'এনআরসি একটা ন্যারো পলিটাসাইসড অ্যাজেন্ডা', আর কী বললেন বিশিষ্ট সাংবাদিক অরুণ চক্রবর্তী

বলতে গেলে একটা স্টেট ফেইলিওর বিষয়কে কোনওমতে ধামাচামা দিয়ে চলার চেষ্টা চলেছে। এই ধামাচাপা চেষ্টায় যেটা হয়েছে না কোনওদিন সঠিক সমস্যার সমাধান হয়েছে না বাঙালি বা অসমিয়াভাষীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

অসমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেশকিছু আদি সমস্যা। যার সূত্রপাত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলেই। কিন্তু, ব্রিটিশরা কোনওদিনই সেই সমস্য়ার সুরহা করেনি। অসমের সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল যখন ব্রিটিশরা এই রাজ্যের সঙ্গে পুরোপুরি বাঙালি অধ্যুষিত একটি এলাকাকে জুড়ে দিয়েছিল। নিজ জাতিসত্তায় বরাবরই সচেতন অসমিয়াভাষীদের কাছে এটা ছিল অপমান। তাদের মনে হয়েছিল অসমকে আরও একটি বাঙালি রাজ্য বানানোর জন্য ব্রিটিশরা তৎপর হয়েছে।

এনআরসি-র প্রয়োগে কতটা অবৈজ্ঞানিক, মুখ খুললেন এই সাংবাদিক

বাঙালিদের নিয়ে সেটা ছিল অসমিয়াভাষীদের বিদ্বেষের প্রথম সূত্রপাত। আর সেই সময় অসমের সঙ্গে জুড়ে ছিল নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়। অসম-নাগাল্যান্ড-মেঘালয় এই অঞ্চলে যে আঞ্চলিক জনজাতিগুলো ছিল তাঁদের আচার-আচরণ-সংস্কৃতি-খাদ্যাভাসের সঙ্গে বাঙালিদের কোনও দিক দিয়েই মিল ছিল না। শুধুমাত্র ধর্মের দিকটা ছাড়া বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে কোনও মিলই ছিল না এই বৃহত্তর অসমের আদি বাসিন্দাদের। এহেন একটা ভৌগলিক অঞ্চলে দেশভাগের সময় বাঙালি শরণার্থিরা প্রবেশ করেছিল+। কারণ, অসম সীমান্তের একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্ত। ভারতভাগ এতটাই অবৈজ্ঞানিক প্রয়োগ ছিল যে এতে প্রচুর মানুষের ভৌগলিক অবস্থান বদলে যাবে তা বোঝাই গিয়েছিল। ফলে অসমের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে যে এর প্রভাব পড়বে তাও জানতেন তৎকালীন কংগ্রেসের শীর্ষনেতারা। কিন্তু অসমিয়াভাষীরা পরিষ্কারভাবেই বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের দায় নিয়ে রাজি ছিলেন না। জহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলরা অসমের তৎকালীন কংগ্রেস নেতাদের আশ্বস্ত করেছিলেন রাষ্ট্রীয় তত্বাবধানে এইসব বাঙালি শরণার্থীদের আস্তে আস্তে তাঁদের ভৌগলিক পরিচয় ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে পুনর্বাসন করা হবে এবং এই পুনর্বাসন হবে অসমের বাইরে। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে তা কখনও হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে বাঙালি ও অসমিয়াভাষীদের মধ্যে পরিস্থিতি কতটা উত্তপ্ত হয়েছে তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

বলতে গেলে একটা স্টেট ফেইলিওর বিষয়কে কোনওমতে ধামাচামা দিয়ে চলার চেষ্টা চলেছে। এই ধামাচাপা চেষ্টায় যেটা হয়েছে না কোনওদিন সঠিক সমস্যার সমাধান হয়েছে না বাঙালি বা অসমিয়াভাষীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। উল্টে বিষয়টি নিয়ে হয়েছে রাজনীতি। বিশষ্ট সাংবাদিক ও বহির্বঙ্গ ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর অরুণ চক্রবর্তীর সঙ্গে ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলার পক্ষ থেকে কথা বলা হয়েছিল। অরুণ চক্রবর্তী তাঁর সাংবাদিকতা জীবনে উদ্বাস্তু এবং তার জেরে উদ্ভুত আর্থ-সামাজিক কাঠোমার বদল থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব অ্যাসাইমেন্ট সামলিয়েছেন। তাঁর মতে, 'এই সময়টা বড় সঙ্কটের। কারণ এমন সঙ্কটের সামনে দেশ কখনও পড়েনি। তুষের আগুনে মতো যা ধিকি ধিকি করে জ্বলছিল তাকে এভাবে দাউদাউ করে বের করে আনার কি খুব দরকার ছিল? এ প্রশ্নের জবাবটা কার কাছে পাওয়া যাবে? অসমে এনআরসি-র জন্য পূর্বভারত জুড়ে যে এক অস্থিরতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক চাহিদা পূরণের জন্য। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা হয়তো একটা আদর্শ কেস স্টাডি হয়ে থাকবে অসম-এনআরসি। রাতারাতি প্রায় চুয়াল্লিশ লক্ষ মানুষ স্টেটলেস! মানে রাষ্ট্রহীন।'

উদ্বাস্তু, অনুপ্রবেশ আজ বিশ্বের সমস্যা। কিন্তু আর কোনও দেশে এনআরসি-র মতো নাগরিক পঞ্জী নেই। অনুপ্রবেশ নিয়ে যে রাষ্ট্রটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার নাম ব্রিটেন। সেখানে রাতারাতি এত সংখ্যক লোককে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া হয়েছে এমন উদাহরণ নেই। অনুপ্রবেশ নিয়ে আমেরিকা কঠোর আইন প্রণয়নের কথা বললেও তা এখনও করে উঠতে পারেনি। অসমে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে গিয়ে যেটা হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে পুরুষানুক্রমে সেই ভুখণ্ডে বসবাসকারীরাই রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছেন। এই প্রসঙ্গে অরুণ চক্রবর্তীর মত, 'এনআরসি-র সঙ্গে কোনওভাবেই দেশ-নিরাপত্তার বিষয়গুলি সম্পর্কযুক্তই নয়। এখানে একটাই জিনিস প্রাধান্য পাচ্ছে তা হল রাজনীতি। পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক। এই রাজনীতির কোনও নীতি নেই। এনআরসি-তে রাজনৈতিক অ্যাঙ্গেলটাই প্রধান। একটা দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার কতগুলি নিয়ম রয়েছে। এমনকী একজন পাঁচ বছর একটি দেশে বসবাস করলে নাগরিকত্বের আবেদন জানাতে পারেন। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি ইন্ডিয়ান কি না এটা আমাকে কেন প্রমাণ করতে হবে। যে আমার ভারতীয় হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে তাকে তো আগে প্রমাণ দিতে হবে। সত্যিকথা বলতে এনআরসি-তে কোনও নীতির বালাই নেই। একটা সঙ্কীর্ণ রাজনীতির জন্য এনআরসি প্রয়োগ করা হয়েছে। এটা একটা ন্যারো পলিটাসাসাইড অ্যাজেন্ডা।'

এনআরসি-র প্রয়োগে কতটা অবৈজ্ঞানিক, মুখ খুললেন এই সাংবাদিক

ভাষার ভিত্তিতে যদি রাজ্য গঠন হওয়ার কথা। তাহলে অসমের সঙ্গে জুড়ে থাকা বারাক উপত্যকাকে ভিত্তি করে আলাদা রাজ্য তৈরি হল না কেন? দেশভাগ নিয়ে আলোচনার সময় কি এই নিয়ে আলোচনা করা যেত না? কারণ, বাঙালিদের নিয়ে অসমিয়াভাষীদের অসন্তোষ তখন কারোরই অজানা ছিল না। বারাকের সঙ্গে বাঙালি অধ্যুষিত আরও কিছু এলাকা জুড়ে দিয়ে আলাদা বাঙালি রাজ্য তৈরিতে অসুবিধা কোথায় ছিল? আসলে পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা বৃহৎ রাজ্যের পাশে আলাদা করে ফের একটা বাঙালি রাজ্য নিয়ে খুব একটা ভাবনা হয়নি। কিন্তু, এই ভাবনাটা হওয়ার দরকার ছিল তা সে সময় অনেকই বলেছিলেন। কিন্তু দেশভাগের তাড়াহুড়োতে ফের জটিলতা বাড়াতে রাজি ছিল না ব্রিটিশ থেকে শুরু করে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ। যার ফল আজও ভুগতে হচ্ছে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+