বাংলায় মহিলারা নিরাপদ নন, পুলিশের একাংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব রাজ্যপাল
রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস বাংলায় ছাত্রীদের উপর হওয়া ধর্ষণ বা যৌন হেনস্থার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। তাঁর মতে, এই ঘটনাগুলি একটি "গভীর আইন-শৃঙ্খলা সঙ্কট" এবং "ভয়ের পরিবেশ"-কেই তুলে ধরে।
পশ্চিমবঙ্গ মহিলাদের জন্য যে নিরাপদ নয়, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বলে উপলব্ধি রাজ্যপালের। তাঁর দাবি, এ রাজ্যে ক্রমাগত দুর্বল রাষ্ট্রের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল সতর্ক করে বলেছেন যে, যদি সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে "প্রচলিত ভয়ের মানসিকতা শুধু মহিলাদের মধ্যেই নয়, সমগ্র সমাজজুড়ে তীব্র হবে"। তাঁর মতে, একটি "দুর্বল রাষ্ট্র" হলো এমন এক রাষ্ট্র "যেখানে আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ দুর্বল"। এটি কোনও সভ্য সমাজের জন্য, বিশেষত গণতন্ত্রে, শুভ লক্ষণ নয়। একের পর এক ঘটতে থাকা এই ভয়াবহ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে কেউ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে যে, পশ্চিমবঙ্গ মহিলাদের জন্য মোটেই নিরাপদ স্থান নয়।"
গত ১০ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী তাঁর পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে রাতের খাবার খেতে ক্যাম্পাসের বাইরে গেলে তাঁকে গণধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনার পরই রাজ্যপাল ফের মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে সরব হলেন। ওই ছাত্রীটি ওডিশার বালাসোর জেলার জলেশ্বরের বাসিন্দা। এর আগে জুনে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের ক্যাম্পাসেও এক প্রথম বর্ষের ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হন।
রাজ্যপাল সরকার তথা প্রশাসনকে "পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে" আহ্বান জানান। দুর্গাপুর থেকে ফিরে আসার পর বোস পিটিআই-এর সঙ্গে কথা বলেন এবং তিনি সেই মেডিক্যাল ছাত্রী এবং তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গেও দেখা করেন।
রাতে মেয়েদের বাইরে না যাওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলেজগুলিকে যে পরামর্শ দিয়েছেন সেই প্রসঙ্গে রাজ্যপাল বলেন, "সমাজকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা উচিত যাতে মহিলারা, বিশেষ করে মেয়েরা, যে কোনও সময়, যে কোনও দিন, অবাধে চলাফেরা করতে পারেন। তবে আমি আমার সম্মানিত সাংবিধানিক সহকর্মী যা বলেছেন, তার রাজনীতিকরণ করতে চাই না।"
রাজ্যপাল বলেন, "সরকার আসতে পারে এবং যেতে পারে, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা এমন একটি বিষয় যেখানে কোনও আপস অনুমোদিত নয়। ভারতের সংবিধান অনুসারে, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। পুলিশের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, বাংলায় পুলিশের একাংশ দুর্নীতিগ্রস্ত, এই বিভাগের রাজনীতিকরণও হয়েছে। এটিকে অবশ্যই উপড়ে ফেলতে হবে এবং এটি ক্ষমতাসীন সরকারের দায়িত্ব।"
রাজ্যপাল বলেন, "পুলিশকে নিরপেক্ষ হতে হবে এবং আইনের শাসন মেনে চলতে হবে। কিন্তু রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোতে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এবং আমরা যা দেখছি তা হলো পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, যা বিশেষ করে রাজ্যের পুলিশিং-এ ঘটছে। বাংলার কিছু গ্রামে, যেখানে আমি পঞ্চায়েত এবং গত লোকসভা নির্বাচনের সময় গিয়েছিলাম, সেখানে 'গুণ্ডারাজ' রয়েছে, যা পুলিশ প্রতিরোধ করেনি।"
মালদহ উত্তর (উত্তর)-এর বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু এবং শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের উপর সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজ্যপাল বলেন, "রাজ্যপাল হিসাবে আমি কোনও সাধারণ মন্তব্য করতে চাই না। কিন্তু একজন সাংসদ, নির্বাচিত প্রতিনিধির উপর হামলা, বিশেষ করে যখন তিনি তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ। এটি গণতন্ত্রের নামে জনতার শাসনতন্ত্রের (mobocracy) মাধ্যমে আক্রমণ।" তিনি বলেন, এটি এমন কিছু যা কারও জন্য কোনও প্রশংসা এনে দেয় না। এটি প্রতিরোধ করতে হবে"।
সংবিধান বাংলায় "বিপদের মুখে" কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল বলেন, "বেঁচে থাকার অধিকার সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে অন্যতম। অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না, যা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই নয়, সংবিধানের প্রতিও হুমকি।"
গত বছরের আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত এক চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার কথা বলতে গিয়ে রাজ্যপাল বলেন, দ্রুত পদক্ষেপের অভাব দেখে তিনি "গভীরভাবে ব্যথিত ও স্তম্ভিত"। তিনি বলেন, "আমাদের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত না দিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলা সরকার এবং প্রত্যেকের কাছে তাদের দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা করে।
রাজ্যপাল সম্মিলিত দায়িত্বের আহ্বান জানান এবং সকল অংশীদারকে একত্রিত হয়ে বাংলাকে এমন একটি স্থান হিসাবে নিশ্চিত করতে অনুরোধ করেন "যেখানে মানুষ নিরাপদে, মর্যাদার সাথে এবং ভয় ছাড়াই বসবাস করতে পারে"।












Click it and Unblock the Notifications