আফগানিস্তানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, চরম উদ্বেগে সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীরা
কঠোর নৈতিকতার নামে দেশে এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিল তালিবান। মঙ্গলবার আফগানিস্তান জুড়ে নেমে এলো ভয়াবহ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। এর ফলে ৪৩ কোটি মানুষের দেশ কার্যত বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লক্স জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকেই আফগানিস্তানের একাধিক নেটওয়ার্ক হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি টেলিফোন পরিষেবাতেও বিঘ্ন ঘটে। এটিকে তারা "সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট" বলে উল্লেখ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী আফগানরা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। ভারতের দিল্লিতে বসবাসকারী ৩০ বছর বয়সী আফগান যুবক মোহাম্মদ হাদি সিএনএন-কে বলেন, "গতকাল থেকে আমরা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। কোনো উপায় নেই জানতে, ওরা নিরাপদ আছে কিনা। সবকিছু অচল হয়ে গেছে।"
ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার জেরে কাবুলমুখী একাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কাবুলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম তোলো নিউজ জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি এবং এএফপি জানায়, তারা কাবুল অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২১ সালে তালিবান ফের ক্ষমতায় ফেরার পর এটিই সবচেয়ে বড় ও পরিকল্পিত টেলিকম বন্ধ। এর ফলে আশঙ্কা বাড়ছে যে, তালিবানের আগের শাসনের মতো এবারও আফগানিস্তান সম্পূর্ণভাবে আধুনিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
কী কারণে এই ব্ল্যাকআউট, কতটা বিস্তৃত - তা এখনও স্পষ্ট নয়। তালিবানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। তবে এর আগে চলতি মাসেই তালিবান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, "অনৈতিক কার্যকলাপ ঠেকাতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা হবে।"
উত্তরাঞ্চলীয় বলখ প্রদেশের গভর্নর হাজি জায়েদ জানান, তালিবান প্রধান মাওলানা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। তবে "অনৈতিক কার্যকলাপ" বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
ডেনমার্কে থাকা আফগান সাংবাদিক ওয়াহিদা ফাইজি জানান, মাত্র কয়েক ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, যেন দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। তিনি বলেন, "প্রতিদিন কাজ শেষে বাবা-মায়ের কণ্ঠ শুনে শান্তি পেতাম। আজ বুঝতে পারছি, এমনকি খারাপ ইন্টারনেটও কত বড় আশীর্বাদ ছিল।"
মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছেন, এই পদক্ষেপ আফগানিস্তানের ভয়াবহ মানবিক সংকটকে আরও গভীর করবে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য বড় আঘাত হবে। কারণ, ষষ্ঠ শ্রেণির পর থেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকায় অনেকেই অনলাইনে বিদেশি শিক্ষক বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে পড়াশোনা চালাচ্ছিলেন। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে।
নারী অধিকার সংগঠন উইমেন ফর আফগান উইমেন (WAW)-এর কমিউনিকেশন ম্যানেজার সাবিনা চৌধুরী বলেছেন, "এই ব্ল্যাকআউট শুধু লাখো আফগানকে স্তব্ধ করছে না, তাদের বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে একমাত্র সংযোগও কেটে দিচ্ছে।"
জাতিসংঘের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন (UNAMA) আগেই জানিয়েছিল, তালিবানের দমননীতি বিশেষভাবে নারী ও কন্যাশিশুদের লক্ষ্য করে এক "ভয় ও ভীতির পরিবেশ" তৈরি করছে।
প্রবাসী আফগান নেত্রী মারিয়াম সোলাইমানখিল এক্স-এ লিখেছেন, "আমাদের মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুনিয়া যেন অন্ধকারে ডুবে গেছে।" তিনি আরও আহ্বান জানান, স্টারলিংক-এর মালিক ইলন মাস্ককে আফগানিস্তানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালুর ব্যবস্থা করতে।
তবে কোম্পানির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানে স্টারলিংক পরিষেবা নেই।সংক্ষেপে, আফগানিস্তানে তালিবান ঘোষিত ইন্টারনেট বন্ধ দেশকে আবারও বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। এতে সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের আতঙ্ক চরমে উঠেছে, আর আন্তর্জাতিক মহল নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।












Click it and Unblock the Notifications