মমতার 'ট্র্যাম্প কার্ড' হয়েও আজ দূরে, কয়েক বছরেই তৃণমূলনেত্রীর কাছে ব্রাত্য এঁরা

সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে নন্দীগ্রাম, নেতাই যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গর্জে উঠছিলেন তখনই এই সব মুখগুলোও নেত্রীর হয়ে সওয়াল করতে গলা ফাটিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই যেন তখন এঁদের অস্তিত্ব।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির সঙ্গে এঁরা যেন প্রায় সমার্থক হয়ে গিয়েছিলেন। তৃণমূলনেত্রীর পাশে এঁদের দেখা পাওয়া যাবে না এমনটা ভাবাই যেত না। কোনও না কোনও পেশাগত জীবন থেকে আসা এই ব্যক্তিদের ঠিকানা যেন মিলে গিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।

সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে নন্দীগ্রাম, নেতাই যখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গর্জে উঠছিলেন তখনই এই সব মুখগুলোও নেত্রীর হয়ে সওয়াল করতে গলা ফাটিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই যেন তখন এঁদের অস্তিত্ব। কেউ তো পাকাপাকিভাবে নিজের পেশাগত জীবনকেও মধ্যজীবনে গুডবাই দিয়ে মমতায় ডেডিকেটেড করে ফেলেছিলেন নিজেকে। কেউ আবার মমতা সখ্যতাকে পোস্টারের মতো তুলে ধরে হয়ে উঠেছিলেন জেলার হর্তা-কর্তা বিধাতা। কিন্তু, এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চৌহদ্দিতেও এঁদের খুঁজে পাওয়া যায় না। হয় এঁরা এখন মমতা বিরোধী নতুবা মুখ লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রশাসনের হাত থেকে।

কুণাল ঘোষ

কুণাল ঘোষ

সাংবাদিক। কিন্তু, ছাত্রজীবনের রাজনীতির সুবাদে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় থেকে আস্তে আস্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠা শুরু। ২০১০ সালে কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে তাঁর হাতে গুরুতর দায়িত্ব সঁপেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর কুণালের উত্থান ছিল উল্কার মতো। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৩৪ বছরের বাম রাজত্বের মৌরসীপাট্টা ভেঙে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পরিবর্তনের সরকার তৈরি করেন তখন যেন আরও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন কুণাল। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদও নির্বাচিত হন। কিন্তু, সারদাকাণ্ডের পর থেকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত কুণাল। প্রিয় নেত্রীর সঙ্গে এখন তাঁর মুখ দেখাদেখি হয় এমনটা শোনা যায় না।

সমীর আইচ

সমীর আইচ

বামপন্থী মনোভাবাপন্ন শিল্পী। সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম, নেতাই-এর গুলি চালনায় বাম রাজনীতির বিরোধী হয়ে পড়েন। এরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরা শুরু। কিন্তু, প্রতিবাদী সমীর খোদ তৃণমূলের কিছু প্রভাবশালীর বিরুদ্ধেই গর্জে ওঠেন। তৃণমূল থেকে বিতাড়িত হতে দেরি লাগেনি। এককালে মমতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সমীর তৃণমূলপন্থী এমনটা কেউ আর বিশ্বাস করেন না।

শিখা মিত্র

শিখা মিত্র

তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়িকা ছিলেন একটা সময়। মধ্য কলকাতায় বহু দাপুটে তৃণমূলীকে এক হেলায় ডজ করে বিধাচনসভায় টিকিট পেয়েছিলেন। কিন্তু যে কৌশলে আদি তৃণমূলীদের মাত দিয়েছিলেন ,সেই চালেই তিনি নিজেই মাত খেয়ে যান। শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ঝামেলায়। আপাতত মমতা এবং তৃণমূল থেকে শতহস্ত দূরে শিখা। এখন তিনি কংগ্রেসের কর্মী।

সৌমেন মিত্র

সৌমেন মিত্র

একটা সময় তাঁর সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু, সেই সৌমেন মিত্রকেই তৃণমূলনেত্রী দলে টেনে নিয়েছিলেন। সৌমেন মিত্রর তৈরি করা রাজনৈতিক দল 'প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস' ২০০৯ সালে মিশে গিয়েছিল তৃণমূলের সঙ্গে। এর জেরে ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূলের টিকিটে সাংসদও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু, স্ত্রী শিখা মিত্র যিনি ২০১১ সালে তৃণমূলের টিকিটে বিধায়িকা হয়েছিলেন তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। এর প্রায় দু'বছরের মাথায় তৃণমূলকে টা-টা বাই-বাই করে দেন সৌমেন। অবশ্য তৃণমূল ছাড়ার আগে দলের সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

মনোজ চক্রবর্তী

মনোজ চক্রবর্তী

তৃণমূলে কোনও দিনই যোগ দেননি। রাজ্যে পরিবর্তনের সরকারে জোটসঙ্গী কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শীর্ষনেতা হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করতেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশাপাশেও ভালমতোই দেখা যেত তাঁকে। কিন্তু, জোটের ভাঙন শুরু হতেই বৈরিতা শুরু। মমতা ও মনোজ মুখোমুখি হয়ে এখন একে অপরকে সৌজন্য বিনিময় করছেন এমনটা কেউ দেখেছেন বলে জানা যায় না।

সুনন্দ স্যান্যাল

সুনন্দ স্যান্যাল

শিক্ষাবিদ হিসাবেই পরিচিত। বাম শিক্ষানীতির ঘোর সমালোচক হয়ে উঠেছিলেন একটা সময়ে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সূত্র ধরে মমতাপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু, তৃণমূলের শাসন ক্ষমতায় দলের নেতৃত্বে এবং নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলে ব্রাত্য হয়ে পড়েন সুনন্দ।

স্বপনকান্তি ঘোষ

স্বপনকান্তি ঘোষ

সজ্জন ভদ্রলোক বলেই পরিচিত। লন্ডনে রয়েছে তাঁর বিশাল ব্যবসা। দেশসেবা করার উদ্দেশে তৃণমূলে যোগদান এবং সিউড়ি বিধায়ক পদে নির্বাচিত হন। কিন্তু, সিউড়ি পুরসভার আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলে দলের শীর্ষনেতৃত্বের বৈরাগ্যভাজন হন স্বপনকান্তি। কারণ, সেসময় সিউড়ি পুরসভার ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল। এতটাই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন যে বিধানসভার মধ্যেই প্ল্যাকার্ড নিয়ে সিউড়ি পুরসভার তৃণমূল পুরবোর্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান শুরু করেন। পরিণামে খুব দ্রুত দল থেকে ব্রাত্য হয়ে পড়েন স্বপনকান্তি। একের পর এক শোকজের পরে বিধায়ক পদের সঙ্গে তৃণমূল থেকেও ইস্তফা দিয়ে দেন তিনি।

হুমায়ুন কবীর

হুমায়ুন কবীর

মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে অধীরের অন্যতম হাতিয়ার ছিলেন। কিন্তু, তাতে তৃণমূলে আসাটা আটকায়নি হুমায়ুনের। বিধায়ক না হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে মন্ত্রীও বানিয়ে দিয়েছিলেন। ৬ মাসের মধ্যে বিধায়ক হিসাবে জিতে আসতে পারেননি হুমায়ুন। এর জন্য মুর্শিদাবাদ জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের ইন্দ্রনীল সেন গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তুলেছিলেন তিনি। এই মুহূর্তে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হুমায়ুন। মমতার কাছে এসেও এখন বহু যোজন দূরে তিনি।

জগমীত সিং ব্রার

জগমীত সিং ব্রার

২০১৭-তে পঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচনের আগ দিয়ে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু, সপ্তাহ কয়েক আগে কলকাতায় এসে ইস্তফা দিয়ে যান জগমীত। কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতেই নেত্রীর হাতে ইস্তফাপত্র তুলে দেন তিনি। ইস্তফার কারণ হিসাবে, জগমীত পরিস্কার জানিয়ে দেন, 'পঞ্জাবে দলীয় সংগঠন জোরদার করতে প্রাণপাত করে দিয়েছি। কিন্তু, মনে পঞ্জাব নিয়ে আপনারা আগ্রহ হারিয়েছেন।' কংগ্রেস নেতা এবং বর্তমানে পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দ সিং-এর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে সেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। একটা সময়ে পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এবং খালিস্তানি জঙ্গিদের হাতে নিহত বিয়ন্ত সিং-এর জামানায় জগমীত প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

সুদীপ রায় বর্মণ

সুদীপ রায় বর্মণ

ত্রিপুরা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ২০১৬ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তৃণমূলে এসেছিলেন আরও ৫ বিধায়ক। ৬ বিধায়কের এই দল বদলের সুবাদে তৃণমূল কংগ্রেস ত্রিপুরায় প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠে। কিন্তু, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রামনাথ কোবিন্দকে সমর্থন করা নিয়ে সুদীপ রায় বর্মণ এবং তৃণমূলের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। সুদীপ-সহ ছয় বিধায়ককে বহিষ্কার করে তৃণমূল। সম্প্রতি তৃণমূলের সদস্যপদও ছেড়েছেন সুদীপ। বর্তমানে তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা এখন বিজেপি-তে।

লকেট চট্টোপাধ্যায়

লকেট চট্টোপাধ্যায়

সেলুলয়েডের জগত থেকে তাঁর তৃণমূলের হয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নেমে পড়াটা ছিল চমকের মতো। প্রথম থেকে মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেত্রীদের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন সভা-সমিতি থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের সঙ্গে একাধিক সভাতেও দেখা যেত তাঁকে। রাজ্য মহিলা কমিশনের সদস্য হয়েছিলেন লকেট। কিন্তু, একটা সময় গিয়ে দলীয়তন্ত্রের বিরুদ্ধেই গর্জে ওঠেন লকেট। শক-লাগা-লাগা-র মতোই তৃণমূল থেকে ছিটকে বেরিয়ে বিজেপি-তে যোগ দেন তিনি। এমনকী, প্রকাশ্যে তৃণমূল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলীয় নীতির বিরোধিতা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছিলেন তিনি।

মুকুল রায়

মুকুল রায়

রাজনীতির আঙিনায় পা রেখে সেই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী বলে মেনে নিয়েছিলেন সারদাকাণ্ডে সিবিআই জেরার মুখে না পরা পর্যন্ত তা ছিল অটুট। রাজনৈতিক মহলে সকলেই বলতে মমতার মুকুল থাকতে আর চিন্তা নেই। চাণক্যের মতো বুদ্ধির চাল চেলে অন্য দল থেকে ভাঙিয়ে কর্মী নিয়ে চলে আসবেন তিনি। বলতে গেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যা যদি হন তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ, তাহলে সেই মুখ এবং দলের চালিকা শক্তির পিছনে যে মাথাটি কাজ করত তাঁর নাম মুকুল রায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ট অনুগতের মতো বিশ্বস্ত যোদ্ধা। নেত্রীর সমস্ত নির্দেশ আর কৌশলকে কার্যকর করাই ছিল তাঁর মূল কাজ। কিন্তু, সেই মুকুল এখন গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছেন পদ্মের উত্তরীয়। তাঁর কাছে এখন ব্রাত্য ঘাস ফুল। তিনি এখন ব্যস্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণ করতে।

ভারতী ঘোষ

ভারতী ঘোষ

ভারতী কীভাবে 'প্রতাপশালী ভারতী' হয়েছেন তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য হাতটা মাথার উপরে না থাকলে ভারতী পশ্চিম মেদিনীপুরের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা হতে পারতেন না। ঝাড়গ্রাম এলাকার এক সাধারণ পুলিশ অফিসার থেকে ঝড়ের বেগে পুলিশ সুপার হয়েছিলেন ভারতী। সেখান থেকে সমস্ত সিনিয়রদের টপকে আস্ত জেলার এসপি হয়েছিলেন ভারতী। পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষমতায়ণে শেষকথা ছিলেন তিনি। এমনকী,তৃণমূলের দলীয় কার্যকলাপেও তাঁর প্রভাব থাকত। সেই ভারতীকে রাতারাতি এসপি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভারতী। কারণ তাঁর নামে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+