দশবছর পর তৃণমূলের সিঙ্গুর ফল মিষ্টি
আজকে, ঠিক এক দশক পরে, ২০১৬ সালে সেই মমতাই সিঙ্গুরের সেই রাজনৈতিক জমি (বা কুরুক্ষেত্র বললে আরও ভালো) আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে দিতে শুরু করলেন চাষিদের মধ্যে।
এ ইতিহাসের এক দুর্লভ মুহূর্ত। ঠিক দশ বছর আগে তদানীন্তন বাম সরকার বিধানসভায় বিপুল সংখ্যার জোর নিয়ে সিঙ্গুরে বুলডোজার (হ্যাঁ, গোদা ভাষায় বুলডোজারই কারণ শিল্পায়নের সহজ পথ ওটা ছিল না, যা সম্প্ৰতি সুপ্রিম কোর্টও জানিয়েছে) চালাতে গিয়ে মহাপতনের পথ তৈরি করেছিল।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন রাজ্য এবং কেন্দ্র -- দুই স্তরেই কোণঠাসা। ২০০১ এবং ২০০৬ সালের বিধানসভা ও ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে গো-হারা হেরে তখন তাঁর নতুন প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেস পায়ের তলায় মাটিই খুঁজে পাচ্ছে না। কংগ্রেস বা বিজেপি -- একেক সময়ে একেক দলের সঙ্গে জোট বেঁধেও কোনও সুবিধা হচ্ছে না।

সেই সময়েই ঘটল সিঙ্গুর, তাপসী মালিক কাণ্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। আর কবি-সাহিত্যিক-সুশীল সমাজ ঘুরে গণতন্ত্রের ঝান্ডা শেষ পর্যন্ত পৌঁছল মমতার হাতে। তারপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আজকে, ঠিক এক দশক পরে, ২০১৬ সালে সেই মমতাই সিঙ্গুরের সেই রাজনৈতিক জমি (বা কুরুক্ষেত্র বললে আরও ভালো) আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে দিতে শুরু করলেন চাষিদের মধ্যে। আরও প্রতীকী - যেই গোপালনগর মৌজা থেকে জমি অধিগ্রহণ করা শুরু হয়েছিল, সেখান থেকেই তৃণমূল নেত্রী ইতিহাসের চাকা পিছন দিকে ঘোরাতে শুরু করলেন।
পরে এও বললেন যে "অধিকার কেউ দেয় না, তা কেড়ে নিতে হয়" বা "সিঙ্গুর সারা বিশ্বের কাছে মডেল হিসেবে গণ্য হবে।" নেত্রীর দলের এবং সরকারের পার্শ্বচরিত্ররাও এই বিষয়ে বক্তব্য রেখে বললেন এত বড় জমি আন্দোলন আগে কখনও হয়নি আর ভবিষ্যতেও হবে কিনা তা বলা মুশকিল।"
দশ বছর পর আজ সিঙ্গুর ফল মিষ্টি
সিঙ্গুরের পরিস্থিতির এই আমূল পরিবর্তনের পর বঙ্গেশ্বরী এবং তাঁর সভাসদদের এই বাক্যবাণের ঝড় দেখে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। কিনতু যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হল তৃণমূল কংগ্রেস সেই সমস্ত সৌভাগ্যবান দলের মধ্যে পড়ে যারা নিজেদের বপন করা বীজ থেকে উৎপন্ন রাজনৈতিক বৃক্ষের ফল নিজেরাই খেতে পাচ্ছে। এবং গদগদ হয়ে ঘোষণা করছে এটাই নাকি ভবিষ্যতের মডেল।
ভারত দেশের রাজনীতিতে এটা সচরাচর দেখা যায় না, অন্তত কংগ্রেস-পরবর্তী সময়ে তো নয়ই। হয় এক দলের যত্নে লালিত গাছের ফল আরেক দলকে খেতে দেখা যায় বা কোনও দলের জীবদ্দশাতেই তাদের সাজানো বৃক্ষ-বাগান ধসে পড়ে (এই যেমন বামেদের)।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জঙ্গি আন্দোলনের ফলে এক দশক আগে যখন সিঙ্গুর অচল হয়ে পড়ে এবং দু'বছর পর -- অর্থাৎ ২০০৮ সালের এই অক্টোবরেই টাটারা সিঙ্গুরের কারখানা ত্যাগ করেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘোর শিল্পবিরোধী, নৈরাজ্যবাদী ইত্যাদি তকমা দেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গুরের কারখানার সামনে সড়কপথ বন্ধ করে বা কলকাতার রাজপথে প্রায় একমাস অনশন করে মধ্যবিত্তের কাছে চক্ষুশূল হয়েছিলেন নেত্রী।
যখন সিঙ্গুর আবার ঘুরে এল, তখন দিদিই সর্বেসর্বা, অতএব...
কিনতু, বিধাতার এমনিই খেল যে সেই সিঙ্গুরের প্রসাদ যখন আদালত থেকে এল, তখন এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই রাজ্যের সর্বেসর্বা। বিরোধী আসনে থেকে তিনি যে প্রকল্পকে লক্ষ্যচ্যুত করতে তিনি গোঁয়ার্তুমি দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসেও সে বিষয়ে সেই তিনিই শেষ হাসি হাসলেন।
এর অর্থ, রাজ্যে এখন আর কোনও দ্বিতীয় নেতা নেই যিনি মমতার মোকাবিলা করতে পারেন। সাধারণত, কোনও দল ক্ষমতায় এলে তার একটি বিরোধীপক্ষ তৈরি হয় এবং শাসকদলের ভুলচুকের সুবিধা নিয়ে পাল্টা রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে কিনতু তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বিরোধী অবস্থাতেও যে ইস্যুতে প্রতিবাদ করে তার সুফল পেয়েছিলেন, আজ টেবিলের ওপরদিকে বসে সেই তিনিই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেছেন।
বামেদের ভূমিসংস্কারও বোধহয় চাপা পড়ে গেল তৃণমূলের সিঙ্গুর বৃত্তান্তের তলায়
অর্থনৈতিকভাবে সিঙ্গুরে ইতিহাসের এই পিছনদিকে হাঁটা কতটা ভালো হল না খারাপ, তার উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে কিনতু এই কারখানা সরিয়ে চাষবাসের কাজ শুরু করার যে রাজনৈতিক মিরাকল মমতার ক্ষেত্রে ঘটল, তার কোনও জুড়ি ইতিহাসে আর পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। হয়তো পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে বামেদের ভূমিসংস্কারের অধ্যায়টিও এর ফলে হারিয়ে গেল; তার জায়গা দখল করলো সিঙ্গুরের অর্থ-রাজনৈতিক জমির বৃত্তান্ত।












Click it and Unblock the Notifications