Get Updates
Get notified of breaking news, exclusive insights, and must-see stories!

নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছে তৃণমূল

রাজ্যে এক অভূতপূর্ব কাণ্ডকারখানা চলছে। ক্ষমতার লালসায় দলবদলের বিরল নজির তৈরি হচ্ছে তৃণমূল রাজত্বে। বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধি একে একে শাসকদলে ভিড়ছেন। বিধায়ক থেকে শুরু করে কাউন্সিলর, জেলা পরিষদ সদস্য- রাজ্যে নাম লেখানোর হিড়িক চলছে এখন। আর এর ফল বিরোধীদের হাতে থাকা যৎসামান্য পুরসভা, জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিচ্ছে রাজ্যের সরকারি দল তথা তৃণমূল কংগ্রেস। শাসক দলের বেশিরভাগ নেতাই এই দখলদারিতে উচ্ছ্বসিত। আর যাঁরা আসছেন, সেই নব্য তৃণমূলীরাও আহ্লাদিত।

শাসকদলের মুখে এখন একটাই আওয়াজ, মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গী হতেই বিরোধী শিবির ছেড়ে শাসক শিবিরে ভিড় করছেন সদস্যরা। আমরা তো আর তাঁদের ফিরিয়ে দিতে পারি না। স্বয়ং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, উন্নয়নের জোয়ারে তিনি এমনভাবে রাজ্যকে ভাসিয়ে দেবেন যে, বিরোধী বলে কিছু থাকবে না। কার্যত হচ্ছেও তাই। রাজ্যবাসী দেখল বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিরা প্রতিদিনই নিয়ম তৃণমূল ভবনে গিয়ে ঘাসফুলের পতাকা হাতে তুলে নিচ্ছেন। সাংবাদিক বৈঠকে হোক বা জনসভায় শাসকদলের ঝাণ্ডা হাতে ছবি তুলতে তাঁরা তৎপর।

নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছে তৃণমূল !

প্রতিদিন দল বেড়ে চলায় দলনেত্রী বেশ আত্মতৃপ্তি লাভ করছেন। কিন্তু কপাল কোঁচকাচ্ছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এটা এক বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ দলবদলের এই প্রবণতায় গণতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে। এতে এক সময় শাসকদল নিজেই গভীর সংকটে পড়ে যাবে। এমন একটা সময় আসবে, যখন শাসকদল ছেড়ে এভাবেই মানুষ অন্যদিকে ছুটে যাবেন। আর এই প্রবণতায় সবথেকে বেশি খুশি হচ্ছে বিজেপি। কারণ ভবিষ্যতে বিজেপির উঠে আসার পথই প্রশস্ত করে দিচ্ছে শাসকদল। তাঁদের মতে কোনও রাজ্যকে বিরোধীশূন্য করা কার্যত তাসের প্রাসাদ গড়া। ঝড় ওঠার দরকার নেই, হাওয়া উঠলেই সেই ঘর যেদিন হোক ভেঙে পড়তে পারে।

পৃথিবীতে এমন কোনও রাষ্ট্র নেই, যেখানে বিরোধী পক্ষ নেই। উন্নত দেশগুলোতে বিরোধীরা বেশি ক্ষমতাবান। সরকার পক্ষ তাদের যথেষ্ট সমীহ করে চলে। এটাই গণতন্ত্র। এতেই মজবুত হয় দেশের পরিকাঠামো, রাজ্যের পরিকাঠামো। আর আমাদের রাজ্যে চলছে বিপরীয় অবস্থা। বিরোধীরা যে রাজ্যের বিবেক, সে কথাটাই ভুলে যেতে চাইছে শাসক দল। বিরোধীরা সরকারের বিচ্যুতি আটকায়। গঠনমূলক সমালোচনা করে। তাতে সরকার পক্ষ নিজেদের ভুল শুধরে নিতে পারে। এতে লাভই হয় সরকারের।

এ রাজ্যের বিরোধীপক্ষ তেমন শক্তিশালী নয়। তবু ভয় পাচ্ছে শাসক দল। রাজ্য বিরোশী শূন্য করার খেলায় মেতে উঠেছে। একদা সরকারে থাকা বামেরা এখন তিন নম্বরে। তাদের অতীতই তাদের ফেরার পথে বাধা। এমনকী তারা সরকারের সমালোচনা করার পথও খোলা রাখেনি। আর কংগ্রেস তিন নম্বর অবস্থান থেকে উঠে এসে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। এবারই চমৎকারভাবে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ এসেছিল তাদের কাছে। কিন্তু একটার পর একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত তাদের ক্রমশ পিছিয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একা মানস ভুঁইয়া দলটাকে তছনছ করে দিয়ে গেছেন। মানসবাবু দল ছাড়তেই কংগ্রেসের ভিত খুব পলকা মনে হচ্ছে।

গণতন্ত্রের সংসদীয় রীতি রয়েছে। সেখানে স্থানীয় প্রশাসনেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একটা দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তারাই বোর্ড গড়তে দিয়েছে। কিন্তু সরকারি দলের বিরোধী হলেই বিপত্তি দেখা দিচ্ছে এখন। যে কোনও প্রকারে তা ভেঙে দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে তৃণমূলী শাসনে। সরকার ভুলে গিয়েছে তার পৃষ্ঠপোষকতা করাও পবিত্র কর্তব্য। তাতেই গণতন্ত্র উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় রাজ্যের তৃণমূল সরকার বৃহত্তর গণতন্ত্রের এই দেশে গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করছে। মনোনয়নপত্র তোলা ও জমা দেওয়ার বাধা, প্রত্যাহারের বাধ্য করা, প্রচারে বাধা, বিরোধীদের ভোট দিলে সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত বা এলাকার উন্নয়ন না করার হুমকি, সর্বোপরি ভোটের দিন সন্ত্রাস এ সবই গণতন্ত্রের উৎসবকে কালিমালিপ্ত করে। তারপরও মানুষ কোথাও কোথাও বিরোধীদের জেতায়। পঞ্চায়েত বা পুরসভা উপহার দেয়। কিন্তু তারপরও সব করায়ত্ত করার মনোভাব নিয়ে শাসকদল যখন বিরোধী সদস্য কেনাবেচা শুরু করে, তাতে গণতন্ত্র শুধু ধর্ষিতা হয় না দখলকারীর নৈতিকতা বলেও কিছু থাকে না। আর তা নিয়ে কিছু কহতব্যও থাকে না। একই ভাবে বিক্রি হওয়া জন প্রতিনিধিও ভোটারদের প্রতারিত করেন।

শিলিগুড়ি পুরসভার প্রমাণ হাতেই রয়েছে। রাজ্যের বরাদ্দ টাকা দেওয়া হচ্ছে না। দেখা করতে এলে নবান্ন ফিরিয়ে দিচ্ছে। শাসকদলে পক্ষ থেকেও দৈনন্দিন কাজকর্ম ও পরিষেবা প্রদানে বাধা দিতে প্রায়শই নীতি বহির্ভূতভাবে ঘেরাও, বিক্ষোভ প্রদর্শন চলানো হচ্ছে। কারণ একটাই শিলিগুড়ি পুরসভা বিরোধীদের হাতে। শাসকদলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে এক বছরের মধ্যে শিলিগুড়ি দখল নেওয়া হবে। যেভাবে মুর্শিদাবাদে অধীর-রাজ ক্ষতম করা হয়েছে, সেভাবেই এবার শিলিগুড়ির দিকে লক্ষ্য দেবে সরকারি দল। তখন উন্নয়নে টাকার অভাব হবে না। তখন কল্পতরু হয়ে উঠবেন মুখ্যমন্ত্রী।

দীর্ঘ চার দশক পর এবার একক দল হিসাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে তৃণমূল। এটাই শাসকদলের কাছে উচ্চ মর্যাদার ছিল। বিরোধীরা পৌঁছে গিয়েছিল তলানিতে। কিন্তু তারপরও শাসকদল সব দখলে নেব বলে যে আগ্রাসন চলাচ্ছে- গণতন্ত্র তাতে ভুলুণ্ঠিত। দু-চারটে ছোটোখাটো বোর্ড, যা বিরোধীদের হাতে ছিল, সে সব দখল হয়ে গেছে। শাসকদল এখন নয়া রেকর্ডের অধিকারী। কিন্তু ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে না। এই 'কীর্তি' কালো কালিতে লেখা থাকবে। এখন একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে বাধ্য, যে মানুষগুলো বিরোধী দলগুলোর সমর্থক, তারা কি রাতারাতি শাসকদলের সমর্থক বনে যাবে?

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বরং উল্টোটাই হবে। এতে সাধারণ মানুষ বিরোধীদের দিকেই বেশি ঢলে পড়বেন। অতঃপর কী হবে? রাজ্যে বিরোধী কন্ঠ না থাকায় সরকার এবং শাসকদল বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ভুল করলে ধরিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না। ফলে ভুলের পাহাড় হবে। আর সেই ভুলের পাহাড়ে ধস নামতে বাধ্য। সেদিন আর বেশি দেরি নেই। নব্য তৃণমূল ও আদি তৃণমূলের লড়াই তো শুরু হয়েই গিয়েছে। সেই লড়াই আরও বাড়বে। কারণ আদর্শ নয়, লোভই এখানে মাপকাঠি। নিজের কবর যে নিজেই খুঁড়েছে তৃণমূল।

More From
Prev
Next
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+