ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান না হওয়ায় রুশ সেনাবাহিনীতে আটকে ৫০ জন ভারতীয়, প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন
ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে আরও একাধিক ভারতীয় পরিবারের স্বপ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতে এখনও রুশ সেনাবাহিনীতে আটকে রয়েছেন অন্তত ৫০ জন ভারতীয় নাগরিক। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হওয়া ২০২ জন ভারতীয়ের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন, নিখোঁজ রয়েছেন আরও সাতজন।
সংসদে সাংসদ সাকেত গোখলে ও রণদীপ সিং সুরজেওয়ালার প্রশ্নের উত্তরে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানান, সরকারি উদ্যোগে এখন পর্যন্ত ১১৯ জন ভারতীয়কে রুশ সেনা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৫০ জনকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চলছে।

১৭ ডিসেম্বর এই তথ্য প্রকাশ্যে আসে, ঠিক তার একদিন আগেই ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত দুই ভারতীয়র দেহ দিল্লী বিমানবন্দরে এসে পৌঁছয়। এর আগেও ভারত সরকার একাধিকবার সতর্ক করেছিল ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার জন্য। তবুও নতুন করে সামনে আসে এমন বহু ঘটনা, যেখানে ভারতীয় যুবকদের মোটা বেতনের লোভ দেখিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্র জানায়, অন্তত ১২ জন ভারতীয়ের মৃত্যু হয়েছে ও ১৬ জন নিখোঁজ। ২০২৪ সালের অগাস্টে জানানো হয়, ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীতে কর্মরত আট ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন।
বিদেশ মন্ত্রক (এমইএ) জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১০ জন মৃত ভারতীয়র দেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ও দু'জনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মৃত বা নিখোঁজ ১৮ জন ভারতীয়র পরিচয় নিশ্চিত করতে তাঁদের পরিবারের ডিএনএ নমুনা রুশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
যাঁরা রুশ সেনা থেকে মুক্তি পেয়েছেন, তাঁদের দেশে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি ও বিমান টিকিটের ব্যবস্থাও করেছে বিদেশ মন্ত্রক। মৃতদেহ শনাক্তকরণ, নথিপত্র সম্পূর্ণ করা ও পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেহ দেশে ফেরানোর কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বহু যুবক এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। ছাত্র বা পর্যটক ভিসায় রাশিয়ায় গিয়ে পরে তাঁদের বাধ্য করা হচ্ছে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে। অনেক ক্ষেত্রে বেতন আটকে রাখা হচ্ছে, আবার ফ্রন্টলাইন থেকে পালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে। এমনকি অপরাধে অভিযুক্ত কিছু ভারতীয়কে জেলের বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর বিকল্পও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
সম্প্রতি গুজরাটের মাজোতি সাহিল মহম্মদ হোসেনের ঘটনা সামনে আসে। পড়াশোনার ভিসায় রাশিয়া গিয়ে মাদক মামলায় গ্রেফতার হন তিনি। সাত বছরের জেল এড়াতে 'স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন' এ যোগ দেন, কিন্তু মাত্র তিন দিনের মাথায় ইউক্রেন বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
অন্যদিকে ইউক্রেনের পক্ষে গঠিত 'ইন্টারন্যাশনাল লিজিয়ন' এও প্রায় ১০০ জন ভারতীয় যোগ দিয়েছেন বলে বেসরকারি সূত্রের দাবি। সেখানে অন্তত দু'জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন, যদিও সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
এই মর্মান্তিক তালিকায় রয়েছেন রাজস্থানের ২২ বছরের অজয় গোদারা, যিনি পড়াশোনার ভিসায় রাশিয়ায় গিয়ে জোর করে সেনায় নিয়োগ পান ও ডোনেৎস্কে ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান। কেরলের এক যুবক ও উত্তরাখণ্ডের রাকেশ কুমার মৌর্যও যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন।
শোকস্তব্ধ পরিবারগুলির দাবি ন্যায়বিচার ও দ্রুত দেহ ফিরিয়ে আনা হোক। কেন্দ্র জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক স্তরে লাগাতার যোগাযোগ রাখা হচ্ছে, যাতে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় ও দ্রুত দেশে ফেরানো সম্ভব হয়।












Click it and Unblock the Notifications