নরেন্দ্রপুরে নেশামুক্তি কেন্দ্রেই খুন! হাত-মুখ বেঁধে সারারাত রড দিয়ে পিটিয়ে মারার অভিযোগ
মাত্র সপ্তাহখানেক আগে নেশা থেকে মুক্ত হতে নরেন্দ্রপুরের জীবন-জ্যোতি-তে এসেছিলেন রাজেশ চৌধুরী। মধ্যবয়সী এই ব্যক্তির বাড়ি গড়িয়াহাটে।
মাত্র সপ্তাহখানেক আগে নেশা থেকে মুক্ত হতে নরেন্দ্রপুরের জীবন-জ্যোতি-তে এসেছিলেন রাজেশ চৌধুরী। মধ্যবয়সী এই ব্যক্তির বাড়ি গড়িয়াহাটে। তাঁর নেশার আসক্তিতে অতিষ্ঠ পরিবার ভেবেছিল নেশামুক্তি কেন্দ্রে পাঠালে হয়তো সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারবেন রাজেশ। সেইমতো রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে থাকা জীবন-জ্যোতি নেশামুক্তি কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল তাঁকে।

অভিযোগ, নেশামুক্তি কেন্দ্রে আসার পর থেকেই রাজেশকে মারধর করা হত। নেশামুক্তি কেন্দ্রের কর্মীরা নেশা ছাড়ানোর নামে এই অত্যাচার করে বলে অভিযোগ কয়েক জন আবাসিকের। অনেক সময় কর্মীদের হাতে টাকা দিলে মারধরের মাত্রা কমে যায়। যারা বাড়তি অর্থ দিতে চাইতেন না তাঁদের কপালে বেধড়ক মারধর জোটে বলে অভিযোগ।
জীবন জ্যোতিতে আসার পর থেকেই রাজেশের উপরেও একইভাবে মারধর শুরু হয়েছিল বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ। তাঁদের আরও অভিযোগ যে ঠিকমতো খেতেও দেওয়া হত না।
রাজেশের সঙ্গে থাকা এক আবাসিকের অভিযোগ, রবিবার রাতে তাঁদের ঘর থেকে রাজেশকে বের করে নিয়ে যায় নেশামুক্তি কেন্দ্রের কয়েক জন কর্মী। প্রতিবাদ করতে গেলে রাজেশের ঘরের অন্য আবাসিকদের ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ।
এক আবাসিকের আরও অভিযোগ, রবিবার রাতে বেডিং রাখার ঘরের জানলায় রাজেশ বাঁধা হয়। জানলা খোলা থাকায় তাঁরা দেখতে পেয়িছিলেন রাজেশের দু'হাত জানলার সঙ্গে বাঁধা। রাজেশ যাতে চিৎকার করতে করতে না পারে তার জন্য মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়েছে। এমনকী দুটো পা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর নেশামুক্তি কেন্দ্রের কয়েক জন কর্মী সারারাত ধরে রাজেশকে দফায় দফায় মারধর করে বলে অভিযোগ। ওই আবাসিকের আরও দাবি, গোটা রাত ধরে প্রবল চিৎকার করছিলেন রাজেশ। মারধরের মাত্রা যত বাড়ছিল ততই চিৎকারের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাশের বাড়ির লোকজনও জানলা খুলে একটা সময় এই মারধর নিয়ে খোঁজ নিতে থাকে। অভিযোগ নেশামুক্তি কেন্দ্রে কর্মীরা জানিয়ে দেন যে নেশার করার জন্য একজন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেছে।
লোহার রড দিয়েও রাজেশের শরীরে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। রাজেশের সঙ্গী এক আবাসিকের দাবি, সোমবার সকালে জল জল বলে গোঙানি বের হচ্ছিল রাজেশের মুখ থেকে। নেশামুক্তি কেন্দ্রের কর্মীদের নজর এড়িয়ে তাঁরা জলও দেন। কিন্তু, এরপর পাশে থাকা বেডিং-এর উপরে রাজেশের মাথা হেলে পড়ে যায়। নেশামুক্তি কেন্দ্রের কর্মীদের চলাফেরাতে আবাসিকরা বুঝতে পারেন রাজেশ মারা গিয়েছেন।
খবর পেয়ে জীবন-জ্যোতিতে এসেছিল রাজেশের পরিবার। কিন্তু, দেহ ছাড়া হয়নি বলে অভিযোগ। রাজেশের গোটা শরীরে কালশিটে দাগ দেখে পরিবারের লোকেদেরও সন্দেহ হয়। আবাসিকরা গোটা ঘটনার কথা জানান। এরপর সোনারপুর থানায় যান রাজেশের পরিবার। কিন্তু, সেখানেও ৭ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে সন্ধ্যার কিছু আগে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়।
রাতে দেহ উদ্ধার করে সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু, অভিযোগ সেখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও কিছু সন্দেহ তৈরি হয় রাজেশের পরিবারের মনে। দেহ কিছুতেই গাড়ি থেকে নামিয়ে সোনারপুর হাসপাতালে ভিতরে পুলিশ নিয়ে যেতে রাজি ছিল না বলেও অভিযোগ। চিকিৎসক এভাবে দেহ দেখতে অস্বীকার করায় পুলিশ শেষমেশ রাজেশের দেহ স্টেচারে নামিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকের সামনে পরিবারের লোকজন রাজেশকে খুনের অভিযোগ আনেন। চিকিৎসকও রাজেশের দেহ খতিয়ে দেখে রহস্যজনক মৃত্যু বলে মন্তব্য করেন। মারধরের জেরে মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে বলেও পুলিশকে জানিয়ে দেন তিনি। এখন পর্যন্ত যা খবর এরপরই পুলিশ রাজেশের দেহ ময়নাতদন্তে পাঠিয়ে দেয়।
জানা গিয়েছে নেশামুক্তি কেন্দ্রের মালিক এবং তার এক কর্মীকে গ্রেফতারও করেছে সোনারপুর থানা। ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলার পক্ষ থেকে সোনারপুর থানায় যোগাযোগও করা হয়েছিল। কিন্তু, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টেলিফোন তুলে জানিয়ে দেন মহিলা ডিউটি অফিসার এখন ফ্রেস হতে গিয়েছেন। তিনি ফিরলে কিছু বললেও বলতে পারেন। ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল ফ্রেস হয়ে ফিরতে তাঁর কতক্ষণ সময় লাগবে। সোনারপুর থানায় ফোন ধরা ব্যক্তি জানিয়ে দেন এটা তাঁর পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তিনি উল্টে ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলার প্রতিনিধির ফোন নম্বর ও নাম নোটে তুলে নেন। জানান, ডিউটি অফিসার ফিরলে তিনি ফোন করে বিস্তারিত জানাবেন। এরপর অবশ্য কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও ফোন আসেনি। ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলার পক্ষ থেকে এরপর বারবার ফোন করা হয় সোনারপুর থানায় কিন্তু, হয় ফোন কেটে দেওয়া হয়, আর না হলে ফোন তুলে তা একপাশে রেখে দেওয়া হতে থাকে। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে না চেয়ে সোনারপুর থানার এমন লুকোচুরি খেলা কেন? এই প্রশ্ন কিন্তু নিশ্চিতভাবে উঠে আসছে। বিশেষ করে নেশামুক্তি কেন্দ্রে রহস্যভাবে মৃত্যু হওয়া রাজেশের পরিবারকে ৭ ঘণ্টা ধরে থানায় বসিয়ে রাখা এবং সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতালে দেহ নামানো নিয়ে পুলিশি টালবাহানা অনেক প্রশ্নই তৈরি করছে।












Click it and Unblock the Notifications