'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' হয়েছে কিনা প্রশ্ন উঠতেই পারে; এটা তো আর পাকিস্তান নয়
প্রথমে তো 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' হল নিয়ে হৈ-চৈ হল। বিভিন্ন বিরোধী দল ধন্য ধন্য করে উঠল। "এই তো বাঘের বাচ্চার মতো কাজ করেছেন মোদী!" রাজনৈতিক নহল থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম, সাধারণ মানুষ সবাই দারুন খুশ। ব্যাটা অর্বাচীন পাকিস্তানিগুলোকে শিখিয়েছি সবক। সাধারণ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা আম জনতা আর তাঁদের কাছে চিরকালই আশীর্বাদকামী রাজনীতিবিদদের কাছে এ এক বিরাট ব্যাপার।
আবার উত্তরপ্রদেশ এবং গুজরাতের নির্বাচনের আগে সচরাচর জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিয়ে আত্মহত্যা করতে যাবেন না -- মোদীর দলের হিসেব এই অবধি ঠিক ছিল।

কিনতু এটা পাকিস্তান নয়
গেরুয়া বাহিনী বোধহয় ভুলে গিয়েছিল যে দেশটা আদতে ভারতবর্ষ, পাকিস্তান নয়। ওপারের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর অভিযান নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটি করবেন না একথা সবার জানা, কারণ পাকিস্তানে জানাই শেষ কথা। সেখানকার সরকারও সেনার থেকে কম শক্তিশালী; সে যতই গত প্রায় এক দশকে মাত্র দু'বার সরকার বদল হলেও। প্রচার যুদ্ধ যদি পাকিস্তানের অন্যতম বিদেশনীতি হয়ে থাকে, তবে তাই বৈধ।
কিনতু ভারতের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। এদেশের সরকার দেশের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যার অর্থ: এদেশের মানুষের কন্ঠেরই সবচেয়ে জোর। তাই সেনার কোনও অভিযানের সাফল্যের ক্ষীর যেমন ক্ষমতায় থাকা দল খায় (যেমন ১৯৭১ সালে কংগ্রেস এবং ১৯৯৯ সালে বিজেপি), তেমনই সেই অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সরকারকেই তার জবাবদিহি করতে হয়। এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। কিনতু ভারতের বর্তমান শাসকদলের কিছু সদস্য এমন প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করলেন তাতে ঘোঁট আরও পাকল।
"বিরোধীদের দাবি অপ্রয়োজনীয়" বলার মধ্যে একটি অগণতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায় কারণ বিরোধীদের কাজই প্রশ্ন তোলা। সেই প্রশ্নের জবাব চুপচাপ দিয়ে দিলেই তো ঝামেলা মিটে যায়।
ক্ষমতাসীন বিজেপির সহায়তায় এযাত্রায় আসে দেশের সংবাদমাধ্যম। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পর্রীকর সংবাদমাধ্যমের সেনা অভিযানের 'হাতিয়ে' আনা প্রমাণকে সমর্থন করে বলেন এতেই বিরোধীদের সব প্রশ্নের জবাব রয়েছে; আলাদা করে আর সরকারকে কিছু তথ্য পেশ করতে হবে না (ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ কারণ ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গার পর দেশের প্রধান মেনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মোদীর সম্পর্কে চিড় ধরে এবং কিছুকাল আগে পর্যন্তও তা যথেষ্ট স্বাভাবিক ছিল না)।
ভারতীয় গণতন্ত্র আজ সাবালক; সে প্রশ্ন করতেই পারে
এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে তরজা একটি জিনিস পরিষ্কার করে; তা হল: ভারতীয় গণতন্ত্রের সাবালকত্ব অর্জন। আর সমস্ত কিছুর মতো এদেশে আজ শাসনব্যবস্থারও গণতন্ত্রীকরণ ঘটেছে। এত মাধ্যম চারিদিকে এবং তার মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের এত ক্ষমতায়ন হয়েছে যে একতরফাভাবে আজ আর কিছু করা সম্ভব নয়।
স্থানীয় বিষয় থেকে শুরু করে ভারতের মার্কিন নীতি কী হবে, সে ব্যাপারেও রাম-শ্যাম-যদু-মধু সবারই মতামত ব্যক্ত করার আজ মঞ্চ রয়েছে। বিজেপি যেমন বিরোধীপক্ষে থাকাকালীন এর সুবিধা নিয়ে ইউপিএ সরকারকে ঘায়েল করেছিল গত লোকসভা নির্বাচনে, তেমনই আজ সেই একই মাধ্যমগুলি সরকারকে অনেক ক্ষেত্রেই চাপের মুখে ফেলছে। তাকে বাধ্য করছে পদক্ষেপ নিতে। আর তাতেও ছাড় নেই। পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও সরকারকে আরও পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে; প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তার পদক্ষেপের সততা নিয়ে।
এই যে ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে পড়া, এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দিক। গণতন্ত্র আদতে যে একটি দু'মুখো তলোয়ার, তা আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের বুঝতেই হবে (মোদী হয়তো তা ভালোভাবেই বোঝেন কিনতু তাঁর দলের কতজন বোঝেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে)। সবসময় যে এক পক্ষই সুবিধা পাবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।আর এখানেই ভারত পাকিস্তানের থেকে আলাদা। এদেশের মানুষের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে, অন্তত পাকিস্তানের মানুষের থেকে বেশি।
উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব এবং গুজরাতের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে মোদী, অমিত শাহ-রা ধেই ধেই করে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সুবিধা নিয়ে চলে যাবেন আর তাঁরা হাঁ করে দেখবেন, অত উদার আজকালকার বিরোধীকে ভাবলে ভুল হবে, তা যতই মোদীর দলের একার ঝুলিতে সংখ্যাগুরু আসন থাকুক।
আজকের ভারতে রাজনৈতিক গণতন্ত্র আর শুধু সংখ্যার হিসেবে আবদ্ধ নেই। নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন একটি সামাজিক কণ্ঠস্বরের একটি প্রভাব আজ কাজ করে এদেশের রাজনীতিতে এবং মোদীর মতো রাজনীতিবিদদের তার সঙ্গে সমানে আপোস করে যেতে হয়। সতীর্থদের বলতে হয় সেনা অভিযান নিয়ে অতিরিক্ত আস্ফালনের কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি জানেন তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
ইন্দিরা গান্ধীর মতো বেপরোয়া রাজনৈতিক আচরণ করা আজ আর সম্ভব নয় কিছুতেই। সম্ভব হলে এনডিএ সরকারকে সংবাদমাধ্যমের যেখানে সেনা অভিযানের ফুটেজকে হাতিয়ার করতে হতো না বিরোধীদের সামলাতে।












Click it and Unblock the Notifications