বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র থেকে ‘শহিদ’, কে এই ওসমান হাদি?

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশ জুড়ে নেমে এসেছে অশান্তির ছায়া। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত হাদি শুধু একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নেতা ছিলেন না, বহু তরুণের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক।

হাদির উত্থান ঘটেছিল 'ইনকিলাব মঞ্চের' হাত ধরে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছিল, সেখানে এই মঞ্চ দ্রুত পরিচিতি পায়। আওয়ামি লিগের সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞার দাবিতে সরব হওয়া ও ভারতঘেঁষা রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই ছিল এই প্ল্যাটফর্মের মূল বৈশিষ্ট্য। সেই আন্দোলনের আহ্বায়ক হিসেবেই সামনে আসেন ওসমান হাদি। তাঁর আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান যেমন সমর্থক বাড়িয়েছে, তেমনই তৈরি করেছে তীব্র বিরোধিতাও।

সম্প্রতি তিনি তথাকথিত 'গ্রেটার বাংলাদেশের' একটি মানচিত্র ছড়িয়ে দেন, যেখানে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের অংশও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিষয়টি ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়। এরই মধ্যে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ৮ নম্বর কেন্দ্র থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছিলেন হাদি।

১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকার কালভার্ট রোডে অটো রিকশায় যাওয়ার সময় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা তাঁকে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জিক্যাল আইসিইউ তে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন চিকিৎসকরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে ও একাধিক অঙ্গ বিকল হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যু হয়। সিঙ্গাপুরের বিদেশ মন্ত্রক আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে।

হাদির মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে 'শহিদ' আখ্যা দেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে গভীর শোকপ্রকাশ করে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন ও নাগরিকদের সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান।

ঢাকায় শাহবাগে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র প্রথম আলো ও দ্যা ডেইলি স্টারের দপ্তরে ভাঙচুর চালানো হয়। রাজশাহিতে বিক্ষোভকারীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ও আওয়ামি লিগের একটি কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। চট্টগ্রামে ভারতের উপ হাইকমিশনারের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ ও পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জাতীয় ছাত্র শক্তির পক্ষ থেকে শোকমিছিল বের হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কুশপুতুল দাহ করে তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। অভিযুক্তকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণার পাশাপাশি পুলিশ মূল অভিযুক্ত6 ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মা, স্ত্রী ও এক বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করেছে।

রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাদির মরদেহ ঢাকায় আনার আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের দাবিতে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে আন্দোলনের সুর। ছাত্রনেতা ওসমান হাদির মৃত্যু যেন নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ কোন পথে এগোচ্ছে, আর এই অস্থিরতার শেষ কোথায়?

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+