বাড়ি যাওয়ার জন্য নেই বাস, ক্ষোভ বাড়ছে পরিযায়ীদের মধ্যে, সংঘর্ষ পুলিশের সঙ্গে
পরিযায়ী শ্রমিকদের হেঁটে বাড়ি ফেরা থেকে বিরত রাখতে মহারাষ্ট্র সরকার কিছুদিন আগে থেকেই শুরু করেছে বিশেষ বাস পরিষেবা। এই বাসে করেই আটকে পড়া শ্রমিকদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু অনেকেই এই বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও বাসে আসন মিলছে না তাঁদের। করোনা সংক্রমণের জন্য দেশজুড়ে চলছে লকডাউন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে রয়েছে বহু পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁরা পায়ে হেঁটেই বহু কিমি রাস্তা পার করে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন।

বিজাসন ঘাটে অপেক্ষায় শত শত পরিযায়ী
মহারাষ্ট্র থেকে মধ্যপ্রদেশ ও অন্যান্য রাজ্যে যাওয়ার গেটওয়ে বিজাসন ঘাটে গত দু'দিন ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন শম্ভু রাজভর। তিনি তাঁর রাগ, হতাশা ও হতাশার তীব্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি দু'দিন ধরে বাসের আশায় ছিলেন যা তাঁকে পরবর্তী সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবে। এরপর তাঁর দীর্ঘ যাত্রা শেষ হবে উত্তরপ্রদেশের নেপাল সীমান্তের মহারাজগঞ্জ জেলায়। তিনি যদিও একা নন। গত সপ্তাহে দু'দিন ধরে মহারাষ্ট্রের ১৩ হাজার পরিযায়ী শ্রমিক বারওয়ানি জেলার এই ঘাটে আসেন। কোভিড মহামারীর মাঝে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গে বাড়ি ও পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধান করছেন। মুম্বইয়ের রাজভরের মতো কেউ ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করে রাখেননি। অনেকেই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন যে বৃহস্পতিবার তাঁদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই পুলিশের সংঘর্ষ বেঁধে যায়, পুলিশের দিকে পাথর ছুঁড়তে থাকেন তাঁরা এবং হাইওয়ে অবরোধ করেন।

১০ জুন বাস পরিষেবা চালু করে মহারাষ্ট্র সরকার
গত ১০ জুন থেকে মহারাষ্ট্র সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে বাড়ি যাওয়ার বদলে বিশেষ বাস করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এই বাসগুলি বিজাসন ঘাট থেকে ছাড়ছে। কিন্তু বাসের আসন নিয়ে এই এই জায়গাটি রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। মহারাষ্ট্রের পরিবহন মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রায় ১৩.৬ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে বিভিন্ন রাজ্যের সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, ‘প্রায় ৭০ শতাংশকে মধ্যপ্রদেশ সীমান্তে পৌঁছানো হয়েছে।' বারওয়ানির এসপি ডি আর টেনিওয়ার বলেন, ‘প্রত্যেক দিন গড়ে দশ হাজারেরও বেশি শ্রমিককে এখানে নামানো হচ্ছে। আমরা এই ভিড় কিছুটা কমানোর জন্য মহারাষ্ট্র সরকারকে বলেছি। এই ঘাট থেকে অন্য রাজ্যের সীমান্তগুলির দুরত্ব ৬০০ কিমি। এটা একেবারেই সম্ভব নয় বাসগুলি সীমান্তে গিয়ে দ্রুত ফিরে আসবে এবং শ্রমিকদের ভিড় কমাবে।' সীমান্তগুলিতে আলাদা করে যাত্রী তোলা ও নামানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বড় বড় তাঁবু তৈরি করা হয়েছে। মহারাষ্ট্র থেকে আসা বাসগুলি ঘাট সংলগ্ন মাতা মন্দিরের কাছে মধ্যপ্রদেশের ভিতরে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে গিয়ে থামে। পরিযায়ী শ্রমিকদের যেখান থেকে তোলা হবে সেটি এক কিমি দূরে ভাওয়ারগড় গ্রাম থেকে।

বাস নেই, বাড়ছে ক্ষোভ
দু'টি জায়গাতেই দেখা গেল শত শত পরিযায়ী শ্রমিক পরবর্তী বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁদের কাছে না রয়েছে খাবার আর না তাঁরা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে পারছেন। ৪০ বছরের রাকেশ বর্মা, পেশায় শ্রমিক বাস থেকে নেমে উত্তরপ্রদেশের তাঁবুতে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, ‘৪০০ টাকা পকেটে নিয়ে আমি সুরাত থেকে হাঁটা শুরু করি এবং মহারাষ্ট্রে প্রবেশ করি, এরপর আমায় থামানো হয় ও সরকারি বাসে উঠিয়ে দেওয়া হয়।' বর্মাকে যাত্রী তোলার জায়গায় হেঁটে যেতে বলা হয়েছিল, যেখানে আগের রাত থেকেই বহু শ্রমিক বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ঝাড়খণ্ডে যাওয়ার জন্য দিনরাত বাসের জন্য অপেক্ষারত ৩৭ বছরের আখতার খান বলেন, ‘আমাদের জন্য কেউ ভাবে না।' তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা সারি তৈরি করে দাঁড়াতে বলা হয় এবং সূর্যের প্রখর তেজের নীচেই আমরা দাঁড়িয়ে থাকি কিন্তু বাস কোথায়?'

পিক–আপ পয়েন্টে না দেওয়া হয়েছে জল, খাবার
ওড়িশায় যাওয়ার ৫০ জনের একটি শ্রমিক দলের ২২ বছরের রমেশ মানে বলেন, ‘আমাদের শুধু একটা বাস দরকার, কিন্তু ওরা তাও পাঠাচ্ছে না।' মানে মুম্বইয়ে শ্রমিকের কাজ করেন এবং শুক্রবার রাত ২টোর সময় তাঁকে এই সীমান্তে নামিয়ে দেওয়া হয়। ২৬ বছরের ইমতিজাজ আলম ভাগলপুরে যাবেন বলে সংগ্রাম করছেন। তিনি বলেন, ‘দয়া করে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকে বলুন এখানে আমাদের জন্য কোনও বাস নেই।' মুম্বইয়ে কাজ করেন পেশায় ছুতোর রাজ মনগজ যাদব বলেন, ‘আমরা এখানে সারা জীবনের জন্য তো বসে থাকতে পারি না। জল নেওয়ার জন্য আমি রাস্তা পার করতে গিয়ে পুলিশের লাঠি খেয়েছি। আমাদের আগের দিন রাতে এখানে ফেলে দিয়ে গিয়েছে আর ডালের খিচুড়ি দিয়েছে খেতে। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে আমাদের কেউ কিছু খেতে দেয়নি।'

মধ্যপ্রদেশ সরকার সাময়িক স্বস্তির জন্য বাস চালু করেছে
এরকম অবস্থায় তিক্ততা দূর করার জন্য মধ্যপ্রদেশ সরকার সাময়িককালের জন্য সমাধান বের করেছেন। ২০টি বাসে করে কিছুজন পরিযায়ী শ্রমিককে ২০০ কিমি দূরে দেওয়াসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই বাসগুলি যখনই আসছে তখনই হাজার জন তাতে ভিড় জমিয়ে ফেলছে, ঠেলাঠেলি হচ্ছে বাসে ওঠার জন্য। ঘাটের এক পুলিশ অফিসার বলেন, ‘একটা পয়েন্টে ১৩ হাজার শ্রমিক রয়েছে, এবং পর্যাপ্ত বাসও নেই তাঁদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরা ১৪১টি বাসের পরিষেবা দিয়েছি শনিবার সকাল পর্যন্ত। কিন্তু সেগুলিকে ফেরত আসার সময় দিতে হবে। আরও ২০টি বাস পৌঁছানোর কথা। তাহলে আরও কিছুটা ভিড় কমবে।'












Click it and Unblock the Notifications