হায় রে দলিত! আম্বেদকরের জন্মবার্ষিকীর ঠিক একদিন পরই জানা গেল বিএসপি সবচেয়ে ধনবান দল
গতকাল, ১৪ এপ্রিল, বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৮তম জন্মবার্ষিকী পালিত হল। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়ে গিয়েছে গত ১১ এপ্রিল এবং এই সময়ে আম্বেদকরের মতো একজন রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিত্বের জন্মদিনটিকে
গতকাল, ১৪ এপ্রিল, বাবাসাহেব আম্বেদকরের ১২৮তম জন্মবার্ষিকী পালিত হল। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়ে গিয়েছে গত ১১ এপ্রিল এবং এই সময়ে আম্বেদকরের মতো একজন রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিত্বের জন্মদিনটিকে কাজে লাগাতে সব দলই উঠে পড়ে লাগবে, তাতে আর আশ্চর্য কী। প্রবাদপ্রতিম ওই দলিত নেতাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই একপ্রস্থ তরজা হয়ে গিয়েছে উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর সঙ্গে বিজেপি দলের সভাপতি অমিত শাহের। শাহ বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) শীর্ষ নেত্রীকে কটাক্ষ করে বলেন যে উনি আম্বেদকরের কথা শুধুমাত্র নির্বাচনের সময়েই বলেন। দলিত নেত্রী মায়াবতী পাল্টা আক্রমণ করেন শাহকে, বলেন ওসব বাজে কথা! বিএসপি আজও একটি আন্দোলন যা আম্বেদকরের নীতি-আদর্শ মেনে চলে।
এর ঠিক একদিন পরেই, অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল, সংবাদমাধ্যমে বেরোয় একটি খবর। জানা যায়, ভারতের সবক'টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএসপি-ই সবচেয়ে বেশি অর্থবান, অন্তত ব্যাঙ্ক ব্যালান্সের নিরিখে। নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া তার হিসেব অনুযায়ী রাজধানী অঞ্চলে মোট আটটি ব্যাঙ্ক একাউন্টে মায়াবতীর দলের গচ্ছিত আছে প্রায় ৬৭০ কোটি টাকা। পাশাপাশি, বিএসপি-র হাতে রয়েছে ৯৫ লক্ষেরও বেশি ক্যাশ। এবারের নির্বাচনে বিএসপি-র জোটসঙ্গী সমাজবাদী পার্টি রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে, তাদের জমা রয়েছে ৪৭১ কোটি টাকা। এই তালিকায় বিজেপি পঞ্চম স্থানে, তাদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ৮২ কোটি টাকা।

মায়াবতীর ‘আন্দোলন’ আজ ফুলে ফেঁপে একসা, অর্থনৈতিকভাবে
আম্বেদকরের জন্মবার্ষিকীর ঠিক পরের দিনই এই খবরটির আত্মপ্রকাশ বেশ বিদ্রুপাত্মক। যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আজও ভাবেন যে তাঁর দল আসলে একটি আন্দোলন, তাদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স এমন ফুলে ফেঁপে ওঠাটাকে ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে ঠিক কী বলা যেতে পারে? কমেডি না ট্র্যাজেডি?
দলিত রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে নিজেকে বরাবরই তুলে ধরেছেন মায়াবতী, দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত কাঁসিরামের শিষ্যা। বিজেপির উচ্চ-বর্গীয় রাজনীতির বিপরীত প্রান্তে নিজের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন আবার ভোটে জিততে নানা বর্গ, জাতিকে নিয়ে রামধনু সামাজিক জোট তৈরী করতেও পিছপা হননি তিনি। দুর্নীতির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে কম নয় এবং নিজের শাসনকালে রাজ্যজুড়ে নিজের এবং দলীয় চিহ্ন হাতির মূর্তি স্থাপন করে একনায়কতন্ত্রের পরিচয়ও তিনি কম দেননি।
কিন্তু বিজেপির মতো কর্পোরেট -প্রিয় দলকেও তিনি যখন ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের নিরিখে পিছনে ফেলে দেন, তখন তাঁর দলিত রাজনীতির আদর্শ নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয় বৈকি। যদি মায়াবতী সত্যিই আজও আন্দোলনের পথে চলেছেন, তাহলে দলিত রাজনীতির প্রতি এই সন্দেহ দেখা দেবে কেন?

আদর্শ নয়, বিএসপির মূল লক্ষ্য ক্ষমতা জয়
আসলে বিএসপি নেত্রী মুখে যতই আম্বেদকরের আদর্শের কথা বলুন না কেন, আন্দোলনের দোহাই দিন না কেন, আসলে তাঁর দল অন্যদের মতোই একটি ক্ষমতাপিপাসু শক্তি যাদের জন্যে নির্বাচন জেতা অত্যন্ত জরুরি। আর নির্বাচন জিততে আদর্শের চেয়ে অনেক বড় যে অর্থ তা আজকের দিনে একটি শিশুও জানে। ভারতে দলিত আন্দোলন মুখ্যত জাতি রাজনীতির উপরে কেন্দ্রীভূত এবং সেই আন্দোলনকে অন্তিম সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গেলে প্রয়োজন সবার আগে এই জাতিপ্রথাকেই বিলুপ্ত করা। কিন্তু মায়াবতী এবং তাঁর দল জানে যে আদর্শগতভাবে সেই অসাধ্যসাধন করা দূর অস্ত এবং সেই অসাধ্যসাধন হলে তাঁদের রাজনৈতিক মূলধনটিই খোয়া যেতে পারে। অতএব, একদিকে রামনাম জপের মতো আম্বেদকরের গুনগান গাইতেই থাকো কিন্তু পাশাপাশি এটাও খেয়াল রেখো যাতে দলিত রাজনীতির মধ্যে কোনও চিন্তাশীল প্রকৃত আন্দোলনের আমদানি না হয় কারণ তাতে দলিতদের হয়ে আপাতদৃষ্টিতে যারা লড়ছেন, তাদের সেই 'ব্যবসায়' ভাঁটা পড়ে যেতে পারে। এর ফলে যা হয়েছে তা হল দলিত উত্থানের নামে এক 'ব্যবসাদার' শ্রেণী তৈরী হয়েছে যাঁদের নিজেদের উত্থান হলেও সাধারণ দলিতরা হতদরিদ্রই থেকে গিয়েছে।

জয় হোক পার্টিতন্ত্রের!
বিএসপি আম্বেদকরের নাম গুনকীর্তন করে আজ যে দলিত উত্থানের রাজনীতির ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে দলিতের সত্যিকারের উপকার হোক বা না হোক, দলটির কর্মসূচি কখনও ব্যাহত হবে না এবং বিশেষ করে যতক্ষণ সংখ্যাগুরুবাদী এবং উচ্চবর্গীয় রাজনীতি করা বিজেপি যখন ক্ষমতায় যাচ্ছে। তাই দলিতদের উপকারের নামে এই পার্টিতন্ত্র চলতেই থাকবে এবং একটা দুটো নির্বাচন হারলেও সেখানে কিছু অসুবিধে নেই। ভুললে চলবে না, উত্তরপ্রদেশ গত তিনটি নির্বাচনে বিশ্রীভাবে হেরেও খতিয়ান বলছে বিএসপি সবচেয়ে অর্থশালী দল এই মুহূর্তে।












Click it and Unblock the Notifications