রেলের চাকরি নিয়ে দুই রাজ্যে ক্ষোভ, যা দেখিয়ে দিল ভারতে চাকরির বাজারের ভয়াবহ দৃশ্য
ভারতে চাকরির বাজারের ভয়াবহ দৃশ্য
রেলের চাকরি নিয়ে বিহার ও ভোটমুখী উত্তরপ্রদেশে যে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছে তা ভারতের সবচেয়ে বড় বেকারত্ব নিয়ে হিংসাত্মক ঘটনা বলে মনে করছেন অনেকে। এই দুই রাজ্যের বহু জায়গাতেই এই বিক্ষোভ হচ্ছে। উল্লেখ্য, রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের পরিচালিত নন–টেকনিক্যাল পপুলার ক্যাটাগরির (আরআরবি এনটিপিসি) পরীক্ষা ঘিরে হিংসা ছড়ায় বিহার ও উত্তরপ্রদেশে। একাধিক রিপোর্টের খবর অনুযায়ী, রেলের ৪০ হাজার শূন্যপদের জন্য কমপক্ষে ১ কোটি আবেদন জমা পড়েছিল। প্রতিবাদের রাজনীতি সত্ত্বেও বিরোধী দলগুলি এই ইস্যু ও পুলিশের হস্তক্ষেপ এই উভয় বিষয় নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) আক্রমণ করেছে। বিরোধীরা জানিয়েছে যে ভারতের চাকরির বাজার তৈরি করতে পারে এমন আর্থ–সামাজিক অস্থিরতার জন্য তাদের সাহায্যকারী হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। এই পরিপ্রেক্ষিতে চারটে চার্ট তুলে ধরা হল।

তরুণদের জন্য ভারতের শ্রমবাজার সবচেয়ে খারাপ স্তরে রয়েছে
বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য দেখিয়েছে যে তরুণদের (১৫-২৪ বছরের জনসংখ্যা) জন্য ভারতের শ্রমবাজার অত্যন্ত খারাপ জায়গায় রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিম্ন শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার (এলপিআরএফ) কম থাকা সত্ত্বেও উচ্চ যুব বেকারত্ব হারের ধারাবাহিকতা রয়েছে। এলপিএফআর অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় জনসংখ্যার তথ্য শেয়ার করে বলেছে ওপরে দেওয়া বয়সের গোষ্ঠার মধ্যে নয় তারা কাজ করছে অথবা কাজের সন্ধান করছে। ভারতের ১৫-২৪ বছরের জনসংখ্যার মধ্যে এই সংখ্যাটি মাত্র ২৭.১ শতাংশ, যা উল্লেখযোগ্যভাবে অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম। তবে নিম্ন এলএপপিআর থাকা সত্ত্বেও ভারতে যুব বেকারত্বের হার উচ্চ। বেকারত্বের হার শ্রমশক্তিতে বেকার ব্যক্তিদের ভাগ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সময় অনুযায়ী দেখা গিয়েছে যে গত ১৫ বছরে ভারতে বেকারত্বের জায়গাটি আরও খারাপ জায়গায় চলে গিয়েছে।

শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে অমিল
শিক্ষার পর্যায় ও কর্মসংস্থান এই দুইয়ের মধ্যে অমিল ভারতের শ্রম বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে বিরত রেখেছে। ২০১৮-১৯ সালের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (পিএলএফএস) পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে যে (২০১৯-২০ পিএলএফএস-এ প্রাক-মহামারি তথ্যের তিন চতুর্থাংশ এবং কঠোরতম লকডাউনের এক চতুর্থাংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা প্রাক-মহামারি পরিস্থিতি বা পোস্ট-মহামারিকে প্রতিফলিত করে না সম্পূর্ণরূপে) এই সমস্যার কেন্দ্রীয়তাকে আন্ডারলাইন করলে, যা মহামারি থেকে আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও ভারতে স্কুল এবং উচ্চ শিক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই নথিভুক্তর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে এই শিক্ষা বেশিরভাগ তরুণ ভারতীয়দের শ্রমবাজারের বিশেষ দক্ষতা দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে অনেকেই দাবি করতে পারেন যে উচ্চশিক্ষা (যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে) আসলে তরুণ জনসংখ্যার চাকরির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কারণ তারা ব্লু কলার চাকরি থেকে বিরত থাকছেন এবং যে ধরনের চাকরি তাঁরা চান, তা পাচ্ছেন না। এটা বলা ভালো যে বেকারত্বের হার আসলে শিক্ষার স্তরের সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেখা গিয়েছে যে ১৫-২৯ বছর বয়সের উচ্চ শিক্ষার বেকারত্বের হার অন্য বয়সের জনগোষ্ঠীর তুলনায় দ্বিগুণ। ভারতে নিম্নমানের সরকারি চাকরির ব্যাপক চাহিদার কারণ হল তাঁদের যোগ্যতা এবং পরীক্ষার মানদণ্ড প্রায়শই উচ্চ মাধ্যমিক বা স্নাতক ডিগ্রির মতো সাধারণ শিক্ষাগত স্তরে গঠন করা হয়।

বেসরকারি ক্ষেত্রে বেতন খুব কম ও অসুরক্ষিত
কর্মসংস্থান নিয়ে যখন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, তখন কর্ম সৃজনকে উৎসাহিত করা (চাকরি খোঁজার বিপরীত) বর্তমান সরকারের অন্যতম মৌখিক-সমাধান হিসাবে ধরা হয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন তরুণরা নিম্নমানের সরকারি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে এই ধারণাটি গ্রহণ করছে না এবং এখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে? সহজ উত্তর হল এই নিম্নমানের সরকারি চাকরিগুলোও ভালো বেতন দেয় যা অন্য ধরনের চাকরিতে পাওয়া যায় না। তার প্রমাণ পরিসংখ্যানই দেবে। ২০১৮-১৯ সালের পিএলএফএস অনুযায়ী, বেতনভুক্ত কর্মসংস্থানে গড় মাসিক আয় ছিল ১৬,১৬০, উল্লেখযোগ্যভাবে ১০,৭২৫ এবং ৮,৩৪০ স্ব-কর্মসংস্থান এবং নৈমিত্তিক কাজের (সরকারি কাজ ব্যতীত) থেকে বেশি। অর্থই শুধুমাত্র কারণ নয়, সরকারি চাকরি যেটা দেয়। সরকারি চাকরিতে রয়েছে নিরাপত্তা যা চাকরির সন্ধান করা তরুণ বেকারদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। দেখা গিয়েছে, বেসরকারি চাকরিতে ১৫-২৯ বছর বয়সের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭৮ শতাংশের লিখিত চুক্তি ছিল না। অথচ সরকারি ক্ষেত্রে এই ৩০ বয়স ও তার ঊর্ধ্বে থাকা যুবকদের ৬৬ শতাংশের চাকরির চুক্তি হয়ে গিয়েছিল।

বিহার ও উত্তরপ্রদেশে বেকারত্বের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী
২০১৮-১৯ সালের পিএলএফএস-এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৫.৫ শতাংশ বেকার বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে, যা এই দুই রাজ্যের মোট জনসংখ্যার (২৪.৫ শতাংশ) প্রায় সমান। শুধুমাত্র তাদের আকারের কারণে, তারা দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশ বেকারদের প্রতিনিধিত্ব করে (সব বয়সের মধ্যে ২৩.৫% এবং ১৫-২৯ বছর বয়সের মধ্যে ২২.৯%)। শুধু তাই নয়, সাধারণ শিক্ষার উপর নির্ভরশীলতা তাদের অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে। ২০১৭-১৮ সালের এনএসও-তে স্নাতক বা উচ্চ শিক্ষার সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রযুক্তি বা তথ্য প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিনের মতো পেশাদারি কোর্স ছেড়ে বিহারের ৯৬ শতাংশ হিউমানিটিস (৭০ শতাংশ), বিজ্ঞান ও কমার্স-এর জেনারেল কোর্সে নথিভুক্ত করছে। অসম ও ঝাড়খণ্ডে জেনারেল কোর্সে ভর্তি হচ্ছে ৯০ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশে সেভাবে ভালো ফল দেখা যায়নি, ৮৫ শতাংশ ভর্তি হচ্ছে জেনারেল কোর্সে। তাই এই সময়ে এ ধরনের বিক্ষোভ বিহার ও উত্তরপ্রদেশে হওয়া খুবই স্বাভাবিক।












Click it and Unblock the Notifications