মুশারফ সাহেব, ভারত-পাকিস্তান নিয়ে আর ভাববেন না দয়া করে; আপনার প্রয়োজন বহুকাল হল ফুরিয়েছে

তিনিই চিরকালই ফিকির খোঁজেন। কখনও সফল হন, কখনও হন না। কিন্তু প্রাক্তন পাকিস্তানী সেনা প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ আছেন মুশারফেরই। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে (যিনি ঘটনাচক্রে এই মুহূর্তেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী) হটিয়ে সে-দেশের রাজনীতিতে প্রায় এক দশক দাপট দেখান। প্রথমে চিফ এক্সিকিউটিভ এবং পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজনীতিতে ছড়ি ঘুরিয়ে ২০০৮ সাল নাগাদ পতনের মুখ দেখেন। অবস্থা এতটাই খারাপের দিকে যায় যে মুশারফকে দেশ দেশ ছাড়তে হয়।

২০১৩ সালের পাকিস্তানের নির্বাচনের অংশ নেওয়ার একটা চেষ্টা চালিয়েছিলেন, কিন্তু হওয়া ততদিনে অন্যদিকে ঘুরে যাওয়াতে আর সুবিধে করতে পারেননি। এখন এই প্রাক্তন দুঁদে সেনানায়কের কাজ হচ্ছে লন্ডনে সুরক্ষিত দূরত্বে বসে পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা নিয়ে নানারকম জ্ঞান দেওয়া।

মুশারফ সাহেব আপনার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এবারে বিশ্রাম নিন

'ডন'-কে মুশারফ কী বললেন

সেইরকমই জ্ঞান আরও একবার দিলেন উনি, গত শনিবার (পয়লা অক্টোবর) পাকিস্তানের প্রথম সারির সংবাদপত্র 'ডন'-এর সঙ্গে কথা বলার সময়ে। অবশ্য এবার তাঁর লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের শাসক এবং ভারত, দুইই। দূরভাষের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুশারফ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একহাত নিয়ে বলেন তিনি তাঁর নিজের দেশের সংখ্যালঘুদের মন জয় করতেই ব্যর্থ।

আর ভারতের পাকিস্তানের প্রতি হুমকি সম্পর্কে মুশারফের বক্তব্য: "ভারতের মাটিতে যখনই কোনও আক্রমণের ঘটনা ঘটে, তারা পাকিস্তানের দিকে আঙ্গুল তোলে। মানেন রাখবেন পাকিস্তান ভুটান নয়।" তিয়াত্তর বছর বয়সী মুশারফ বলেন ভারতের সেনা শুধু হুমকিই দিতে পারে কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসল কাজটা করে দেখতে জানে।

নিজের দেশের শাসককেও একহাত নিলেন প্রাক্তন পাক সেনানায়ক

তবে মুশারফ চিরশত্রু ভারতের নিন্দা করেই ক্ষান্ত হননি। তাঁর নিজের দেশের বর্তমান শাসককে তিনি প্রবল আক্রমণ করে বলেন যে সরকারের ভুল নীতির ফলেই আজ পাকিস্তান সারা দুনিয়ায় একঘরে হয়ে পড়েছে।

শরিফ সরকারকে লক্ষ্য করে মুশারফ বলেন তারা বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ ধার নিয়ে একটিও মেগা প্রকল্প করে দেখতে পারেনি যাতে সাধারণ মানুষের উপকার হয়। "পাকিস্তানের মানুষ এই সরকারের দুর্নীতি দেখতে দেখতে ক্লান্ত," সাক্ষাৎকারে জানান প্রাক্তন পাক প্রেসিডেন্ট।

তবে কী তিনি নিজে ফিরছেন পাকিস্তানে? এ প্রশ্নের উত্তরে মুশারফ রক্ষণাত্মক সুরে বলেন তিনি ফিরতে চান ঠিকই কিন্তু এই সময়ে ফিরলে তাঁকে ঘোরাফেরার স্বাধীনতাটুকুও দেওয়া হবে না। তাই তিনি ফিরবেন তাঁর নামে চলতে থাকা মামলাগুলির নিস্পত্তি হওয়ার পরপরই।

মুশারফের বিদায়ের পরেই পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভিত কিছুটা হলেও শক্ত হয়

২০০৭ সালের ডিসেম্বরে প্রাক্তন পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের পরেই মুশারফের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। আর অন্যদিকে, ২০০৮ সাল থেকেই পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের ইতিহাসে আশার আলো সঞ্চারিত হয়। ওই বছরের নির্বাচনে প্রয়াত ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি ক্ষমতায় আসে এবং সে-দেশের অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম কোনও দল হিসেবে পুরো মেয়াদ পূর্ণ করে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন ক্ষমতায় আসে এবং গত তিন বছরে নানা অভিযোগে বিদীর্ণ হলেও শরিফের সরকার পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি কখনও তৈরী হয়নি। অর্থাৎ, আর দু'বছর যদি শরিফ টিকে যেতে পারেন, তাহলে পাকিস্তানি রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব খাটেনি -- এমন একটা পুরো দশক অতিবাহিত হবে। সে-দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে এটা একটা রেকর্ডই বটে।

মুশারফ অবশ্য জানিয়েছেন তাঁর অল-পাকিস্তান মুসলিম লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেবে অন্যান্য কিছু দলের সঙ্গে জোট বেঁধে।

মুশারফের পরামর্শ বিশেষ কাজে লাগবে বলে মনে হয় না

মুশারফের এই জ্ঞান আজকের পাকিস্তানকে কতটা সাহায্য করবে তা তিনিই জানেন। তাঁর মতো নেতারা নিজেরাই গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরেন আবার সেই গণতন্ত্রকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে গলা ফাটান। লক্ষ্য আর কিছুই নয়: চূড়ান্ত ডামাডোলের মধ্যে নিজের স্বার্থানুসন্ধান করা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বস্তরেই আজ এই একই ব্যাধি। একে অন্যের দোষারোপ করে বেড়ান ঠিকই, কিন্তু কেউই সঠিক পথ দেখিয়ে উঠতে পারেন না। এর ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

তবে মুশারফ পাকিস্তানে ফিরতে পারলেও এই বয়েসে নতুন করে আর কী করতে পারবেন, তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যে বছর মুশারফের মতো সামরিক অধিনায়ক পাকিস্তান ছাড়েন সাজা পাওয়ার ভয়ে, সে-বছরই পাকিস্তানে গণতন্ত্রের শুভযাত্রা শুরু হয়। ব্যাপারটা প্রতীকী। মুশারফের পরবর্তী জেনারেলরা কিন্তু ইসলামাবাদের তখ্ত ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কিন্তু কেউ নেননি; বরং সেনাকে আড়ালেই রেখেছেন। তার অর্থ, পাকিস্তানের রাজনীতিতে কিছুটা হলেও বদল এসেছে, মুশারফের মতো লোককেও নির্বাচনের পথেই সিস্টেমে ঢোকার কথা ভাবতে হচ্ছে।

গণতন্ত্রের হাজারটা দোষ থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়া কোনও সমাধান নয়। দেশের হিতে মুশারফের কী পরিকল্পনা তা তিনিই জানেন, কিন্তু পাকিস্তানকে পিছন দিকে ফের চালনা করতে চাইলে তা তাঁর এবং পাকিস্তান -- কারও পক্ষেই ভালো হবে না শেষ পর্যন্ত।

ভারত-পাকিস্তান নিয়ে মুশারফ বরং কম ভাবুন, তাতে সব পক্ষেরই লাভ।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+