মুখে মার্কিনিদের 'তালাক' দিলেন বটে, কিন্তু বাস্তবে কতটা কামড় দুতার্তে দিতে পারবেন?

বেজিং-এ চিনা এবং ফিলিপিনো ব্যবসায়ীদের সামনে ভাষণ দেওয়ার সময়ে দুতার্তে বলেন: "আমেরিকা এখন পরাজিতদের দলে। আমি এসেছি আপনাদের সঙ্গে আদর্শগতভাবে হাত মেলাতে।"

ঠিক যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরে নিজের নতুন ভূ-রাজনৈতিক কৌশল সাজাতে ব্যস্ত, ফিলিপিন্স-এর রাষ্ট্রপতি রদ্রিগো দুতার্তে তাতে জল ঢালতে পূর্ণ উদ্যোগ নিলেন।

স্বাভাবিকভাবেই, চিনকে ঘিরতে ওবামা প্রশাসনের পরিকল্পনায় দুতার্তের এহেন আক্রমণ বেজিংকে যারপরনাই খুশি করেছে। শুক্রবার (অক্টোবর ২১) বেজিং-এর তরফে জানানো হয় যে দুতার্তের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করার ঘোষণাকে তারা সমর্থন জানাচ্ছে কারণ একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে দুতার্তের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

ফিলিপিনো রাষ্ট্রপতি দুতার্তে কি আসলে কাগুজে বাঘ?

আমেরিকার সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করল ফিলিপিন্স

চিনা বিদেশমন্ত্রকের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে একজন নির্বাচিত দেশনায়ক হিসেবে দুতার্তে ফিলিপিন্সের মানুষের হিতে কাজ করবেন বলেই তারা মনে করে। দুতার্তে গত বৃহস্পতিবার (অক্টোবর ২০) চিন সফর করাকালীন বেজিং-এ দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন যে তাঁর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্ত সামরিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করছে। সামাজিক অর্থে যদিও বা সম্পর্ক থাকবে, জানিয়েছেন দুতার্তে।

বেজিং-এ চিনা এবং ফিলিপিনো ব্যবসায়ীদের সামনে ভাষণ দেওয়ার সময়ে দুতার্তে বলেন: "আমেরিকা এখন পরাজিতদের দলে। আমি এসেছি আপনাদের সঙ্গে আদর্শগতভাবে হাত মেলাতে।"

"রাশিয়া, ফিলিপিন্স, চিন একদিকে, বাকিরা অন্যদিকে"

তিনি বলেন এরপর তিনি রাশিয়াতেও যেতে পারেন এবং সেখানেও তিনি রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনকে একই কথা বলবেন। "একদিকে বাকি বিশ্ব, আর একদিকে চিন, ফিলিপিন্স এবং রাশিয়া। এটাই এখন একমাত্র পথ," তিনি বলেন। এই বিস্ফোরক ঘোষণাটি আসে দুতার্তে এবং চিনা রাষ্ট্রপতি জি জিনপিং-এর মধ্যে আলোচনা হওয়ার পরেই।

আর দুতার্তের ফিলিপিন্সের পুরোনো মিত্র আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরেই বেজিং-এর তরফ থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়। চিনের একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে এও জানানো হয় যে বেজিং এবং ম্যানিলার মধ্যে দক্ষিণ চিন সাগর-সম্পর্কিত জলসীমার সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে এবং চিন এখন ফিলিপিন্সের পরিকাঠামোগত উন্নতির জন্য লগ্নি করতে প্রস্তুত।

ওয়াশিংটন বিস্মিত দুতার্তের কাণ্ড দেখে

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দুতার্তের এই ঘোষণাতে যথেষ্ট বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা স্বয়ং ফিলিপিন্সে দু'বার যান এবং সেদেশের সঙ্গে কৌশলগত মিত্রতার উপরে বার বার জোর দেন, সেখানে ম্যানিলার নীতিগতভাবে আচমকা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া ওয়াশিংটনের কাছে যে জোর ধাক্কা, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহ-বিদেশসচিব ড্যানিয়েল রাসেল-এর দিনকয়েকের মধ্যেই ফিলিপিন্সে গিয়ে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করার কথা। এখানে উল্লেখ্য, গত জুন মাসে নির্বাচিত হয়ে আসা দুতার্তে গত কয়েকমাসে বার বার ওবামাকে অশ্লীলভাষায় আক্রমণ করেন যার দরুন একবার দুই রাষ্ট্রপতির মধ্যে কথাবার্তাও ভেস্তে যায়।

দুতার্তে আমেরিকার উপর এত খাপ্পা কেন?

কিন্তু আমেরিকার উপর দুতার্তের এত রাগ কেন? ফিলিপিন্স তো ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা নয় যে মার্কিনিদের সেদেশের নেতৃত্ব "শ্রেণীশত্রু" মনে করবে। বরং, ফিলিপিন্স একসময়ে আমেরিকার উপনিবেশ থাকার ফলে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বরাবরই। তাহলে, দুতার্তের এত বিদ্বেষ কীসের আর এই বিদ্বেষের নীতি নিয়ে চলে তিনি কতটা কী করতে পারবেন?

আক্রোশ নীতিগত, ব্যক্তিগতভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে দুতার্তের রাগ নীতিগত প্রশ্নে। তাঁর দেশে আমেরিকার একসময়কার ঔপনিবেশিক শাসন তিনি এখনও ভোলেননি, বিশেষ করে ১৯০৬ সালে ফিলিপিন্সে মার্কিন সৈন্যদের হাতে শতাধিক মোরো মুসলমান গোষ্ঠীর সদস্যদের নিধন তাঁকে এখনও যন্ত্রণা দেয় বলে জানান দুতার্তের ঘনিষ্ঠজনেরা। দুতার্তের মায়ের পূর্বপুরুষরাও নাকি মিন্দানাও-এর মোরো গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

অতএব, দুতার্তের এই আমেরিকা-বিদ্বেষের পিছনে যে একটি ব্যক্তিগত আক্রোশ রয়েছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

কিন্তু বিদেশনীতিতে এই আক্রোশ দেখতে গেলে ফিলিপিন্স কতটা লাভবান হবে?

কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং দেশের বিদেশনীতিকে এক করে ফেলে কি দুতার্তে বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছেন? মুখে যদিও দুতার্তে হাঁকডাক করছেন প্রচুর, কিন্তু তিনি এও জানেন যে নিজের দেশে তিনি যে মাদক-কারবারিদের নিকেশ করার কড়া পন্থা নিয়েছেন, তাতে খুব বেশিসংখ্যক বন্ধু তিনি নিজের পাশে পাবেন না।

সম্প্রতি ওবামা প্রশাসন এই বিষয়ে দুতার্তে সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বার্তা দেওয়ার ফলেও দু'দেশের সম্পর্কে অবনতি হয়।

দুতার্তে বলছেন তো অনেক কিছুই, কিন্তু বাস্তবে কী করছেন?

কিনতু মুখে বললেও রাতারাতি ফিলিপিন্সের মাটিকে মার্কিন প্রভাবমুক্ত করা দুতার্তের পক্ষে সহজ কাজ হবে না। বিশেষজ্ঞ মহল জানিয়েছে, দুতার্তে বলছেন বটে, কিনতু এখনও কোনও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ তিনি নেননি।

আমেরিকাকে তাঁর দেশে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলিকে সীমিত ব্যবহার করতে দেওয়া বা একদমই না দেওয়ার মতো কোনও সিদ্ধান্ত এখনও ফিলিপিন্সের কট্টরবাদী রাষ্ট্রপতি নিতে পারেননি। সব মিলিয়ে, ফিলিপিন্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কোনও বিকল্প দিশা তিনি এখনও দেখিয়ে উঠতে পারেননি। শুধু ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে গরম গরম বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত থেকেছেন।

বরং, চিনের প্রতি দুতার্তের অবস্থান অনেক বেশি বাস্তববাদী

বরং, চিনের প্রতি দুতার্তের কূটনৈতিক অবস্থান অনেক বাস্তববাদী বলে মনে হয়েছে তাঁদের। বেজিং-এর সঙ্গে এই কয়েকদিন আগে পর্যন্ত দক্ষিণ চিন সাগরে জলসীমা নিয়ে কলহ বা ম্যানিলার পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় যাওয়ার পরেও দুতার্তে চিনের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে ভোলেননি। তিনি চাইছেন চিন যেন ফিলিপিন্সে উন্নয়নের জন্য কাজ করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশারদদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে দুতার্তে বরং তাঁর চিন কার্ডটি অনেক ভালো খেলছেন।

তবে তাঁর পক্ষ থেকে দুতার্তের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা ত্যাগ করার বেশি আর কিছু চিনকে দেওয়ার নেই বলে মতামত বিভিন্ন মহলের। আর তাতে, ফিলিপিন্সের লোকজনের বিশেষ কিছু লাভ নেই।

কিন্তু চিন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকিদের সম্পর্কে দুতার্তের কী অবস্থান?

তাছাড়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক গোষ্ঠী আসিয়ান-এর অন্যান্য সদস্য দেশগুলির সঙ্গেও ফিলিপিন্সের এই রাষ্ট্রপতি কতটা ভালো সম্পর্ক রেখে চলতে পারেন, তাও দেখার। 'গার্ডিয়ান' পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের মতে, আসিয়ানের অনেক দেশেরই মনে হয়েছে যে দুতার্তের কট্টরবাদী পদক্ষেপ ওই অঞ্চলে মার্কিন-চিন সংঘাত আরও বাড়াবে, যা তাদের কাছে মোটেই অভিপ্রেত নয়।

পাশাপাশি, ইন্দোনেশিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিপিনো মাদক-কারবারি মেরি জেন ভেলোসোকে ঘিরেও ম্যানিলা এবং জাকার্তার মধ্যে কোনও কূটনৈতিক সমস্যা দেখা দেয় কিনা, তার উপরেও লক্ষ্য রেখেছে বিশেষজ্ঞমহল। তাঁদের প্রশ্ন, নিজের দেশে যে দুতার্তে মাদক কারবারিদের ছেড়ে কথা বলেন না, তিনি কোন মুখে ইন্দোনেশিয়া সরকারের কাছে ভেলোসোর পক্ষে সওয়াল করবেন?

সব মিলিয়ে, দুতার্তেকে এখনও পর্যন্ত কাগুজে বাঘই মনে করছেন অনেকে। সত্যি তিনি কামড় দিতে পারেন কিনা, তা সময়ই বলবে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+