্প ৭১৭ রাস্তাও বন্ধ ডুয়ার্সের দিকে ধস নামায়।
৫৫ নম্বর জাতীয় সড়কে (শিলিগুড়ি-দার্জিলিং) দিলারাম, হুইসেলখোলা এলাকায় ধসের কারণে যান চলাচল বন্ধ। রোহিণীর রাস্তা ও দুধিয়া সেতু ভেঙে পড়ায় শিলিগুড়ি-মিরিক যোগাযোগ বিছিন্ন। ফুলবাড়ি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিজনবাড়ি, থানালাইনও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
তবে কিছু রাস্তা এখনও খোলা রয়েছে যেমন দার্জিলিং-মংপু হয়ে শিলিগুড়ির রাস্তা, পানবু রোড ও মিরিক-পশুপতি,ঘুম-কার্শিয়াঙ রুট।জানাগেছে প্রশাসনের তৎপরতায় কিছু পর্যটক সমতলে ফিরে এসেছেন, যদিও শতাধিক মানুষ এখনও পাহাড়ে আটকে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্যোগের খবর পেয়ে রবিবার সকাল থেকেই নবান্নে কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন।
তিনি জানান, "সকাল ৬টা থেকে আমি মনিটরিং করছি। পাঁচটি জেলার সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছি। আশা করছি, সোমবার বিকেল ৩টার মধ্যে উত্তরবঙ্গে পৌঁছব।" আটকে পড়া পর্যটকদের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আপনারা যেখানে আছেন, নিরাপদে থাকুন। প্রশাসন হোটেলগুলিতে অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার ব্যবস্থা করবে। সবাইকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও আমাদের।"
উত্তরবঙ্গের বিপর্যয়ে শোকপ্রকাশ করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।
প্রধানমন্ত্রী এক পোস্টে লিখেছেন, "দার্জিলিং ও সংলগ্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সব রকম সাহায্য করা হবে।"
রাষ্ট্রপতি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
এপ্রসঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের কর্মীদের মানুষের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর বার্তা, "মা দুর্গার আশীর্বাদে এই বিপদের মোকাবিলা সম্ভব হবে।"
জিটিএ প্রধান অনীত থাপা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র মিরিকেই অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ জোরকদমে চলছে।
অন্যদিকে, দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা দাবি করেছেন, "দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় বিপুল ক্ষতি হয়েছে প্রাণহানি, সম্পত্তির ধ্বংস, সরকারি পরিকাঠামোর ক্ষতি। রাজ্য সরকার যেন এটিকে রাজ্য বিপর্যয় ঘোষণা করেন।"
দুর্গাপুজোর সময় হাজার হাজার পর্যটক উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে বেড়াতে যান। হঠাৎ এই দুর্যোগে অনেকেই আটকে পড়েছেন দার্জিলিং, মিরিক ও কালিম্পংয়ে।
সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও প্রশাসন নিশ্চিত, এই সংখ্যা কয়েকশোর কম নয়। যাত্রীদের উদ্ধারে সেনা ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী লাগাতার কাজ চালাচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের এই প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফের মনে করিয়ে দিল পাহাড়ের অস্থির ভূপ্রকৃতির ঝুঁকি।
প্রশাসন সবরকমভাবে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ চালালেও পাহাড়ের জনজীবন স্বাভাবিক হতে বেশকিছু সময় লাগবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রীর সফরের পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে, তবে আপাতত পাহাড়ের আকাশে একটাই প্রার্থনা স্বস্তি ফিরুক।












Click it and Unblock the Notifications