গঙ্গার পূর্বপাড়ের বাসিন্দাদের আক্ষেপ মিটেছিল সিপাহী বিদ্রোহের পরই, জানেন শিয়ালদহে রেলপথ বিস্তারের পূর্ব-কথা
গঙ্গার পূর্বপাড়ের বাসিন্দাদের আক্ষেপ মিটেছিল সিপাহী বিদ্রোহের পরই, জানেন শিয়ালদহে রেলপথ বিস্তারের পূর্ব-কথা
আক্ষেপ ছিল গঙ্গার পূর্ব পাড়ের বাসিন্দাদের। কারণ, গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে হাওড়া-ব্যান্ডেল লাইনে ১৮৫৪ সালেই ট্রেন চলাচল শুরু করে দিয়েছে রেল কোম্পানি। পরে সেই রেলপথ বর্ধমান হয়ে রানিগঞ্জ পর্যন্ত চলে যায়। আর গঙ্গার পূর্ব পাড়ের বাসিন্দাদের নৌকা করে গঙ্গা পার হয়ে পায়ে হেঁটে বেশ কিছুটা পথ গিয়ে সুযোগ মিলত 'কু ঝিক ঝিক' ট্রেনে চড়ার। মানে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে রেলগাড়ির দেখা মিলত। কিন্তু, এপারে ট্রেন চালানো নিয়ে সেকালের জমিদার থেকে সাধারণ মানুষ সকলের বড়ই মনকষ্ট ছিল। পূর্বপাড় দিয়ে আদৌ রেল গাড়ি চলবে কি না তা নিয়ে এই সব এলাকার মানুষের মধ্যে রাস্তাঘাটে জোর চর্চা হত। তবে, সেই আক্ষেপ বেশিদিন বয়ে বেড়াতে হয়নি। ১৮৫৭ সালে বারাকপুরে সেনা ছাউনি মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে হয়েছিল সিপাহী বিদ্রোহ। ঠিক, সিপাহী বিদ্রোহের পরের বছর ১৮৫৮ সাল নাগাদ গঙ্গার পূর্ব পাড়ে রেল গাড়ি চালানোর জন্য রেলপথ বসানোর উদ্যোগ শুরু হয়।

শিয়ালদহ রেলপথ তৈরির আদি কথা
শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত ১০৯ মাইল রেল পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও এখন এই রেলপথের অনেকটা অংশ বাংলাদেশের দিকে রয়েছে। এই দেশের রেলপথের শেষ স্টেশন গেদে। আর ওপারে রয়েছে দর্শনা স্টেশন। মৈত্রী এক্সপ্রেস এখন সেই পুরানো রেলপথ ধরে চলাচল করে। যাইহোক, নতুন রেলপথ তৈরির জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির মধ্যে চুক্তি হয়। রেলপথ পাতার জন্য ২০০ ফুট চওড়া জমি অধিগ্রহণ করার কাজ শুরু হয়। ১৮৫৯ সালে ১৪ এপ্রিল ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি গেজের সিঙ্গল লাইন বসানোর কাজ শুরু হয়। ১৮৬২ সালে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ট্রেনটি ছিল দুকামরার। প্রথম শ্রেণীর যাত্রীবাহী একটি কামরা ছিল। অন্যটি, ছিল মালবাহী কামরা। ১৮৬২ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর স্পেশাল ট্রেন শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া যায়।

শিয়ালদহ নয়, নাম ছিল কলিকাতা স্টেশন
এখন আমরা শিয়ালদহ নামেই চিনি। কিন্তু, গঙ্গার পূর্বপাড়ে রেল গাড়ি চালু হওয়ার সময় এই স্টেশনের নাম ছিল কলিকাতা। সেই সময়কার রেলওয়ে টাইম টেবিলের তথ্য সেই কথা বলছে। কলিকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করত। কলিকাতা থেকে রানাঘাট পর্যন্ত প্যাসেঞ্জার ট্রেন যাতায়াত করা শুরু করেছিল ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। প্রথম এই ট্রেনটিতে যাত্রী সংখ্যা ছিল ১১০০ জন। আর ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চলাচল করা শুরু হয়। যদিও গেদের পর থেকে এখন বাকী অংশটি বাংলাদেশের দিকে চলে গিয়েছে।

১৬০ বছর আগে শিয়ালদহ মেইন লাইনে কোন কোন স্টেশন ছিল জানেন কি ?
১৬০ বছর আগে রেলগাড়ি চালু হওয়ার সময় মেন লাইনে বহু স্টেশনের কোনও চিহ্ন মাত্র ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি স্টেশনের উপ দিয়ে রেলগাড়ি ছুটত। সেই সময়কার নথি থেকে পাওয়া যায়। শিয়ালদহ বা কলিকাতার পর দমদমা স্টেশন। আসলে তখন দমদম নাম ছিল না। দমদমা বলা হত। তারপর বেলঘরিয়া, সোদপুর, বারাকপুর, ইছাপুর, শ্যামনগর, নৈহাটি, কাঁচরাপাড়া, মদনপুর, চাকদহ, রানাঘাট। উল্টোডাঙা, আগরপাড়া, খড়দহ, টিটাগড়, পলতা, জগদ্দল, কাঁকিনাড়া, হালিশহর, কল্যাণী, শিমুরালি, পালপাড়া, পায়রাডাঙা-এই সব স্টেশনের কোনও চিহ্নমাত্র ছিল না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নতুন এই সব স্টেশনের অনুমোদন মিলেছে। আর রানাঘাট থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত স্টেশনের সংখ্যাও ছিল হাতেগোনা। রানাঘাটের পরের স্টেশন ছিল আড়ংঘাটা, বগুলা, কৃষ্ণগ়ঞ্জ,মতিয়ারি, রামনগর, জয়রামপুর, চুয়াডাঙা, মুন্সিগঞ্জ, আলমডাঙা, হিলসিয়া, পোড়াদহ, জাগটি, কুষ্টিয়া।

প্রথমে কত কামরার ট্রেন চালু হয়েছিল, কত ছিল ভাড়া
রেলগা়ড়ি চলাচল করার শুরুতে তিনটি কামরা থাকত। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণীর কামরা ছিল। প্রথম শ্রেণীর কামরায় শিয়ালদহ থেকে দমদমের ভাড়া ছিল ৪ আনা। বেলঘরিয়-৬আনা, সোদপুর-৯ আনা, বারাকপুর-১৪ আনা, ইছাপুর-১টাকা ১ আনা। দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়া ছিল দমদম-২ আনা, বারাকপুর-৬ আনা। তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় শিয়ালদহ থেকে দমদম পর্যন্ত ১ আনা ভাড়া ছিল। আর বারাকপুর ছিল ৩ আনা ১০ পাই। বারাকপুর সেনা ছাউনি থেকে দমদম যাওয়ার জন্য গোরা সাহেবরা ঘোড়া নিয়ে ট্রেনে উঠত। সন্ধ্যার নামলেই গোরা সাহেবদের দাপাদাপির কারণে দেশিয় লোকজন ট্রেনে চড়তে ভয় পেতেন।












Click it and Unblock the Notifications