সন্ত্রাস নিয়ে সার্ক পাকিস্তানকে একঘরে করল কী করল না, তাতে ইসলামাবাদের কিছুই আসে যায় না
সন্ত্রাস নিয়ে এবারের সার্ক সম্মেলন লাটে ওঠাকে ভারতের সংবাদমাধ্যম 'পাকিস্তানের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং ইসলামাবাদকে একঘরে করে ফেলতে নয়াদিল্লির সাফল্য' হিসেবে দেখছে। কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলা যাবে না কিন্তু আবার সেটাই যে সম্পূর্ণ সত্য, তাও মনে করার কারণ নেই।
সার্ক সম্মেলন ভণ্ডুল অর্থাৎ মরার উপর খাঁড়ার ঘা
এর কারণ হচ্ছে সার্ক এমনই একটি জীবন্মৃত গোষ্ঠী। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার জন্য দক্ষিণ ভারতের এই সংগঠনটি কোনওদিনই সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারেনি। গত তিন দশকে সার্কের সম্মেলনের সংখ্যা কুড়িও পেরোয়নি। আর যে ক'বার হয়েছে, তাতেও যে দারুণ ফলপ্রসূ কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নয়। লক্ষ্য উঁচু হলেও বাস্তবিক অবস্থা সার্ককে চিরকালই ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখেছে। তাই এই বছরের সার্ক সম্মেলন ভণ্ডুল হয়ে যাওয়াটা খুব আশ্চর্যজনক কিছু নয়।

ভারত-পাক বৈরিতা চিরকালই সার্কের পথে অন্তরায়
কয়েক বছর আগে নেপালে অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলনেও ভারত-পাক সম্পর্কের উত্তপ্ততা বাধার সৃষ্টি করেছিল। সেবার প্রয়াত নেপালি প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালার মধ্যস্থতায় অবস্থা সামাল দেওয়া হয়। তবে, এবারের সার্ক সম্মেলন বাতিল হওয়াটা তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ভারত এবার দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেরই সমর্থন পেয়েছে।
এটাকেই বরং ভারতের মনস্তাত্ত্বিক জয় বলা যেতে পারে আর এর পিছনে কাজ করেছে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সক্রিয় বিদেশনীতিই। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি যেভাবে বিভিন্ন দেশের দিকে হাত বাড়িয়েছেন, এটাকে তার সুফল হিসেবেই দেখা যেতে পারে। তাছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে এখন ভারত-বান্ধব সরকার।
ভারতের মনস্তাত্ত্বিক জয় মানেই পাকিস্তানের কূটনৈতিক হার নয়
কিন্তু ভারতের মনস্তাত্ত্বিক জয় মানেই কিন্তু পাকিস্তানের কূটনৈতিক হার নয়। একথা ঠিকই যে সন্ত্রাসের প্রশ্নে পাকিস্তানের ক্রমাগত আপোস আজ বিশ্বের সামনে তার নগ্নরূপ প্রকট করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস আজ ভারতের বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়েছে কিন্তু মনে রাখতে হবে যে পাকিস্তানের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আন্তর্জাতিক শক্তি সমীকরণ। সার্কের মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীর ভারসাম্যের খেলা নয়। এবং উল্টোদিকে, পাকিস্তানের ভূ-কৌশলগত অবস্থান তাকেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক গুরুত্ব প্রদান করে।
ইসলামাবাদের কাছে সার্কের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চিন
ইসলামাবাদের কাছে সার্কের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চিন। কারণ অর্থনৈতিকভাবে 'দিন আনি দিন খাই' এবং রাজনৈতিকভাবে অশক্ত দেশটির ক্রমাগত অক্সিজেন চাই এই দু'টি বড় শক্তির কাছ থেকে আরও একটি দিন টিঁকে থাকার জন্য। ভারত-বিরোধিতা পাকিস্তানের বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র। সেটা সে কোনও অবস্থাতেই ত্যাগ করতে পারবে না। শাসনযন্ত্রের অন্যান্য ফাঁকফোঁকর ঢাকতে এটাই তার একমাত্র উপায়। তাই সার্কের বাণিজ্য হল কি হল না তাতে পাকিস্তানের কিছু এসে যায় না; দক্ষিণ এশিয়ার ছোটখাটো দেশগুলি কী আপত্তি করল না করল, তাও ইসলামাবাদের কাছে গৌণ।
তার কাছে বরং অনেক বেশি প্রয়োজন আমেরিকার সহযোগিতা বা চিনের বন্ধুত্ব। ওয়াশিংটন সাম্প্রতিককালে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে, অস্ত্রসরবরাহ বন্ধ করেছে, জঙ্গিবাদের প্রশ্নেও ভারতের পিছনে দাঁড়িয়েছে।
আমেরিকা পাকিস্তানকে দূরে সরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নতুন রাষ্ট্রপতির আমলে পরিস্থিতি বদলাতেই পারে
কিন্তু মনে রাখতে হবে, হোয়াইট হাউসে আর কয়েকমাসের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতির আগমন ঘটতে চলেছে এবং তাঁর নীতি কীরকম হবে তা এই মুহূর্তে আমরা জানিনা। বারাক ওবামার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী যে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন গত আড়াই বছর ধরে, তার মেয়াদ আর তিন মাস বড়জোর। তারপর ইসলামাবাদের সঙ্গে নয়াদিল্লিকেও নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নতুন করে সমীকরণ সাজাতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকা যতই কড়া হোক না কেন, আফগানিস্তান প্রশ্নে তার সহযোগিতা নতুন রাষ্ট্রপতিকে নিতেই হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতি এরপর কী দাঁড়াবে তা এক্ষুনি পরিষ্কার নয়। আর যদি মার্কিনিরা পাকিস্তানিদের ফের স্নেহের চোখে দেখতে শুরু করে, তাহলে সার্কে কী হয়েছিল কেউ মনে রাখবে না।
একই কথা চিন প্রসঙ্গেও। চিন যদিও পাকিস্তানকে ব্যবহার করে ভারতকে চাপে রাখতে, কিন্তু ভারত-পাক সমস্যায় সে সরাসরি কখনও নাক গলায় না। ইসলামাবাদের কাছে তাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দেশকে কাছে পাওয়া। সম্প্রতি সে রাশিয়ার সঙ্গ পাওয়ার চেষ্টাও করছে আমেরিকার অভাব মেটানোর জন্য। অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ যাতে কোনওভাবেই কমে না যায়, তা নিয়ে ইসলামাবাদ সজাগ কারণ তার অস্তিত্বের মৌলিক প্রয়োজন সেটাই।
যদি আমেরিকা এবং চিন একযোগে পাকিস্তানকে একঘরে করে, তবে সেটাই ভারতের আসল কূটনৈতিক সাফল্য
অতএব, পাকিস্তানের কূটনৈতিক পরাজয় তখনই হবে যখন আমেরিকা এবং চিন একযোগে তাকে একঘরে করবে। তাতেই ভারতের সত্যিকারের সাফল্য। কিন্তু তার জন্যে ভারতকে খাটতে হবে চিনের মন জয়ের জন্যে যা মোটেই সহজ কাজ নয়। তাই এই লড়াই আপাতত চলতেই থাকবে। সার্কে কী হল না হল তাতে বিশেষ কিছু এসে যায় না।












Click it and Unblock the Notifications