বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণী মমতা-রাজের উপর চটে রয়েছে বিস্তর; পারবে কি বিজেপি তার ফায়দা তুলতে?
দু'হাজার ঊনিশের লোকসভা নির্বাচনে লড়াই এই মুহূর্তে তুঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে
দু'হাজার ঊনিশের লোকসভা নির্বাচনে লড়াই এই মুহূর্তে তুঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে কে কতটা এগিয়ে থাকবে, সেই দাবিতে একে অপরকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছেন না কোনওপক্ষই। রাজ্যে এখনও পর্যন্ত পাঁচটি আসনে ভোট হয়েছে আর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপি নেতৃত্ব উভয়ই বলছেন তাঁরাই এগিয়ে এখনও অবধি। রাজ্যের ৪২টি আসনের লড়াইতে শেষ হাসি কে হাসবে তা জানা যাবে আগামী ২৩ মে। কিন্তু একটি কথা মানতেই হবে যে পশ্চিমবঙ্গে তাদের বিপুল উত্থানের পরে তৃণমূল কংগ্রেস এতবড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়নি।
এই চ্যালেঞ্জের প্রধান কারণ এই নয় যে বিজেপি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। এই রাজ্যে গেরুয়া বাহিনী আগের তুলনায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও তারা এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কুর্সিচ্যুত করার মতো জায়গায় পৌঁছয়নি। সংগঠন দুর্বল, মুখের অভাব ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে তারা স্রেফ প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার হাওয়ায় লড়ে যাচ্ছেন। যেমন মমতা নিজে একসময়ে লড়তেন প্রবল প্রতাপশালী বামেদের বিরুদ্ধে।

মমতার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত হতাশ করেছে বাঙালি ভদ্রলোককে
তৃণমূলের চ্যালেঞ্জ আসলে অন্য জায়গায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আট বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিলেন দীর্ঘ ৩৪ বছরের এক সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থাকে চূর্ণ করে; প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পরিবর্তনের। কিন্তু খাতায় কলমে পরিবর্তন হলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সংস্কৃতি পাল্টায়নি। এক সময়কার শক্তিশালী বামপন্থীরা যে ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন রাজ্যের অলিগলিতে -- ঘোর দলতন্ত্র; তারই এক আলগা সংস্করণ প্রতিষ্ঠা পায় মমতার দিনগুলিতে। যেহেতু তৃণমূলের দলের রাশ বামেদের থেকে আলগা, তাই তাদের দলতন্ত্র বিকশিত হয় অন্তর্কলহের মাধ্যমে আর এতে সার্বিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জীবনের বীভৎসতা আরও প্রকট হয়। একনায়িকাতন্ত্রের দলে স্বাভাবিকভাবেই নীতি-নিয়মের বালাই না থাকাতে ভিতরের কোন্দল বেরিয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না। এতে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হিংসা ও হানাহানির এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত তৈরী হয়; পাশাপাশি দলতন্ত্রের দাপটে জোরাজুরির যে সমান্তরাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয় 'ডিমান্ড-সাপ্লাই' নীতি মেনে, তার ফলে ব্যাহত হয় সাধারণ মানুষের নির্ঝঞ্ঝাটে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকুও। চাকরি-বাকরি, শিল্পায়ন কোনও দিকেই মমতার পপুলিস্ট সরকার কিছু অর্জন করতে পারেনি, যার ফলে বাঙালি ভদ্রলোক বলে মধ্যবিত্ত সত্ত্বার অহমিকা চোট পেয়েছে এবং সেটাই বুমেরাং হয়ে ফিরছে তৃণমূল ও তাদের নেত্রীর দিকে। বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে তাদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করার জন্যে সত্যি সত্যি উদ্যোগী হয়, তবে এই দিকটি নিয়েই তাদের ভাবতে হবে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঢাকতে পারেনি প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ব্যর্থতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর পাঁচটি পপুলিস্ট সরকারের মতোই তার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো ঢাকতে এক বাঙালি জাতীয়তাবাদের আশ্রয় নিয়েছেন। প্রথমে তা এক দাবিপূর্ণ জাতীয়তাবাদ ছিল যার মধ্যে দিয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব দেখাতে চাইতেন যে অতীতে বাম জমানায় যা কিছু খারাপ হয়েছে, তা তিনি শুধরে দেবেন অতি দ্রুত। কিন্তু বাম জমানার সর্বনাশের স্মৃতি দিন দিন যত ফিকে হতে থাকে, মমতার প্রয়োজন হয়ে পড়ে এক নতুন ন্যারেটিভের আর তখন তিনি খুঁজে পান সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী বিজেপিকে। বিজেপিও যেহেতু তখন সুর চড়িয়েছে মমতাকে উৎখাত করতে বাংলার মসনদ থেকে, তৃণমূল নেত্রীর স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ধরনের সঙ্গে তা ধাঁচে ধাঁচে মিলেই যায় আর তিনি তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পরিণত করেন এক ধরনের রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আবেগে। "ওরা বাংলাকে আক্রমণ করলে আমরা দিল্লি আক্রমণ করব" ইত্যাদি ধরনের মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সুর বয়ে আনেন। বাংলার বাইরের নেতাদের (এমনকী রাহুল গান্ধীও) হেলিকপ্টার নামতে না দেওয়া ইত্যাদির পদক্ষেপের মধ্যে পরিষ্কার যে মমতা বাংলাকে এখন তাঁর নিজের এলাকা তৈরী করেছেন যেখানে প্রতিপক্ষদের প্রবেশ নিষেধ।

বাংলার বর্তমান হাল নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণী আজকে লজ্জিত
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাংলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন এতটাই খারাপ সবদিক থেকে যে সেখানকার মানুষের মধ্যে তৈরী হয়েছে এক প্রচণ্ড ক্ষোভ আর সেই ক্ষোভের আগুন এখন মমতার জাতীয়তাবাদী আবেগেও আর ঢাকা পড়ছে না। অতীতে বাংলার মানুষ সেভাবে সর্বভারতীয় বা অবাঙালি রাজনৈতিক দিক নির্দেশ না চললেও এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে কারণ বাংলার সমাজ এখন ভৌগোলিকভাবে অনেকটাই বিস্তৃত। "আমাদের কপাল খারাপ" বলা বাঙালি এখন প্রকৃত অর্থেই লজ্জিত আর মমতার আট বছরের রাজত্বকে বামেদের ৩৪ বছরের অপশাসনেরই একটি প্রসারিত রূপ ছাড়া আর কিছু ভাবতে চায় না, বিশেষ করে ভদ্রলোক শ্রেণী।
সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বাঙালিকে জড়িয়ে নেওয়ার এটাই বড় সুযোগ বিজেপির। পারবে কি তারা?












Click it and Unblock the Notifications