একটা মৃত্যু, ১২ বছরেই অপমৃত্যু একটা পরিবারের
একটা মৃত্যুতেই ছারখার হয়ে গেল একটা সুখী পরিবার। রবিনসন স্ট্রিটের দে পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেল মাত্র ১২ বছরের মধ্যেই।
কলকাতা, ২ ফেব্রুয়ারি : একটা মৃত্যুতেই ছারখার হয়ে গেল একটা সুখী পরিবার। রবিনসন স্ট্রিটের দে পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেল মাত্র ১২ বছরের মধ্যেই। সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হল না। কলকাতার বুকে সাইকো শিহরণ জাগানো ঘটনার পরিসমাপ্তী ঘটল কঙ্কাল কাণ্ডের 'নায়ক' পার্থ দে-র অস্বাভাবিক মৃত্যুতে।[কঙ্কাল কাণ্ডের 'নায়ক' পার্থ দে-র অস্বাভাবিক মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু নাকি হার্টফেল? ]
সবকিছুই ছিল- অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠা। তবু আজ আর কিছুই নেই। একে একে সব শেষ। ১২ বছরেই সমাপ্তী একটা যুগের। মায়ের মৃত্যু যে আঘা বয়ে এনেছিল পরিবারে, তা আর কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারল না রবিনসন স্ট্রিটের দে পরিবার। একরাশ রহস্যের জট রেখেই পরিসমাপ্তী ঘটল কঙ্কাল কাণ্ডের।[অন্তরালে থেকেই চির অন্তরালে পার্থ দে! তবে কি ফের মানসিক অবসাদ গ্রাস করেছিল তাঁকে?]

দেখে নিন রহস্যঘন সেই ঘটনা পরম্পরা
- ২০০৫ সালে পার্থ দে-র মা আরতি দেবীর মৃত্যু হয়। তারপরই সমাজ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এই দে পরিবার। অস্বাভাবিক আচরণের সূত্রপাত সেই থেকেই। অরবিন্দবাবুও বেঙ্গালুরুতে উচ্চপদে কাজ করতেন, পার্থ ও দেবযানীও ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছিলেন। একটা সময়ে পার্থ কর্মসূত্রে আমেরিকায় থাকতেন। দেবযানী ছিলেন সঙ্গীতের শিক্ষিকা। কলকাতার নামী স্কুলে তিনি গান শেখাতেন। ভাইবোন দু'জনেই এরপর চাকরি ছেড়ে দেন। বাবা-ছেলে-মেয়ে বেছে নেন 'বন্দিদশা'
- এভাবেই কেটে গিয়েছে দশ-দশটা বছর। বাইরের জগতের সঙ্গে সে অর্থে কোনও যোগাযোগ নেই। নিজেরা নিজেদের মতো করে থাকেন। রবিনসনে স্ট্রিটের বাড়ির বাইরে কী ঘটছে, তা নিয়ে কোনও মাথাব্যাথাই নেই পরিবারের।
- ২০১৫ সালের ১০ জুন। রবিনসন স্ট্রিটে বাড়িতে বাথরুম থেকে উদ্ধার হল অরবিন্দ দে-র দেহ। গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন অরবিন্দবাবু। সুইসাইড নোটে তিনি জানিয়ে গেলেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। পার্থকে ভালো থাকার কথা বলে গেলেন সেই নোটে।
- ৮ জুন লেখা সুইসাইড নোট। দু'দিন আগে লেখা। রহস্য ছড়াল। পুলিশ তদন্তে নামল। কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে পড়ল কেউটে। কলকাতার বুকে শিহরণ জাগানো সাইকো কাহিনি। কঙ্কাল কাণ্ড। দিদির কঙ্কালের সঙ্গেই প্রায় ছ'মাস বাস করছেন পার্থ দে। বাবা অরবিন্দ দে-ও ছিলেন এই যাত্রায় ছেলের সঙ্গী।
- ২০১৪ সালের আগস্টে মারা গিয়েছিল তাঁদের পোষা দু'টি কুকুর। দু'টি কুকুরের দেহ বাড়িতেই রেখেছিলেন পার্থ। সম্মতি ছিল দিদি দেবযানী ও বাবা অরবিন্দবাবুরও।
- কুকুরের শোকে খাওয়াদাওয়া ছেড়েছিলেন দেবযানী। চার মাসের মধ্যে ২০১৫-র ডিসেম্বরে মৃত্যু হয় পার্থ-র দিদি দেবযানীর। তারপর থেকে প্রিয় দিদির দেহ নিজের ঘরেই রেখে দেন তিনি। বাবা অরবিন্দ দে আপত্তি জানায়নি ছেলের এই কর্মকাণ্ডে।
- পুলিশ তদন্ত নেমে জানতে পারে, পার্থ দিদির কঙ্কাল সামনে রেখে প্ল্যানচেটও করত। উদ্ধার হয় প্ল্যানচেটের সামগ্রীও।
- পুলিশ গ্রেফতার করে পার্থ দে-কে। শুরু হয় জেরা। সেই জেরায় অনেক গল্পই উঠে আসে। কিন্তু খুন বা অপরাধমূলক অন্য কোনও ঘটনার প্রমাণ পায়নি পুলিশ। পুলিশ জানতে পারে, সব মৃত্যুই অসুস্থ হয়ে বা আত্মঘাতী। তাই পার্থ দে-র অপরাধ শুধু প্রিয়জনের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ সৎকার না করে নিজের কাছে রেখে দেওয়া।
- শুরু হয় পার্থ দে-কে সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই। তাঁকে ভর্তি করা হয় পাভলভ মানসিক সেবাকেন্দ্রে। সেখানে থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন পার্থ। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে থাকেন তিনি।
- এরপরই মানুষের সেবায় নিযুক্ত করতে তাঁকে পাঠানো হয় মাদার হাউসে। সেখানকার পরিবেশে থেকে তিনি একেবারে সুস্থ হয়ে যান।
- এরই মধ্যে ২০১৫-র ৪ ডিসেম্বর চার্জশিট দেওয়া হয় কঙ্কাল কাণ্ডে। দেবযানীর দেহ আগলে রাখার অভিযোগে জামিনযোগ্য ধারায় চার্জশিট দেওয়া হয় পার্থ দে-র বিরুদ্ধে।
- ২০১৬-র ১৯ জানুয়ারি ব্যাঙ্কশাল আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন পার্থ। তারপরই আদালতের নির্দেশে তাঁর বাড়ি ফিরে পাওয়া। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তিও ফিরে পান তিনি।
- রবিনসন স্ট্রিটের বাড়িতে না থেকে মাদার হাউসেই ফিরে যেতে চাইলেন তিনি। তাঁর অর্ধেক সম্পত্তি মাদার হাউসে দান করার ঘোষণাও করেন। মাদার হাউসে চলে যান পার্থ।
- এরপর মাদার হাউস থেকে ছুটি নিয়ে তিনি অন্তরালে ফিরে যেতে চাইলেন। চলে গেলেন ওয়াটগঞ্জের অভিজাত আবাসনে। বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলেন তিনি।
- আবাসিকদের কথাতেই স্পষ্ট তিনি বেশ স্বাভাবিক ছিলেন। প্রতিদিন নিয়ম করে বের হতেন। বাজার করতেন। সঙ্গী ছিলেন এক কেয়ারটেকার। তবে কেনও জন সমাগমের মধ্যে যেতেন না। আবাসিকদের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তাও বলতেন।
- এরপরই ঘটল চাঞ্চল্যকর সেই ঘটনা। রবিনসন স্ট্রিটের কঙ্কাল কাণ্ডের 'নায়ক' পার্থ দে-র অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটল। ওয়াটগঞ্জের ওই আবাসন থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। দেহের পাশ থেকে একটি পেট্রলের বোতল উদ্ধার হয়। পাওয়া যায় একটি দেশলাইও। প্রাথমিক তদন্ত মনে করা হচ্ছে আগুন লাগিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন তিনি। একেবারে বাবার মৃত্যুর ছায়া ছেলের মৃত্যুতেও।












Click it and Unblock the Notifications