লোকসভা ভোটে মথুরাপুরের ৭-০ লিড বিধানসভা ভোটে ধরে রাখা কঠিন তৃণমূলের
লোকসভা ভোটে মথুরাপুরের ৭-০ লিড বিধানসভা ভোটে ধরে রাখা কঠিন তৃণমূলের
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপিকে একটিও আসন না দেওয়ার প্রত্যয়ী সুর ধরা পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের গলায়। তবে একদিকে আমফান-দুর্নীতির অভিযোগ, বিজেপির উত্থানে সংগঠক শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা, আব্বাস সিদ্দিকীর শক্ত সংগঠন, বামেদের চাঙ্গা হয়ে ওঠা, এই সব কিছুর ফলেই আসন্ন বিধানসভা ভোটে সাত আসনে ৭-০ লিড ধরে রাখা কঠিন তৃণমূলের পক্ষে।

লোকসভা ভোটের চিত্র
সিপিআইএমের শক্ত ঘাঁটি মথুরাপুর লোকসভা আসনটি ২০০৯ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। ২০০৯, ২০১৪ সালের পর ২০১৯ সালেও এখান থেকে সাংসদ হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন চৌধুরীমোহন জাটুয়া। ২ লক্ষ ৩ হাজার ৯৭৪ ভোটে তিনি হারিয়েছিলেন নিকটতম বিজেপি প্রার্থী শ্য়ামাপ্রসাদ হালদারকে। তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার ছিল ৫১.৮৪ শতাংশ, বিজেপির-র ৩৭.২৯ শতাংশ। তিনে থাকা সিপিআইএমের ভোটের হার ৬.৫৯ শতাংশ, কংগ্রেসের ২.৩১ শতাংশ। সবচেয়ে মজার কথা হলো, সিপিআইএমের ৩২.০৮ শতাংশ ভোট কমেছে, যা যোগ হয়েছে বিজেপির খাতায়। ফলে রায়দিঘি আসনে কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের ইমেজ ছাড়া বাকি আসনগুলিতে তৃণমূল বনাম বিজেপির সরাসরি লড়াইয়ের সম্ভাবনাই বেশি।

পাথরপ্রতিমা
পাথরপ্রতিমা বিধানসভা আসন থেকে ২০১৬ সালে বিধায়ক নির্বাচিত হন সমীরকুমার জানা। তিনি (১,০৭,৫৯৫) ভোটে হারিয়েছিলেন কংগ্রেসের ফণীভূষণ গিরিকে (৯৩,৮০২)। বিজেপি সেবার ছিল তৃতীয় আসনে। যদিও গত লোকসভা ভোটে পাথরপ্রতিমা বিধানসভা ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা তৃণমূলের পরেই উঠে আসে বিজেপি। তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ১,১৩,০৬০ ভোট, বিজেপি প্রার্থী পান ৭৭,২৮১টি ভোট।

কাকদ্বীপ
কাকদ্বীপ থেকে ২০১৬ সালের ভোটে জিতেছিলেন মন্টুরাম পাখিরা। তিনি মন্ত্রীও হন। সেবার তিনি জেতেন ১,০৪,৭৫০ ভোট পেয়ে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের রফিকউদ্দিন মোল্লা পেয়েছিলেন ৭৯,৮৩১টি ভোট। সেবারও অনেক ভোট কম পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল বিজেপি। কিন্তু কাকদ্বীপ বিধানসভা ক্ষেত্রে বিগত লোকসভা ভোটে তৃণমূলের পরে দুইয়ে ছিল বিজেপি। তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ১,০৬,২৩০টি ভোট। বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন ৮০,৭৪৭টি ভোট।

সাগর
২০১১ ও ২০১৬ সালে সাগর বিধানসভা আসন থেকে জিতে বিধায়ক হন তৃণমূল কংগ্রেসের বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা। সাগর বিধানসভা ক্ষেত্রও লোকসভা নির্বাচনে লিড দিয়েছিল তৃণমূল প্রার্থীকেই। তিনি পেয়েছিলেন ১,১৯,০৭০ ভোট, বিজেপি প্রার্থী পান ৮৭,০৫৮ ভোট।

কুলপি
কুলপি আসনটিও রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলেই। এখানকার বিধায়ক যোগরঞ্জন হালদার। তবে কুলপি বিধানসভা ক্ষেত্রে বিগত লোকসভা ভোটেও একই চিত্র। তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ৯০,৫১২টি ভোট, বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন ৬৪,৮২৪টি ভোট।

রায়দিঘি
রায়দিঘিতে তৃণমূল প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও মার্জিন অনেকটাই কমিয়ে ফেলে বিজেপি। এমনকী এখানকার বিধায়ক দেবশ্রী রায়কে এবার তৃণমূল প্রার্থীও করেনি। কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়কে হারিয়ে চমক দিয়েছিলেন দেবশ্রী। তবু বিধায়কের এলাকায় না যাওয়া, দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে অস্বস্তি বাড়ে তৃণমূলের। তবে কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় সব সময় মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকেছেন, এমনকী আমফানের সময়েও। রায়দিঘিতে এবার তৃণমূলের আসন ধরে রাখা কঠিন। গত লোকসভা ভোটে রায়দিঘিতে তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ১,০৪,২৬১টি ভোট, বিজেপি প্রার্থী পান ৯১,৩৪২ ভোট।

মন্দিরবাজার
মন্দিরবাজার বিধানসভা আসনটিও তৃণমূল কংগ্রেসের দখলেই রয়েছে। এখানকার বিধায়ক জয়দেব হালদার, তিনি ৫২.৭২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। মন্দিরবাজার বিধানসভা ক্ষেত্রে তৃণমূল প্রার্থী গত লোকসভা ভোটে পেয়েছিলেন ৯৩,৮১৯টি ভোট, বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন ৭২,৫৯৫ ভোট।

মগরাহাট পশ্চিম
মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা আসনটি থেকে জিতে বিধায়ক হন তৃণমূল কংগ্রেসের গিয়াসউদ্দিন মোল্লা। এই বিধানসভা ক্ষেত্রেও গত লোকসভা ভোটে তৃণমূলই এগিয়ে ছিল। তৃণমূল প্রার্থী এখানে সবচেয়ে বড় লিড পেয়েছিলেন। ভোট পান ৯৯,৫১১টি, বিজেপি প্রার্থী তার অর্ধেকেরও কম (৪৮,৪২৯)।

ভোটের ফ্যাক্টর
এই লোকসভা আসনের সব কটি বিধানসভা ক্ষেত্রেই তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও লোকসভা ভোটের পর আমফান সব ওলটপালট করে দিয়েছে। বিপুল দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ মানুষ। জেলার বিভিন্ন বিধানসভা আসনে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল, মাদার বনাম যুবর লড়াই বড় সমস্যা। দলে ভাঙন অব্যাহত। বিজেপির উত্থানের পিছনে এই কারণ সবচেয়ে আগে রাখতেই হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসে থাকাকালীন এই জেলায় শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতাও তৃণমূলের জয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। এবার তিনি বিজেপির দায়িত্বে। ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার এই আসনগুলিতে শোভন-ফ্যাক্টর অস্বীকারের উপায় নেই। আবার বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনে আব্বাস সিদ্দিকিও কয়েক বছর ধরে প্রভাব বাড়িয়েছেন ভালোই। ফলে ভোট ভাগাভাগি হলে অনেক আসনের ফলাফলই ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।












Click it and Unblock the Notifications