সরকারি অনুষ্ঠানে আগে 'বন্দে মাতরম', পরে 'জনগণমন'! কেন্দ্রের নির্দেশে শুরু নতুন বিতর্ক, কী বলছে বিরোধীরা?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক, যার দায়িত্বে রয়েছেন অমিত শাহ, সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার নিয়মে তিনি পরিবর্তন এনেছেন। নতুন নির্দেশিকা অনুসারে, এখন থেকে 'জনগণমন'-এর আগে জাতীয় গান 'বন্দে মাতরম' গাওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পরেই দেশজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।

কী বলছে বিরোধীরা?
পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই সিদ্ধান্তের সময় এবং উদ্দেশ্য, দুটি বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর বলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গরিমা নিয়ে কোনওরকম আপত্তি নেই, কিন্তু তা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোট করাটাও একদম ঠিক নয়। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন যে, কিছু হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠন সবসময়ের জন্যেই রবীন্দ্রনাথের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনাকে অপছন্দ করে থাকে।
আরও এক মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য কটাক্ষ করে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় বঙ্কিমচন্দ্রকে 'বঙ্কিমদা' বলেছিলেন। সেই বিতর্ক চাপা দেওয়ার জন্যেই কী এরকম নির্দেশ?
শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের ভোট মাথায় রেখেই এরকম সিদ্ধান্ত। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধীও বলেন যে, বাংলার ভোটের আগে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন যে, এটি বিভাজনের রাজনীতি।
বিগত কয়েক বছর ধরেই তৃণমূলের রাজনৈতিক কৌশল হল, 'বাংলা এবং বাঙালি' ইস্যুকে সামনে রাখা। তাই কেন্দ্রের এরকম সিদ্ধান্তের পর তাদের অবস্থান নিয়ে অনেক কৌতূহল ছিল। দল মনে করছে যে, বাঙালিদের মন জেতার জন্যেই এইরকম পদক্ষেপ।
বিজেপির পাল্টা যুক্তি
বিজেপির দাবি যে, এতে নতুন কোনও কিছুই নেই। বরাবরই দলীয় অধিবেশনে সম্পূর্ণ 'বন্দে মাতরম' গানটি গাওয়া হয়। দলের প্রাক্তন সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত বলেন যে, গানটি যেহেতু ১৫০ বছর পূরণ হয়েছে তাই সেই উপলক্ষে তাকে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়াই একমাত্র উদ্দেশ্য। এর সাথে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, কংগ্রেস এবং বামেরাই পুরো ইতিহাস বিকৃত করছে। তাঁর দাবি যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনই গানটির কোনও অংশ বাদ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেননি। তিনি আরও বলেন যে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও গানটিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
বিজেপি অভিযোগ করে যে, অতীতে কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা 'বন্দে মাতরম' গানটিকে সাম্প্রদায়িক বলে মন্তব্য করেছে। আর এখন তারা উল্টো সুরে কথা বলছে।
নতুন নিয়মে কী বলা হয়েছে?
নতুন নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে যে, 'বন্দে মাতরম'-এর ছয়টি স্তবক ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের মধ্যে গাইতে হবে। জাতীয় পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে-পরে, রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের আগমন-প্রস্থান, নাগরিক সম্মান প্রদান অথবা কুচকাওয়াজে জাতীয় পতাকা আনার সময় এই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক।
উল্লেখ্য, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'বন্দে মাতরম' গানটি ১৮৭৫ সালে রচিত হয়েছিল এবং ১৮৮২ সালে 'আনন্দমঠ'-এ তা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই গানটি গেয়েছিলেন। এই গানটি স্বাধীনতা আন্দোলনে এর বিশেষ ভূমিকা ছিল। সংবিধান 'জাতীয় সঙ্গীত' এবং 'জাতীয় গান', দু'টিকেই মর্যাদা দিয়েছে। তবে এতদিন ধরে 'বন্দে মাতরম' গাওয়ার নির্দিষ্ট কোনও বিধি ছিল না।
একদিকে তৃণমূল এবং কংগ্রেসের অভিযোগ যে, ভোটের আগে আবেগ উসকে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি যে, দীর্ঘদিনের বিতর্কের ইতি টানা হল এবার।
ফলে 'বন্দে মাতরম' এবং 'জনগণমন', দুই ঐতিহাসিক গানের মর্যাদা ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন।












Click it and Unblock the Notifications