করোনা ভাইরাস কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে? কী বলছেন বিশেষজ্ঞ–চিকিৎসকরা জেনে নিন
করোনা ভাইরাস কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে?
করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ওয়েভের সংক্রম খুব দ্রুত সব বয়সের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে হৃদরোগীদের একটু বেশি মাত্রায় সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা। খ্যাতনামা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ নরেশ ত্রেহান এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাতকারে হৃদরোগীদের সতর্ক ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। ডাঃ ত্রেহান উদাহরণ স্বরূপ জানিয়েছেন যে অধিকাংশ রোগীরই পূর্বে হৃদরোগ সংক্রান্ত কোনও উপাদান না থাকা সত্ত্বেও তাঁরা হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আসুন দেখে নেওয়া যাক ডাঃ ত্রেহান ঠিক কি বলতে চাইছেন।

ঝুঁকিতে হৃদরোগীরা
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন যে কমপক্ষে ১৫-২০ শতাংশ রোগীর হৃদযন্ত্রে এই ভাইরাস প্রভাব ফেলে। যে সব রোগীদের হৃদরোগ সংক্রান্ত অসুস্থতা রয়েছে বা যাঁদের হৃদযন্ত্রে স্টেন বসানো রয়েছে বা যাঁদের বাইপাস সার্জারি হয়েছে তাঁদের করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার সাহায্য নিতে দেখা গিয়েছে। ডাঃ ত্রেহান জানিয়েছেন, কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হল অনেক রোগীরই পূর্বে হৃদযন্ত্রের কোনও সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও তাঁরা হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর সঙ্গে তিনি এও যোগ করেছেন যে অধিকাংশ কেসে রোগীরা বুকে ব্যাথার অভিযোগ করেছেন এবং তাঁদের বাঁচানো সম্ভব হতে পারে, তবে কিছু ক্ষেত্রে অ্যাটাক এত দ্রুত ও তীব্র হয় যে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। চিকিৎসক বলেন, 'তাঁদের হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ১০-১৫% এ চলে যায়, এগুলি তাঁদের মৃত্যুর মারাত্মক ঝুঁকির সামনে তুলে ধরে।'

তরুণ রোগীরা হৃদরোগে আক্রান্ত
ডাঃ ত্রেহান বলেন, 'আমরা যেটা লক্ষ্য করছি তা হল গত বছরের তুলনায় (কোভিডের প্রথম ওয়েভ) এ বছর হৃদরোগের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন বৃদ্ধদের চেয়ে বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অল্প বয়স্করা।' তিনি উদ্বেগজনক উদাহরণগুলির উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, যেখানে অল্প বয়স্ক রোগীদের হঠাৎ করে ফুসফুশ ফুলতে শুরু করে, ফুসফুসের টিস্যু এবং বায়ু স্থানে তরল জমে যা শ্বাসকষ্ট এবং অবশেষে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৭০% তীব্র মায়োকার্ডাইটিসে (হার্টের পেশির প্রদাহ) আক্রান্ত হন, যা তাঁদের জীবনের আয়ুকে কম করে তুলছে। তিনি বলেন, 'এই ভাইরাল ওয়েভ প্রথম ওয়েভের চেয়েও সাংঘাতিক, যেখানে আগে কোনও হৃদরোগের চিহ্ন না থাকলেও ৩৩ বছরেরও কম বয়সীদেরও হৃদরোগে আক্রান্ত হতে হচ্ছে।'

সময়মতো চিকিৎসকের হস্তক্ষেপে বাঁচতে পারে প্রাণ
ডাঃ ত্রেহান জানিয়েছেন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধরনের রোগীদের স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও অনেকটা দেরি হয়ে যায়। তিনি বলেন, 'একমাত্র এই সব রোগীদের সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং রোগী সুস্থ হয়ে উঠবেন এই আশ্বাস নিয়ে তাঁদের ইসিএমও সাপোর্টে কয়েক সপ্তাহের জন্য রাখা যেতে পারে।' বৃদ্ধ ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য যতটা বিপদজ্জনক এই মহামারি ঠিক ততটাই বিপদ রয়েছে তরুণদের ক্ষেত্রেও, সতর্ক করেন তিনি।

উদ্বেগ নয়, চাপমুক্ত হন
ডাঃ ত্রেহান জানিয়েছেন যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে উদ্বেগ খুব গুরুতর ভূমিকা পালন করে। তিনি জানিয়েছেন যে উদ্বেগ বৃক্করসকে ওপরে তুলে দেয়, যা রক্তচাপকে বাড়িয়ে, হৃদস্পন্দন বাড়ায় যা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে। এই উদ্বেগ থেকে মুক্ত হওয়ার তিনটে পদ্ধতি জানিয়েছেন চিকিৎসক। তিনি বলেন, 'প্রথম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আপনাকে নিয়মিত শরীর চর্চা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আপনি আক্রান্ত হোন বা না হোন নিয়মিতভাবে চাপমুক্ত থাকার পদ্ধতি বের করতে হবে এবং তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকর পুষ্টি বজায় রাখতে রোজ কমপক্ষে ৩০-৪০ গ্রাম প্রোটিন খেতে হবে।' তিনি এও জানিয়েছেন যে শরীরে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে যোগাভ্যাস ও নিঃশ্বাস সংক্রান্ত ব্যায়াম করা ভালো।

সতর্ক চিহ্নগুলি কি
কার্ডিওলজিস্টরা সর্বদাই প্রত্যেক হৃদরোগীর ক্ষেত্রে সতর্ক চিহ্নগুলি নিয়ে কথা বলে থাকেন এবং এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি জানিয়েছেন, যাঁদের আগে থেকে হৃদরোগের সমস্যা আছে তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী বা কম হয়ে যাওয়ার দিকে এবং পাল্স অক্সিমিটার দিয়ে অক্সিজেন সম্পৃক্তততা পরীক্ষা করতে হবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে। ত্রেহান বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে হাল্কাভাবে নেওয়া উচিত নয়।'

হৃদরোগীদের জন্য ভ্যাকসিন নিরাপদ?
ডাঃ ত্রেহান জোর দিয়ে জানিয়েছেন যে হৃদরোগীদের জন্য টিকাকরণ একেবারে নিরাপদ। তবে তিনি পরামর্শ দেন যে যাঁদের রক্ত পাতলা তা যেন টিকা যাঁরা দিচ্ছেন তাঁদের আগে থেকে বলে দেওয়া হয়। 'যদিও বেশিরভাগ ব্যক্তি যদি আগে থেকে তাঁর রক্ত পাতলা হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেন তবে তাঁকে টিকা কর্মীরা সেইভাবেই ভ্যাকসিন দেবেন।' টিকা কর্মীরা ইঞ্জেকশনের জায়গায় তিন মিনিট ধরে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাবেন।' হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন যে কোনও সহজাত ঝুঁকি হ্রাস করতে এই সময়ে রোগীদের এবং তাঁদের চিকিৎসকদের মধ্যে যোগাযোগ তীব্র হওয়া প্রয়োজন।

তড়িঘড়ি হাসপাতালে নয়
চিকিৎসক আবেদন করেছেন যে পরিস্থিতি সেরকম না হলে তড়িঘড়ি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। 'প্রতিরোধমূলক যত্নের মতো কোনও জিনিস নেই। ক্রমাগত পর্যবেক্ষণের দরকার।' জানিয়েছেন ত্রেহান। তিনি এও জানান যে অধিকাংশ করোনা রোগী সময়মতো চিকিৎসা ও ওষুধের ফলে বাড়িতেই সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাংর মতে, আরটি-পিসিআর টেস্ট রিপোর্ট পজিটিভ আসার পর স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এখন সব চিকিৎসকই কোভিড চিকিৎসার নিয়ম জানেন এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করবেন।'
ভারতে রবিবার নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪০৩,৭৩৮ জন এভং একদিনে ৪,০৯২ জন মারা গিয়েছেন। বর্তমানে ভারতে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সংখ্যা ২২,২৯৬,৪১৪ জন।












Click it and Unblock the Notifications