ট্রাম্প চিনকে অহরহ গাল পাড়লেও দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে হিলারিকেই দেখতে চান
ডেমোক্র্যাট মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিন্টনের সমালোচকের সংখ্যা তাঁর স্বদেশে নেহাত কম নয়। কিনতু দুনিয়াতে বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে যাঁরা এই প্রাক্তন বিদেশসচিবের অন্ধভক্ত এবং মনেপ্রাণে চান যেন আগামী ৮ই নভেম্বরের নির্বাচন তাঁর জন্যই জয়মালা নিয়ে আসে।
তেমনই একটি দেশ হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। সম্প্রতি উইন/গ্যাল-আপ ইন্টারন্যাশনাল-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, সে-দেশের ৮২ শতাংশ মানুষ হিলারিকেই পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চান। মাত্র তিন শতাংশ চান ট্রাম্পকে। পনেরো শতাংশ এ-ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি।

মোট পঁয়তাল্লিশটি দেশে ৪৪,০০০ পূর্ণবয়স্ক মানুষকে নিয়ে করা হয় এই সার্ভে। অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও হিলারির বেশি ভক্ত, এমন দু'টি দেশ রয়েছে। তারা হল -- ফিনল্যান্ড (৮৬ শতাংশ) এবং পর্তুগাল (৮৫ শতাংশ)। সব দেশেই মোটামুটি হিলারির ভালোই সমর্থন, ব্যতিক্রম রাশিয়া যেখানে ট্রাম্প বেশি জনপ্রিয় এবং চিন -- যেখানে লড়াই সমানে সমানে। বেজিং-এর দোটানার কারণ অবশ্য সহজেই অনুমেয় -- ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর ক্লিন্টনের সম্পর্কে বেজিং-এর যাই ধারণা হোক না কেন, ট্রাম্পের চিনকে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ এশিয়ার দেশটিকে যে রিপাবলিকান পদপ্রার্থী সম্বন্ধে খুব একটা আশাবাদী করে তুলবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিনতু এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া হিলারির এত ভক্ত কেন? আমরা সবাই জানি দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্র। ইদানিংকালে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অভিযান নিয়ে পূর্ব এশিয়াতে যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সিওল এবং ওয়াশিংটনের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে সন্দেহ নেই।
কিন্তু তা সত্ত্বেও, দক্ষিণ কোরীয়দের ক্লিন্টনকেই বিশেষ পছন্দ কেন?
এর মুখ কারণ দু'টি। একদিকে, হিলারির জনপ্রিয়তা এবং দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। আমেরিকার বারাক ওবামা প্রশাসনের এশিয়া নীতি প্রণয়নে ক্লিন্টন অতীতে এক বড় ভূমিকা পালন করেন। তদানীন্তন বিদেশসচিব হিসেবে এশিয়াতে হিলারির অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল সিওল। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে অগ্রণী ভূমিকা নেন এই প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি।
চিন এবং উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক বৈরিতার বিরুদ্ধে মার্কিন সমর্থন দক্ষিণ কোরিয়াকে আস্বস্ত করে। উত্তর কোরিয়ার মোকাবিলার কন্যে ছয়-দেশীয় আলোচনা ছাড়াও হিলারি গুরুত্ব দেন ওয়াশিংটন এবং সিওলের মধ্যে সামরিক জোটের উপর। সব মিলিয়ে, দক্ষিণ কোরিয়ার হাত শক্ত করার জন্য সিওল হিলারির কাছে অনেকটাই কৃতজ্ঞ।
অন্যদিকে, হিলারির প্রতিপক্ষ ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে চিনকে তুমুল আক্রমণ করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সনাতন মিত্র যে-দেশগুলি, তাদের প্রতি কিনতু বিশেষ আস্থা দেখাননি। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান থেকে শুরু করে নেটো-র মতো ওয়াশিংটনের বিভিন্ন কূটনৈতিক বা সামরিক জোট সম্পর্কে ট্রাম্প বিশেষ আগ্রহ দেখাননি। উল্টে, তাঁর কথা শুনে মনে হয়েছে যেন তিনি ওই মিত্রতা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নন। বিশেষ করে, কোরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত মার্কিন সেনার ভরণপোষণের বিষয় থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন-সিওলের মধ্যে উদার বাণিজ্য নিয়েও ট্রাম্প বক্রোক্তি করতে ছাড়েননি। স্বভাবতই, আহত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ।
বিশেষত, সম্প্রতি যেখানে ওয়াশিংটনের অনুরোধে সিওল নিজেদের দেশের সিওংজুতে মার্কিন সেনার সুরক্ষার কারণে 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ঘাঁটি গড়ারও অনুমতি দেয়, সেখানে ট্রাম্পের এহেন বেপরোয়া কথাবার্তা যে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষকে চটাবে, তাতে আর সন্দেহ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের বিরুদ্ধে মার্কিন স্বার্থকে সুরক্ষিত করতে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো দেশের কৌশলগত গুরুত্ব কতটা তা ট্রাম্প অনুধাবন করতে ব্যর্থ আর তাই হিলারির পক্ষে এই প্রবল সমর্থন।
এখন হিলারি নিজের দেশের কতটা সমর্থন নির্বাচনের দিন, সেটাই দেখার। যদি আম মার্কিন নাগরিকও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ভাবেন, তাহলে তো ভালোই। কিনতু যদি 'ঘরমুখী' ট্রাম্পকেই তাঁদের বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তাহলে সিওলের পক্ষে হয়তো উদ্বেগজনক সময় আসছে আগামী দিনগুলিতে।












Click it and Unblock the Notifications