তৃণমূলের জয়যাত্রা ধাক্কা খেল সংখ্যালঘু প্রধান মুর্শিদাবাদে! সাগরদিঘিতে শাসকের হারে যেসব কারণ উঠে আসছে
তৃণমূল মানেই যে কোনও আসনে, যে কোনও উপনির্বাচনে জয়। এই মিথ ভেঙে দিল সাগরদিঘি। রাজ্যে বামশাসনের সময়েও এইরকম মিথ তৈরি হয়েছিল। যা একটা সময় ভেঙে যায়। এবার তৃণমূলের হারের পিছনে বিভিন্ন কারণ উঠে আসছে। মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেই এই হার বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সংখ্যালঘুদের বিমুখ হওয়া
২০২১-এর নির্বাচনের প্রচারে এনআরসি-সিএএ নিয়ে সংখ্যালঘু এলাকাগুলিতে প্রচার চালিয়েছিল তৃণমূল। যার ফল তারা হাতে নাতে পেয়েছিল। প্রায় ৬৮ শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত সাগরদিঘিতে ৫০ হাজারের বেশি ভোটে জয়লাভ করেছিলেন তৃণমূলের সুব্রত সাহা। যা ওই কেন্দ্রে তৃণমূলের জয়ের মার্জিনের রেকর্ডও বটে। যদিও পরবর্তী সময়ে নানা ঘটনা ঘটে গিয়েছে। ২০২২-এর শুরুতে হাওড়ার সংখ্যালঘু যুবক আনিস খানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা অনেককেই নাড়া দিয়েছিল। তাঁর বাবা অভিযোগ করেছিলেন, তিনতলার ছাদ থেকে ঠেলে ফেলা হয়েছিল তাঁর ছেলেকে। তাঁর বাবা সিবিআই তদন্তের দাবি করলেও রাজ্য সরকার তা মেনে নেয়নি। আনিস খানের মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই বীরভূমের রামপুরহাটের বগটুই গ্রামে ১০ সংখ্যালঘু নারী-শিশুকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে। যা নিয়ে সেই সময় তৃণমূল জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল বলেছিলেন সর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে মৃত্যু। পরে জানা যায় এর পিছনের ঘটনা। ঘটনার তদন্ত সিবিআই শুরু করলেও প্রধান অভিযুক্তের মৃত্যু হয় তাদেরই হেফজতে। বিরোধী এই ঘটনায় তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বের দিকেই আঙুল তুলেছিল। কারণ মৃত ও অভিযুক্ত সবাই তৃণমূলের। সাম্প্রতিক সময়ে নৌশাদ সিদ্দিকির দিনের পর দিন জেলে আটকে থাকার ঘটনাও অনেক মানুষকে ভাবিয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে সংখ্যালঘুরা যে বিমুখ হচ্ছেন তার ইঙ্গিত মিলেছিল বালিগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনের সময়েই। অন্তত তিনটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিক ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয়।

শিক্ষা দুর্নীতি এবং একের পর এক গ্রেফতার
বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুললেও গত ১২ বছরের তৃণমূলের শাসনে সব থেকে বড় দুর্নীতি হল শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি। এমনটাই বলেন বিরোধীরা। তা যে অনেকটাই সত্যি তার প্রমাণ হয়ে গিয়েছে আদালতের নজরদারিতে সিবিআই-ইডির তদন্তে। একদিকে যোগ্যদের চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ অন্যদিকে টাকার বিনিময়ে হাজার হাজার নিয়োগের অভিযোগ। তা যে কতটা সত্যি, তা হাইকোর্টের বিচারপতিদের নির্দেশেই পরিষ্কার। অন্যদিকে এই দুর্নীতির তদন্তের তৃণমূলের শীর্ষ স্তর থেকে নিচের স্তর পর্যন্ত এখনও অনেকেই জেলে। বিরোধীরা কটাক্ষ করে বলেন, পুরো শিক্ষা দফতরটাই জেলে। লক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকা, সোনার গয়না উদ্ধার করা হয়েছে তৃণমূলের প্রাক্তন মহাসচিব তথা তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাট থেকে। আবার মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত নিয়োগ কমিটির শীর্ষ কর্তার ফ্ল্যাট থেকেও লক্ষ লক্ষ টাকা ও গয়না উদ্ধার হয়েছে। যা তৃণমূলও অস্বীকার করতে পারছে না। আর শিক্ষা দুর্নীতি সামনে আসার পরে এটাই প্রথম বড় কোনও নির্বাচন হল।

সংগঠিত প্রচার
শুরু থেকেই বাম-কংগ্রেস সাগরদিঘিতে সংগঠিত প্রচার করেছে। নিজেদের মতো করে প্রার্থী ঠিক করার পরেও অধীর চৌধুরী তাঁকে সমর্থনের জন্য অনুরোধ করেন বিমান বসুকে। প্রবীণ বাম নেতা তা নিয়ে দেরি করেননি। অন্যদিকে প্রচারে মহঃ সেলিম থেকে যুব নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় সবাই প্রচারের অংশ নিয়েছেন। আর অধীর চৌধুরী তো নিয়ে পায়ে হেঁটে প্রচার করেইছেন সাগরদিঘি জুড়ে। ভোটেক ঠিক আগে সংখ্যালঘু কংগ্রেস নেতাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের অভিযোগ করে অধীর চৌধুরী প্রচারে সামিল করেছিলেন আনিস থানের বাবা সালেম খানকে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত সাগরদিঘির সংখ্যালঘু ভোটের বেশিরভাগটাই নিজেদের দিকে আনতে পেরেছে বাম-কংগ্রেস। এককথায় প্রচারে কোনও ফাঁক রাখতে দেননি বাম-কংগ্রেস নেতারা। যা এদিন জয়ের ইঙ্গিত আসতেই স্পষ্ট করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। পঞ্চায়েত নির্বাচনেও তিনি এই জোটের পক্ষে বলেও জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিরোধী জোট যাতে না হয়, তার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রার্থী নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন
অন্যদিকে সাগরদিঝির তৃণমূল প্রার্থী নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছিল শাসকের অন্দরমহলে। অভিযোগ উঠেছিল এই দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২১-এর নির্বাচনে সুব্রত সাহার বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও দলের একটা অংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মীয় হিসেবে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় টিকিট পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেছিল।












Click it and Unblock the Notifications