কেমন ছিল করোনা আক্রান্ত ও জয়ী হওয়ার অভিজ্ঞতা? অকপট বালাজি ও বরুণ
জৈব সুরক্ষা বলয়ের মধ্যেই চার দলের ক্রিকেটার, সাপোর্ট স্টাফরা করোনা আক্রান্ত হতেই স্থগিত রাখা হয় চলতি বছরের আইপিএল। দিল্লিতে থাকাকালীন করোনা আক্রান্ত হন চেন্নাই সুপার কিংসের বোলিং কোচ লক্ষ্মীপতি বালাজি। কলকাতা নাইট রাইডার্সের প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ ও বরুণ চক্রবর্তী করোনা আক্রান্ত হন আমেদাবাদে থাকার সময়। সকলেই এখন সুস্থ। করোনা জয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে নিজেদের বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথা ক্রিকইনফোকে জানালেন বরুণ ও বালাজি।

মানুষ বনাম বন্যের লড়াই
২ মে করোনা পজিটিভ ধরা পড়েন লক্ষ্মীপতি বালাজি। করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে ১৪ মে। করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে জয়লাভের প্রক্রিয়াকে মানুষ বনাম বন্যের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন বালাজি। তিনি বলেন, ২ মে শরীরে ব্যথা অনুভব করছিলাম, নাক বন্ধ ছিল, অস্বস্তিভাব থাকায় দুপুরের দিকে পরীক্ষা করাই। পরদিন সকালে জানতে পারি কোভিড পজিটিভ। শকড হয়েছিলাম। ভাবছিলাম জৈব সুরক্ষা বলয়ের বিধি মেনেও কীভাবে এমনটা হতে পারে? মুম্বই থেকে দিল্লি পৌঁছে দুইবার করোনা পরীক্ষা হয়, ১ তারিখ মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে আমরা ম্যাচ খেলি। করোনা রুখতে নিজের ইমিউনিটি পাওয়ার নিয়ে আত্মবিশ্বাসীই ছিলাম। প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম কিনা জানি না। বাইরে যে লোকে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন সে কথা জানতাম। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের লাগাতার মেসেজ আসতে থাকায়। উদ্বিগ্ন অবস্থাতেই চিকিৎসকদের পরামর্শমতো নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন হই। প্রার্থনা করছিলাম, আমার কাছাকাছি যাঁরা ছিলেন, ফিল্ডিং কোচ রাজীব কুমার, সিইও কাশী বিশ্বনাথন, রবিন উথাপ্পা, দীপক চাহার, চেতেশ্বর পূজারা, তাঁদের কারও যেন করোনা ধরা না পড়ে। পরে মাইক হাসির করোনা আক্রান্ত হওয়ার কথা জানতে পারি।

অস্তিত্বের সংগ্রাম
বালাজির কথায়, গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কঠোর সুরক্ষাবিধিই মেনে চলছিলাম। জানি না, মাঠ না ট্রেনিংয়ের মাঠ রোশনারা ক্লাব থেকে সংক্রমণ ছড়াল। আমরা দুজনেই কীভাবে আক্রান্ত হলাম! দিল্লিতে অতিমারি পরিস্থিতি খারাপ থাকায় আমাকে ও হাসিকে অক্সিজেন পড-সহ এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে চেন্নাইয়ে এনে সর্বক্ষণের জন্য মেডিক্যাল কেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। চেন্নাইয়ে ফিরে ভয় কাটল, আত্মবিশ্বাস বাড়ল। মানসিকভাবেও পজিটিভ হলাম। হাসির সঙ্গে নিয়মিত মেসেজ করে খবর নিতে থাকি। আমরা ভাগ্যবান, ভালো চিকিৎসা পেয়েছি। ১২ দিন আইসোলেশনে কাটিয়ে ১৪ তারিখ বাড়ি ফিরেছি। এই লড়াই আমার কাছে ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। কয়েক লক্ষ মানুষ আক্রান্ত, বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। নিজের ক্রিকেট জীবনে অনেক পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছি। কিন্তু অতিমারির সঙ্গে লড়াইয়ে কোনও কিছুরই তুলনা হয় না। ফ্র্যাঞ্চাইজি সময়োচিত পদক্ষেপ করাতেই আমরা করোনাকে জয় করতে পারলাম। মানুষের জীবনে যখন সঙ্কটে, বহু মানুষ একে অপরকে সাহায্য করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, আমিও সহযোগিতার হাত বাড়াতে চাই।

মনকে শান্ত রাখা
কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্পিনার বরুণ চক্রবর্তীর করোনা ধরা পড়ে ১ মে। তিনি করোনা নেগেটিভ হন ১১ মে। বরুণ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর সবচেয়ে কঠিন বিষয় মনকে সব কিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন করা। চারদিকে কী চলছে তা নিয়ে ভাবা বন্ধ করতে হবে। আইসোলেশনে থাকাকালীন পরিবার, সতীর্থ সব কিছুর থেকেই আমি দূরে, একা, এ ব্যাপারে নিজের মনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি করতে পেরেছিলাম। মনের মধ্যে শান্ত ভাব আনতে ওশো রজনীশের বই পড়েছি। আমার পরিবারেও করোনা থাবা বসিয়েছিল। তবু কাজটা কঠিন হলেও পেশাদার হিসেবে নিজের সেরাটা দিয়ে আমাকে আমার কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। তারই মধ্যে নিজেই করোনা আক্রান্ত হয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। নিজের জন্য শুধু নয়। হোটেলের বাইরে, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে। ১২ দিন আইসোলেশনে ছিলাম। একই ঘরে, রোজ একই রুটিন মেনে একইরকম খাবার খেয়ে একঘেঁয়েমি এসেছিল। কীভাবে দিন কাটাব সেটাই ছিল চ্যালেঞ্জ। একটু দেরিতে সকাল ৯টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠতাম। ব্রেকফাস্ট সেরে ওয়েব শো, মুভি দেখতাম। ভিডিও কলে ভাই-বোন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা হতো। দুপুরে খাওয়া সেরে ওষুধ খেয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতাম। আমার পরিবারের সকলেও শান্তভাবেই সবকিছু মেনে নিয়েছেন, প্যানিক করেননি।

এখনও ক্লান্ত
বরুণ চক্রবর্তী জানান, যেদিন করোনা ধরা পড়েছিল সেদিন ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। কাশি না থাকলেও জ্বর ছিল। তাই সেদিন অনুশীলন করিনি। ম্যানেজমেন্টকে জানাই, সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের অন্যদিকে দলের সকলের থাকা আলাদা করে রেখে আরটি-পিসিআর টেস্ট করানো হয়। কলকাতা নাইট রাইডার্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বরুণ বলেন, আইপিএল স্থগিত হওয়ার পরেও আমার খেয়াল রাখতে একজনকে রেখে দেওয়া হয়েছিল। আমার দুবার নেগেটিভ আসার পর তিনি বাড়ি যান। শাহরুখ খান সকলকে ফোন করে মোটিভেট করেছেন। আমার পরামর্শ, করোনাকে জয় করার পরও দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নিন। মাস্ক পরে থাকুন। আমিও বাড়ি ফিরে তেমনটাই রয়েছি। কাশি বা জ্বর না থাকলেও দুর্বলতা ও একটা আচ্ছন্নভাব রয়েছে। স্বাদ, গন্ধও পুরোপুরি স্বাভাবিক জায়গায় আসেনি। তাই অনুশীলন শুরু করিনি এখনও। তবে দ্রুতই অনুশীলন শুরু করতে পারব বলে আশা রাখছি।












Click it and Unblock the Notifications