তৃণমূলকে হঠাৎ করেই অনেক সংগঠিত লাগছে, বিজেপি চলে গিয়েছে ডিফেন্সিভ মোডে
তৃণমূল হঠাৎ করেই অনেক সংগঠিত, বিজেপি ডিফেন্সিভ মোডে
হঠাৎ করেই তৃণমূল কংগ্রেসকে অনেক সংগঠিত মনে হচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার নির্বাচনে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করার পর যেভাবে বিজেপির মোকাবিলা করছে, তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে সপ্রতিভ লাগছে। আর যতটা সপ্রতিভ লাগছে তৃণমূলকে, ততটাই ডিফেন্সিভ মোডে চলে গিয়েছে বিজেপি। বিজেপির সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ফাঁক থেকে যাচ্ছে।

মোদী-বিরোধী প্রধান মুখ মমতা, বোঝাতে তৎপরতা
বাংলার নির্বাচনে বিজেপিকে হারানোর পর তৃণমূল ভিনরাজ্যের দিকে নজর দিয়েছে। তারমধ্যে উল্লেখয়োগ্য ত্রিপুরা ও গোয়া। দুটোই বিজেপিশাসিত রাজ্য। আকারে ছোট। আদতে বাংলার একটা কি দুটো জেলার মতো আয়তন। ভারতের দুই প্রান্তে দুই রাজ্যকে টার্গেট করে তৃণমূল ভিনরাজ্যের রাজনীতিতে পসার জমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তৃণমূলের উদ্দেশ্য দুটো, প্রথমত নিজেদের সর্বভারতীয় তকমা ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই যে তৃণমূলই দিতে পারে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই যে এই মুহূর্তে দেশে মোদী-বিরোধী প্রধান মুখ, তা বোঝাতে চাইছে তারা।

একুশের নির্বাচনের আগে মমতার দলের অস্তিত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে
বাংলা থেকে শুরু করে ত্রিপুরা বা গোয়া- যেখানেই তৃণমূল পা রাখতে চাইছে, তাদের সঙ্ঘবদ্ধ লাগছে। বাংলায় ভোটের আগে তৃণমূলকে ভঙ্গুর বলেই মনে করেছিল রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ। যেভাবে বাংলায় ভাঙতে শুরু করেছিলেন তৃণমূল, তাতে তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠেছিল। শুভেন্দু অধিকারী, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো তরুণ তুর্কি নেতা, যাঁরা তৃণমূলের ভবিষ্যৎ বলে চিহ্নিত হচ্ছিলেন, তাঁরাই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছিলেন। তার আগে তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড বলে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত মুকুল রায় তৃণমূল ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। প্রথমে মুকুল রায়ের হাত ধরে, পরে ২০২১-এর ভোটের আগে শুভেন্দু-রাজীবদের সঙ্গে তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান মমতার দলের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।

বাংলার মানুষের পূর্ণ আস্থা রয়েছে মমতাতেই, ফিকে গেরুয়া
কিন্তু ২০২১-এর নির্বাচন যাবতীয় উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে জানিয়ে দিয়েছে বাংলার মানুষের পূর্ণ আস্থা রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশ্মায় বাংলায় ফের সবুজ ঝড় উঠেছিল। আর গেরুয়া-লড়াই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। শুভেন্দু-রাজীবরা কোনও লড়াই দিতে পারেনি কার্যত। ২০০ আসনের স্বপ্ন দেখালেও তা ৭৭-এই থমকে গিয়েছিল। আর ড্যাংডেঙিয়ে রেকর্ডসংখ্যাক ২১৩ আসন নিয়ে ক্ষমতায় বিরাজ করেছিল তৃণমূল। এখন তা বেড়ে আবার খাতায়-কলমে ২১৭ হয়ে গিয়েছে। আর বিজেপির ভাঙন ধরলে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা বেড়ে ২২২ হয়ে গিয়েছে। বিজেপি ৭৭ থেকে কমে ৭০-এ নেমেছে।

নির্বাচনের পরেই বাংলার রাজনীতিতে উল্টো স্রোত
বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূলে জোয়ার এনে দিয়েছে একুশের কুরুক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়দের বিরাট জয়লাভ। একইভাবে বিজেপিকে কোণঠাসা করে দিয়েছে। নির্বাচনের পরেই বাংলার রাজনীতিতে উল্টো স্রোত বইতে শুরু করে। হাওয়া ঘুরে যায় তৃণমূলের দিকে। বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে ফিরতে শুরু করেন দলত্যাগীরা। মুকুল রায়কে দিয়ে শুরু হয় ঘরওয়াপসি। তাতেই মুকুল রায়ের অনুগামীরা তৃণমূলমুখী হতে শুরু করে। তারপর রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপির আরও চার বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দেন। তৃণমূলে যোগ দেন বাবুল সুপ্রিয়র মতো জনপ্রিয় কেন্দ্রীয়মন্ত্রীও।

ত্রিপুরায় শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সঙ্ঘবদ্ধ তৃণমূল
তৃণমূল এরই মধ্যে ত্রিপুরা ও গোয়ার মতো রাজ্যে নজর দিতে শুরু করে। সেখানেও তাঁরা সংগঠন বাড়ানোর পাশাপাশি সঙ্ঘবদ্ধতার ছাপ রাখতে শুরু করে। বিশেষ করে ত্রিপুরায় সবে শুরু করে যেভাবে শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই সঙ্ঘবদ্ধ করছে, তাতে খুব দ্রুত ত্রিপুরায় প্রধান বিরোধী মুখ হয়ে উঠছে তারা। কংগ্রেসকে ভেঙে সংগঠন বাড়িয়ে যেমন নিজেদের ক্ষমতাতে তারা জাহির করতে শুরু করেছে। এবং সিপিএমকে সাইডে রেখে বিজেপির চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠছে, তাতে প্রচারে অন্তত কয়েক কদম এগিয়ে থাকছে তারা।

বিজেপির বালখিল্যতায় তৃণমূলকে অনেক সঙ্ঘবদ্ধ লাগছে
তৃণমূল ত্রিপুরায় পা রাখতেই বিজেপি যেভাবে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছে, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই বালখিল্য হয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল ত্রিপুরার রাজনীতিতে নবাগত হলেও তাঁরা বিজেপির প্রতিরোধকে অবলীলায় সরিয়ে দিচ্ছে। বিজেপি অনেক ক্ষেত্রেই শিশুসুলভ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছে, যার ফলে তৃণমূলকে অনেক সঙ্ঘবদ্ধ লাগছে এবং বিজেপি চলে যাচ্ছে একেবারে ডিফেন্সিভ মোডে। বিজেপি ক্ষমতা দেখিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও, তাদের প্রতিরোধ টিকছে না তৃণমূলের কাছে।

ত্রিপুরার রাজনীতিতে তৃণমূলের আন্দোলনই জয়ী বারবার
হালে বঙ্গ তৃণমূলের রাজ্য সভানেত্রী সায়নী ঘোষকে নিয়ে বিপ্লব দেব সরকারের পুলিশ যা করল, তাতে তৃণমূলকে আরও জায়গা করে দিল ত্রিপুরার রাজনীতিতে। ফের একবার বিজেপি সরকারের পুলিশ ও প্রশাসনকে ধাক্কা দিয়ে ত্রিপুরার রাজনীতিতে তৃণমূলের আন্দোলনই জয়ী হল। সায়নীকে যে জোর করে আটকে রাখা হয়েছিল তা প্রমাণ হয়ে গেল আদালতে। খেলা হবে স্লোগান দেওয়ারর অপরাধে খুনের চেষ্টার মামলা দেওয়া একেবারেই বিজেপি সরকারের পুলিশের শিশুসুলভ আচরণ, যা ধোপে টিকল না।

সুদীপের সমালোচনা তৃণমূলের পালে হাওয়া বইয়ে দিতে যথেষ্ট
এমনই নানা ইস্যুতে তৃণমূলের শক্তি বাড়িয়ে তুলছে বিজেপিই। তৃণমূলের ডাকই প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে ত্রিপুরাবাসীর কাছে। ত্রিপুরা বিজেপিতে যে আড়াআড়ি ফাটল রয়েছে সেখানেও তৃণমূলের জোর বাড়তে শুরু করেছে। বিজেপি ভাঙলে যে তাঁরা তৃণমূলের দিকেই আসবে, তা বলাই যায়। সম্প্রতি সুদীপ রায় বর্মন যে ভাষায় বিজেপির সমালোচনা করেছেন, তাতে তৃণমূলের পালে হাওয়া বইয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সেই সুযোগ হাতছাড়া না করে তৃণমূল ইতিমধ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে, হিম্মত থাকলে সুদীপ রায় বর্মনকে বরখাস্ত করুক বিজেপি।

দেবাংশু-সুদীপ-জয়াদের পর সায়নী, মুখ পুড়ল বিজেপির
তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের ত্রিপুরায় পা রাখা থেকে শুরু করে বিজেপির প্রতিরোধ এবং দফায় দফায় হামলা, হিংসা ছড়ানো মমতা-অভিষেকদের মাইলেজ দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারপর ভোটের সময়ও মিটিং-মিছিল করতে না দেওয়া বিজেপির পক্ষে বুমেরাং হচ্ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা আগেও ত্রিপুরা হাইকোর্ট থেকে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। ত্রিপুরায় সভা করেছিলেন আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে। দেবাংশু ভট্টাচার্য, সুদীপ রাহা, জয়া দত্তদের থানায় আটকে রেখে দমাতে চেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আদালতে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। আবার সায়নীর ক্ষেত্রেও ঘটল একই ঘটনা। সায়নীকে দিনভার থানায় জেরা করে সন্ধ্যার মুখে গ্রেফতারি দেখিয়ে একদিন আটকে রাখা গেলেও পরদিন আদালতে পেশ করতেই জামিন পান সায়নী। ফলে বিজেপির ফের মুখ পোড়ে।

জাতীয় ক্ষেত্রে অন্তত ২০২৪ পর্যন্ত সক্রিয়তা তৃণমূলের
আর শুধু বাংলা ও ত্রিপুরাতেই নয়, ইতিমধ্যে গোয়াতেও সংগঠনের বিস্তার শুরু করে দিয়েছে তৃণমূল। কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লুইজিনহো ফেলেইরোকে যোগদান করিয়েছে তৃণমূল। কংগ্রেসকে ভাঙিয়ে সংগঠন মজবুত করার পাশাপাশি পশ্চিমের এই রাজ্যেও বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য লাগছে মমতার তৃণমূলকে। শুধু তাই নয়, গোয়াতেও তৃণমূল সংগঠন বাড়ানোর পাশাপাশি সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। একইলঙ্গে ভিনরাজ্যের আরও অনেক নেতাকে দেল টেনে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। আর এই সক্রিয়তা তাঁরা অন্তত ২০২৪ পর্যন্ত বজায় রাখতে চাইছে।












Click it and Unblock the Notifications