সংরক্ষণ তুলে দেওয়া নিয়ে রাহুল গান্ধীর মন্তব্য কি আদতে ভারতের ইতিবাচক পথে হাঁটায় বাধা?
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলোচনা সভায় সংরক্ষণ নিয়ে একটি মন্তব্য করেছেন। যা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। ভারতে জাতভিত্তিক সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্ন যখন রাহুল গান্ধীকে করা হয় তখন তিনি বলেন, আমরা সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার কথা ভাবব, যখন ভারতে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখনও ভারতে তেমন অবস্থা নেই। আর এই মন্তব্য নিয়েই তুমুল আলোচনা চলেছে। একদিকে কংগ্রেসের মনোভাব, অন্যদিকে ভারতীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার প্রেক্ষিত দুটোই বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে।

- ইতিবাচক পদক্ষেপে বারবার ঐতিহাসিক বাধা
কংগ্রেস দল বরাবরই সংরক্ষণ নিয়ে বেসুরো ছিল। এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ থেকে দূরে থেকেছে। যদিও বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া শ্রেণীকে নিজেদের কাছে এনে সুবিধে পেতে কংগ্রেস ছাড়েনি। দলের অন্যতম প্রধান নেতা জওহরলাল নেহরু নানা সময় বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে গিয়েও থমকে গিয়েছেন।
পরে ইন্দিরা গান্ধীর সময় সংরক্ষণ নীতি নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়। রাহুল গান্ধীর পিতা তথা ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী আপত্তিকর মন্তব্যও করেছিলেন। তিনি ওবিসি সম্প্রদায়কে বুদ্ধু বা বোকা বলে কটাক্ষ করেন। যা নিয়ে সেই সময়ে দারুণ সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।
বিরোধীরা বারবার কংগ্রেসের এই অবস্থানের সমালোচনা করেছে। আদৌও কংগ্রেস পিছিয়ে পড়া তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর উন্নয়ন চায় কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে।
রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিকতম মন্তব্য সেই ভাবনাকেই ফের একবার উসকে দিয়েছে। অনেকে ভয় পাচ্ছেন, কংগ্রেস ফের একবার সুযোগ পেলে সংরক্ষণ নীতি নিয়ে অন্যরকম পদক্ষেপ করতে পারে বা সংরক্ষণ তুলে দিতে পারে।
- সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন
ভারতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ভিত্তিতে অনেক সামাজিক স্তর রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নানা উন্নয়নের কাজ হলেও বাস্তব হল, জাতিগত ভিত্তিতে অনেক অসাম্য সমাজে রয়ে গিয়েছে। ফলে তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মানুষকে সংরক্ষণ দিয়ে তাঁদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সুযোগ করে দেওয়া নিশ্চিতভাবে এক ইতিবাচক পদক্ষেপ সাম্যবাদী সমাজ গড়ার।
সংরক্ষণ যখন শুরু হয়েছিল, তখন যেমন তার প্রয়োজন ছিল, আজকের দিনে দাঁড়িয়েও তা সমান প্রাসঙ্গিক। জাতির ভিত্তিতে ভেদাভেদ এবং আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করা- এ জিনিস এখনও চলছে। যার ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং প্রাথমিক অধিকার থেকে বহু মানুষ এখনও বঞ্চিত। ফলে ইতিবাচক পদক্ষেপ করে শুধুমাত্র এই শ্রেণীর মানুষকে উপরে তুলে ধরাই নয়, ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি আটকানোও আশু প্রয়োজন। বিজেপি সরকার তাঁদের সময় বিভিন্ন নীতি বলবৎ করে সমতা রক্ষার একটি প্রয়াস করেছে।
- কংগ্রেসের ট্র্যাক রেকর্ড: চিন্তার বিষয়?
কংগ্রেসের সমালোচকেরা মনে করছেন, রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক মন্তব্য কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সদর্থক পদক্ষেপকে ভেস্তে দিতে চাওয়ার বহুদিনের প্রচেষ্টা। বহু বিশেষজ্ঞ আইনের বাইরে গিয়ে তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি ও ওবিসিদের পিছিয়ে দিতে চাওয়া কংগ্রেসি ভাবনার সমালোচনা করেছেন।
উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ২০০৫ সালে কংগ্রেসের ৯৩ তম সংশোধনীতে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলিকে সংবিধানে উল্লিখিত সংরক্ষণ সম্পর্কিত বিধান মানা থেকে ছাড় দেওয়া হয়। এই ঘটনায় অনেকে মনে করছেন, আদতে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে সত্যিকারের পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর বদলে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছে কংগ্রেস।
পাশাপাশি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান- যেমন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি ও ওবিসিদের আরও কোণঠাসা করা হয়েছে যাতে সংখ্যালঘুদের তোষামোদ করা যায়।
সমালোচকেরা মনে করেন, কংগ্রেস দল ও তাঁদের নেতা রাহুল গান্ধী সংরক্ষণকে হিন্দুদের মধ্যে বিভাজন ও সংখ্যালঘু ভোটকে বিশেষ করে মুসলমান ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করার অস্ত্র হিসাবে মনে করেন। ফলে অনেকেই, এমনকী দলের মধ্যেও নেতারা এই অবস্থানকে সামাজিক নয় বরং রাজনৈতিক সুবিধা পেতে নেওয়া পদক্ষেপ হিসাবেই দেখেন।
- বৃহত্তর প্রভাব
রাহুল গান্ধীর মন্তব্য, যা তিনি বুঝে বলুন অথবা মুখ ফসকে, তা ফের এক নয়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদি কংগ্রেস দল সত্যিই ভবিষ্যতে সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার কথা ভাবে, তাহলে ভারতের সামাজিক বুনোটে তা সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। ভারতের মতো এমন বিবিধ দেশে সংরক্ষণ নিয়ে এমন পদক্ষেপ করা যায় কিনা বা এমন মনোভাব মনে পোষণ করাও যায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
ফলে সবশেষে বলা যায়, রাহুল গান্ধীর মন্তব্য, - আমরা সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার কথা ভাবব, যখন ভারতে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এখনও ভারতের তেমন অবস্থা নেই। - আদতে নিজেই সমস্যাজীর্ণ। ভারতের মতো বিবিধতার দেশে সামাজিক ন্যায় বা সামাজিক উন্নয়নকে সমান্তরাল সরলরেখায় বিচার করলে হবে না, সমস্যার গভীরে গিয়ে তা সমাধানের পথ বাছতে হবে। ভারতের প্রেক্ষাপটে বা জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী একটি প্রক্রিয়া। বরং সংরক্ষণ তুলে দিলে উল্টে এতগুলি দশকের উন্নয়নকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা আবার পিছন পথে হাঁটা লাগাব।












Click it and Unblock the Notifications