ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন, চলল এয়ার স্ট্রাইক, আটক প্রেসিডেন্ট মাদুরো
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে সেদেশের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাদক পাচার এবং ক্ষমতার অবৈধতার অভিযোগে মাদুরোর উপর কয়েক মাস চাপ সৃষ্টির পর শনিবার এই অভিযান চালানো হয়। এর পরপরই ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এবং অন্যান্য স্থানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়েছে।
ওয়াশিংটন ১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে লাতিন আমেরিকায় এমন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি। সেই সময়ও একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশাল পোস্টে বলেছেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা এবং এর নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সফলভাবে একটি বড় আকারের হামলা চালিয়েছে। মাদুরোকে তাঁর স্ত্রী-সহ আটক করে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।"

রাতে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে একটি "নারকো-স্টেট" পরিচালনার এবং গত বছরের নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ করেছিল, যা বিরোধীরা বিপুল ভোটে জিতেছে বলে দাবি করে। মাদুরো ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতায় আসেন। তিনি বারবার বলেছেন, ওয়াশিংটন দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ভেনেজুয়েলার সরকার জানিয়েছে, হামলায় অসামরিক ও সামরিক কর্মী নিহত হয়েছেন, তবে এই বিষয়ে কোনও পরিসংখ্যান দেয়নি।
ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় এই অভিযান চালানো হয়েছিল। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এলিট স্পেশাল ফোর্সের সেনারা মাদুরোকে আটক করেছে। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি উল্লেখ করেন, সেক্রেটারি অফ স্টেট মার্কো রুবিও তাকে জানিয়েছেন যে, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি করা হবে।
লি এক্স-এ লিখেছেন, রুবিও "মাদুরো এখন মার্কিন হেফাজতে থাকায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনও পদক্ষেপের আশা করছেন না।" পানামার ক্ষেত্রে, নোরিয়েগাকে ২০ বছর কারাবাস করতে হয়েছিল। ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদরিগেজ, যিনি সরকারের দায়িত্ব নিতে পারেন, তিনি মাদুরো বা তাঁর স্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে জানেন না বলে জানিয়েছেন।
বিভিন্ন লাতিন আমেরিকান সরকার মাদুরোর বিরোধিতা করলেও এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন তিনি চুরি করেছেন বললেও, যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি পদক্ষেপ অতীতের হস্তক্ষেপের বেদনাদায়ক স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এবং সাধারণত এই অঞ্চলের সরকার ও জনগণ এর তীব্র বিরোধিতা করে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো কর্তৃক উত্থাপিত "মনরো ডকট্রিন"-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের দাবিকে তুলে ধরেছিল। একই সাথে এটি ১৯০০-এর দশকের গোড়ার দিকে থিওডোর রুজভেল্টের অধীনে দেখা "গানবোট ডিপ্লোমেসি"-র কথাও মনে করিয়ে দেয়।
এদিন ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে কারাকাস, ভেনেজুয়েলায় বিস্ফোরণ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গিয়েছে। একটি ভিডিও স্ক্রিনগ্র্যাবে হেলিকপ্টার সেই ধোঁয়ার পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাডো নেতৃত্বাধীন ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল এক্স-এ একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই ঘটনাগুলো নিয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য নেই।
এদিন শনিবার ভোরের দিকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এবং অন্যান্য স্থানে একাধিক বিস্ফোরণ হয়। এতে মাদুরো সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। সরকার জানায়, মিরান্ডা, আরাগয়া এবং লা গুয়াইরা রাজ্যেও হামলা হয়েছে। ধোঁয়া এবং আকাশে উজ্জ্বল কমলা রঙের ঝলকানির ভিডিও দেখে বাসিন্দারা হতবাক ও ভীত হয়ে পড়েন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল এবং অন্যান্য বিভিন্ন দেশ দাবি করে যে মাদুরো ক্ষমতায় থাকার জন্য গত বছরের নির্বাচন কারচুপি করেছিলেন। মাদুরো বলেছেন, তাঁকে অবৈধভাবে উৎখাত করার জন্য একটি পশ্চিমী ষড়যন্ত্র চলছে। ট্রাম্প বারবার দক্ষিণ আমেরিকার এই তেল উৎপাদক দেশে স্থল অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সোমবার বলেছিলেন যে, মাদুরোর ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া "স্মার্ট" হবে।
ট্রাম্পের ঘোষণার আগে ভেনেজুয়েলার সরকার একটি বিবৃতিতে বলেছিল, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল দেশটির তেল ও খনিজ দখল করা। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একটি বড় সামরিক সমাবেশ করেছে, যার মধ্যে ক্যারিবিয়ানে একটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ এবং উন্নত ফাইটার জেট মোতায়েন রয়েছে।












Click it and Unblock the Notifications