শত সমস্যায় জর্জরিত এই দেশে বামপন্থীরা একটা ইস্যু খুঁজে পান না? ভেবেই অবাক লাগে
এখন ভারতজুড়ে চলছে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন। সাত দফায় অনুষ্ঠিত হতে চলা এই নির্বাচনের ফলাফল জানা যাবে আগামী ২৩ মে। নরেন্দ্র মোদী না বিরোধী দল/জোটের কেউ ক্ষমতায় আসবেন কী না, তা জানা যাবে তখনই।
এখন ভারতজুড়ে চলছে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন। সাত দফায় অনুষ্ঠিত হতে চলা এই নির্বাচনের ফলাফল জানা যাবে আগামী ২৩ মে। নরেন্দ্র মোদী না বিরোধী দল/জোটের কেউ ক্ষমতায় আসবেন কী না, তা জানা যাবে তখনই।

ভোটের ফল কী হবে না হবে, সে কথা পরে জানা যাবে। কিন্তু ভোটের আগে বা যদ্দিন ভোট চলে, ততদিন আসল ইস্যুগুলির চর্চা কতটা দেখা যায় গণ পরিসরে? গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় তো নির্বাচনের নানাবিধ ইস্যু নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক হওয়াটাই অভিপ্রেত। কিন্তু বাস্তবে যেটা দেখা যায় তা হল কোনও নেতাকে নিয়ে উল্লাস বা কোনও নেতাকে নিয়ে মস্করা, নিন্দা। রাজনৈতিক দল, তাদের চিহ্ন এবং মুখ নিয়েই গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি সরগরম থাকে। শাসক বা বিরোধী -- কারও মুখেই ইস্যু নিয়ে 'অবজেকটিভ' বিতর্ক-আলোচনা শোনা যায় না। সামনাসামনি গঠনমূলক বিতর্কের রীতি আজও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তৈরী হল না।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে হয়। ভারতের মতো শত সমস্যা বিদীর্ণ একটি দেশে কি ইস্যুর সত্যি সত্যিই খামতি রয়েছে? নিশ্চই নয়। কৃষক সমস্যা, জলের সমস্যা, দারিদ্র্যের সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, ন্যূনতম জীবনধারণের সমস্যা -- তালিকার শেষ নেই। কিন্তু এত কিছু সমস্যা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের আগে বা প্রচার চলাকালীন কোনও দলকেই দেখা যায় না এইসব নিয়ে কথা বলতে। তারা বলতে চায় না কারণ তাতে তাদের বেশিরভাগেরই রাজনৈতিক দ্বিচারিতার দিকটি বেরিয়ে পড়বে ভরা হাটে। কিন্তু একথা মেনে নেওয়া বেশ কষ্টকর যে ১৩০ কোটিরও বেশি মানুষের একটি দেশে নির্বাচনের সময়ে দক্ষিণপন্থীদের সেই একচেটিয়া (অতি) জাতীয়তাবাদ, সেনাবাহিনীর শৌর্য্য ইত্যাদি নিয়ে শোরগোলের পাল্টা কোনও এজেন্ডা তৈরী করতে পারে না বিরোধীরা। যেটুকু পারে তা হচ্ছে নির্লজ্জ পপুলিজম-কেন্দ্রিক কর্মসূচিকে তোল্লাই দেওয়া।
বাম ভাবাদর্শ চিরকালই রয়েছে; যেটা নেই তা হল সদিচ্ছা
ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যেই ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি নিরাশ করে, তা হচ্ছে বামেদের প্রায় পঙ্গুত্ব। দুনিয়া জুড়ে রাজনৈতিক ভাবাদর্শের নিরিখে সমাজতন্ত্র বিপন্ন হলেও বামপন্থার কোনও বিকল্প আজও রয়েছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে যেখানে মানুষ এখনও বাঁচার ন্যূনতম অধিকারটি পেতে অবিরাম লড়াই করে চলেছে, সেখানে বামপন্থার সম্ভাবনা সীমিত, এমন কথা শুনলে ঘোড়াতেও হাসব। কিন্তু তাও এদেশের বামপন্থীরা কিছুই করে উঠতে পারেন না, নির্বাচনের সময়ে বা অন্য সময়ে।
এই ব্যর্থতার দু'টো কারণ।
রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে বামেরা হারিয়ে ফেলেছে নিজেদের পথই
প্রথমত, বামপন্থার অতি-রাজনীতিকরণ। শুধুমাত্র নির্বাচনে লড়ে ক্ষমতার অলিন্দে ঢোকার ধান্দায় ঘুরলে আখেরে বামপন্থাকেও অবক্ষয়ের ঘুনপোকায় ধরে। পশ্চিমবঙ্গে বামেরা যখন প্রথম এসেছিলেন রাজনৈতিক দিশায়, তখন রাজনৈতিক বা ভূমি সংস্কারের মতো পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন কারণ তখনও তাঁদের মধ্যে সাম্যগঠনের আন্দোলনের আদর্শ ভরপুর ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে বামপন্থীরা আদর্শ থেকে বিচ্যুত তো হয়েছিলেনই, পাশাপাশি মাটির সঙ্গে যোগাযোগটাও তাঁদের হারিয়ে গিয়েছিল। সেই যোগাযোগ আজও তাঁরা ফের খুঁজে পাননি -- কারণ রাজনৈতিক শক্তির ক্ষয় এবং তার সঙ্গে নেতৃত্বের দুর্বলতা।
অন্যান্য দলগুলি বামেদের পরিসর কেড়ে নিয়েছে
আর এর হাত ধরেই আসে দ্বিতীয় কারণটি। বামেরা যত পিছলে পড়েছেন, তত অন্যান্য বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী দল বামপন্থার ভেক ধরে আসলে নির্লজ্জ পপুলিজম-এর রাজনীতি করে বামেদের শেষ পরিসরটুকুও কেড়ে নিয়েছে। আজ তৃণমূল কংগ্রেস বা আম আদমি পার্টিকেই তাদের সমর্থকরা প্রকৃত মানবিক-মুখ সম্পন্ন বামপন্থী বলে মনে করে যদিও আসলে তাদের গণ-মুখী প্রচার নেহাতই নির্বাচনী গিমিক। এমনকী, প্রবলভাবে দক্ষিণপন্থী বলে অভিযুক্ত বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও যখন গরিব-গুর্বোদের হয়ে গলা ফাটান, তখন বোঝা যায় ভোট জিততে তিনিও ক্ষনিকের বামপন্থী হতে অপ্রস্তুত নন। আর অন্যদিকে, আধা-বামপন্থী দল কংগ্রেস তো রয়েছেই যাদের পপুলিজম-এর রাজনীতির জুড়ি মেলা ভার।












Click it and Unblock the Notifications