ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সময়েই অলৌকিক ভাবে বাড়িতে এসে পৌঁছায় রাজার উপহার, শুরু হয় ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসব

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সময়েই অলৌকিক ভাবে বাড়িতে এসে পৌঁছায় রাজার উপহার, শুরু হয় ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসব

আজ থেকে প্রায় ২২৪ আগে শুরু হয় ঘোষ পরিবারের প্রাচীন দুর্গাপূজা। যদিও এই হিসাব প্রাচীন তালপাতার প্রাচীন পুথিতে লেখা বঙ্গাব্দ থেকে প্রাপ্ত। পরিবারের সদস্যদের মতে পূজার বয়স আরও প্রাচীন।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সময়েই অলৌকিক ভাবে বাড়িতে এসে পৌঁছায় রাজার উপহার, শুরু হয় ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসব

ঘোষ পরিবারের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বর্ধমান জেলার কোনো এক অখ্যাত গ্রামে(মতান্তরে বাংলাদেশ)। পূর্বপুরুষীয় উত্তরাধিকার সুত্রে এই বংশের স্বর্গীয় পূর্বপুরুষ নর্মদা ঘোষ বসবাস শুরু করে এই খসমরা গ্রামে। সদগোব বংশীয় এই পরিবারের তৎকালীন আরাধ্য দেবতা ছিলেন শ্রী শ্রী মধুসূদন জীউ । নর্মদা ঘোষের পুত্র দামোদর ঘোষ এবং দামোদর ঘোষের পুত্র রামরাম ঘোষ ।

রামরাম ঘোষের হাত ধরেই শুরু হয় এই সদগোব পরিবারের দুর্গা আরাধনা। রামরাম ঘোষ ১৭৬৯-৭০ খিস্টাব্দের ছিয়াত্তরের মন্নন্তরের সময় অভাব অনটন সহ্য করতে না পেরে সংসারে তার দুই পুত্র রাধামোহন ঘোষ ও হরপ্রসাদ ঘোষ এবং তার স্ত্রী রেখে আত্মহত্যা করতে যান ।

ঠিক এমনই সময়ে ঘটে যায় এক অলৌকিক ঘটনা । রামরাম ঘোষ পুকুরে ঝাপ দেয়ার সময়ই তাকে বিরত করেন এক সধবা বৃদ্ধা মা । সেই বৃদ্ধা রামরাম ঘোষ-কে তার এই কর্মের কারণ জানতে চান এবং দারিদ্র দুর্গতির জন্য দেবী দুর্গার পূজা করার কথা বলেন। অভাব-অনটনের সংসারে দুরগাপুজা রামরাম ঘোষের কাছে ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘটনা ।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সময়েই অলৌকিক ভাবে বাড়িতে এসে পৌঁছায় রাজার উপহার, শুরু হয় ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসব

রামরাম ঘোষ সেই বৃদ্ধা মাকে এত ব্যয়বুহুল পূজা কিভাবে করবে সেটা জিজ্ঞাসা করার মুহূর্তে সেই বৃদ্ধা মা অদৃশ্য হয়ে যান । বলার অন্ত রাখে না ইনিই ছিলেন স্বয়ং জগন্মাতা মা মহামায়া এবং রামরাম ঘশকে দইববানি দেন বসত ভিটার ধানের গোলার নিচে আছে দশ ঘড়া মোহর এবং তা দিয়েই পূজা শুরু করার নির্দেশ দেন ।

রামরাম ঘোষ সেই বসত ভিটার ধানের গোলা থেকে মোহর পাওয়ার পর তা রাখলেন নিজের বসবাসকারি কুরে ঘরে । এবার রামরাম ঘোষের মনে উদয় হল এত বড়ো পূজা করবেন কিভাবে এবং তার বংশধরেরা কিভাবে তা চালিয়ে যাবে।

স্বয়ং মা এবার স্বপ্নাদেশ দেন দিলেন রামরাম ঘোষ কে, প্রাপ্ত মোহর থেকে ১০০১ টি মোহর নিয়ে বর্ধমান জেলার মহারাজাএর দুয়ারে যেতে এবং নিজবালিয়া গ্রামের সিংহবাহিনী দেবীর সেবাইত কুলীন ব্রাম্ভন মুখার্জী পরিবারের সদসসদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন ।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সময়েই অলৌকিক ভাবে বাড়িতে এসে পৌঁছায় রাজার উপহার, শুরু হয় ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসব

বর্ধমান এর মহারাজ রামরাম ঘোষকে ১০০১ মোহরের পরিবর্তে ২০০০ বিঘা জমি মায়ের সেবার জন্য প্রদান করেন । ঘোষ পরিবারের কাছে আজও নিজবালিয়ার মুখার্জী পরিবার গুরুবংশ রুপে সম্মানিত । মায়ের প্রথম দিকে পূজা হয়েছিল তাল পাতার ঘরে, নৈবিদ্য ছিল কলাপাতায় এবং সন্ধ্যাকালীন গহ দেওয়া হত মাতির মালসায় ।

বর্তমানে পিতলের থালায় ছোটো কলাপাতায় নৈবিদ্য এর ফল দেওয়া হয় এবং সন্ধ্যাকালীন ভোগের লুচি দেওয়া হয় মাতির মালসায় ।ঘোষ পরিবারের পূজার নৈবিদ্য পরিবারের পুরুষরা সাজায় ।

রামরাম ঘোষের পর পুজোর দায়িত্বভার গ্রহণ করে তার দুই পুত্র রাধামোহন ঘোষ এবং হরপ্রসাদ ঘোষ । দুই ভাই দেবোত্তর সম্পত্তিকে ব্যবহার করে পুজো করে এবং লবনের ব্যবসা শুরু করে এই পূজার শ্রী বৃদ্ধি ঘটান ।

পরবর্তীকালে এই পুজর দায়িত্বভার চলে যায় রাধামোহন ঘোষের চার পুত্র ও হরপ্রসাদ ঘোষের ছয় পুত্রের হাতে । রাধামোহন ঘোষের চার পুত্র অর্থনৈতিক কারনে পুজোর দায়িত্বভার তুলে দেয় হরপ্রসাদ ঘোষের ছয় পুত্রের হাতে । এখনও পুরজন্ত হরপ্রসাদ ঘোষের ছয় ছেলের বংশধরেরা পালা ক্রমে এই পুজো করে চলেছে ।

পুজো হয় বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরানোক্ত মতে । জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামো পূজার মাধ্যমে ঘোষ পরিবারের পূজা শুরু হয় । মহালয়ার পরের দিন বিল্ববৃক্ষের তলে শুরু হয় মায়ের বোধন । সপ্তমীর সকালে মায়ের পুকুরে নবপত্রিকা কে পশ্চিমমুখী করে স্নান করিয়ে মায়ের দালানে পশ্চিমমুখী ভাবেই মহাস্নান করিয়ে বাড়ীর বউরা বরন করার পর মায়ের কাছে স্থাপন করা হয় ।

এই পরিবারে দুর্গাপূজার মাধ্যমে শ্রী বৃদ্ধি ঘটে যার জন্য ধান্য লক্ষ্মীতে শুধু সিঁদুর কৌটো থাকে পেঁচা জাতীয় কোন বাহন থাকে না । ধান্য লক্ষ্মীকে মহালক্ষী রুপে পূজা করা হয় ।দেবী প্রতিমাতেও এই একই কারণে লক্ষ্মী সরস্বতী র কোনো বাহন থাকে না । এই পরিবারে লক্ষ্মী বিরাজমান তাই এই ঘোষ পরিবারে "শ্রী" (আকষষ্ঠী) থাকে না কোনো পূজা বা শুভ কাজে । ঘোষ পরিবারে মা মনসা কে ও দেবী দুর্গা র সাথে একই দালানে পুজো করা করা হয় ।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সময়েই অলৌকিক ভাবে বাড়িতে এসে পৌঁছায় রাজার উপহার, শুরু হয় ঘোষ পরিবারের দুর্গোৎসব

আগে পূজায় মহিষ বলির প্রচলন থাকলেও বর্তমানে পাঁচটি ছাগ এবং সাত রকম ফল বলি দেওয়া হয়। সপ্তমীতে একটি ছাগ, সন্ধি পূজায় একটি, নবমির দিন স্থানীয় সিংহবাহিনী মন্দিরে একটি ও মায়ের কাছে দুটি ছাগ চাল কুমড়ো, বাতাবিলেবু, ডাব, কলা, শশা, আদাগাছ, টিং গাছা আখ বলি হয় ।

সন্ধি পূজায় দেবিকে চামুণ্ডা রুপে পূজা করা হয় । সন্ধি পূজার বলির সময় মসাল প্রজ্জলিত হয় এবং সন্ধি পূজায় বলির ছাগ মুণ্ড মালসায় রেখে সরা দিয়ে চাপা দিয়ে এক বিশেষ গুপ্ত পুজোর মাধ্যমে দেবীর ঘটের সামনে রেখে ১০৮ টি পদ্ম প্রদান করা হয় । গুপ্ত পুজো পরিবারের কাউকে দেখতে দেওয়া হয়না । অষ্টমীর সান্ধি পুজোয় বাড়ীর বউরা ধুনা পোড়েন ।

সন্ধি পূজার সময় জবার মালা, অপরাজিতার মালা, আকন্দ মালা, শ্বেত ও রক্ত করবীর প্রয়োজন হয় । নবমির দিন মাকে নৈবিদ্যের সাথে নিবেদন করা হয় থোর, পলতা, কচু, পুঁইশাক । নবমীর দুপুরে ১০৮ বিল্ব পত্রের সহযোগে মায়ের হোম কার্য সম্পন্ন হয় । দশমীর দিন সকালের পূজা অন্তে সন্ধ্যায় বরণের পর বাঁশের দোলায় মাকে স্থানীয় কৌশিকী খালে নিরঞ্জন করে অপরাজিতা পূজা এবং বিল্ব পত্রে শ্রী শ্রী দুর্গামাতা সহায় আলতা দিয়ে লেখা এবং শান্তি জল প্রদানের মাধ্যমে পূজার সমাপ্তি ঘটে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+