খাবারের লড়াই থেকে আমেরিকার বিজ্ঞানী, মহারাষ্ট্রের আদিবাসী যুবকের জীবন অনুপ্রেরণা ছাত্র সমাজের
খাবারের লড়াই থেকে আমেরিকার বিজ্ঞানী, মহারাষ্ট্রের আদিবাসী যুবকের জীবন অনুপ্রেরণা ছাত্র সমাজের
এক মুঠো খাবারের জন্য কম লড়াই করতে হয়েনি। সেই তিনি এখন আমেরিকার বিজ্ঞানী। শুধু মাত্র অধ্যাবসা ও কঠোর পরিশ্রমের জেরে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছনো সম্ভব, তার জীবন্ত উদাহরণ ভাস্কর হালামি। একটা সময় না খেয়ে দিনের দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে। সেই দিনটার কথা মনে করলে এখনও শিউরে ওঠেন হালেমি। দুঃস্বপ্ন মনে হয় তাঁর।

মহারাষ্ট্রে আদিবাসী ছেলেটা আমেরিকার বিজ্ঞানী
মহারাষ্ট্রের গদচিরোলির একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম ও প্রাথমিক শিক্ষা ভাস্কর হালেমি। তিনি গ্রামের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি বিজ্ঞানে স্নাতক হয়েছিলেন। স্নাতোকত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রিও গ্রামের কেউ তাঁর আগে পাননি। যে গ্রামে ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে একবেলা খাবার জোটানো কষ্টকর। তাঁদের কাছে পড়াশোনাটা বিলাসিতার সমার্থক শব্দ। কিন্তু পড়া যে কোনও দিন বিলাসিতার সমার্থক শব্দ হতে পারে না, হামেলি জীবন সংগ্রাম সেটাই বোঝায়। বর্তমানে হালেমি আমেরিকার মেরিল্যান্ডের একটি বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সিরনাওমিক্স ইনকর্পোরেটেডের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে একজন সিনিয়র বিজ্ঞানী। সংস্থাটি মূলত জেনেটিক রোগের ওষুধ নিয়ে গবেষণা করেন। নতুন ওষুধ তৈরি করেন।

এক মুঠো খাবারের জন্য লড়াই
মহারাষ্ট্রের গদচিরোলির একটি প্রত্যন্ত থেকে আমেরিকার বিজ্ঞানী হওয়ার পথটা মোটেই মসৃণ ছিল না। বরং বলা যেতে পারে রাস্তাটা খাদ আর কাঁটায় পূর্ণ। সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাাক্ষাৎকারে পুরনো দিনের কথা মনে করতে গিয়ে হালেমি বলেন, আমার বাবা-মা এখনও বিশ্বাস বুঝতে পারেন না, দিনের পর দিন না খেয়ে কীভাবে আমরা বেঁচে ছিলাম। ৪৪ বছরের এই বিজ্ঞানী বলেন, এক মুঠো খাবারের জন্য অনেক লড়াই করতে হয়েছে। স্মৃতি চারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'বছরের কিছু সময় বিশেষ করে বর্ষার সময় আমাদের অবস্থা খুব খারাপ থাকত। সেই সময় কোনও ফসল থাকত না, আমাদের হাতে কোনও কাজ থাকত না।' তিনি বলেন, 'আমরা মহুয়া ফুল রান্না করে খেতাম। এই মহুয়া ফুল খাওয়া বা হজম করা মোটেই কোনও সহজ কাজ ছিল না। সেই সময় আমরা পরসদ (এক ধরনের বিশেষ চাল) সংগ্রহ করতাম। সেগুলো গুঁড়ো করে জল দিয়ে গুলে খেতাম। শুধুমাত্র পেট ভরানোর জন্য। শুধু আমাদের অবস্থা এই রকম ছিল না। আমাদের গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষকে একই রকমভাবে লড়াই করতে হয়েছে।'

দরিদ্র আদিবাসী গ্রামের লড়াই
চিরচাদি গ্রামে ৩০০ থেকে ৪০০ পরিবারের বাস। তিনি বলেন, সেই কষ্ট সহ্য করা যেত না। আমাদের যে ছোট জমি ছিল, তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল উৎপাদন হতো না। তাই বাবা-মা পরিচারিকার কাজ করেন। তিনি বলেন, আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয় যখন বাবা গ্রাম থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে একটি স্কুলে রান্নার কাজ শুরু করেন। বাবা কাজের সন্ধানে বেরিয়েছিল গ্রাম ছেড়ে। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তা জানার আমাদের কোনও উপায় ছিল না। তিন মাস বাদে তিনি যখন ফেরেন, আমরা জানতে পারি তিনি একটি স্কুলে রান্নার কাজ করছেন। তিনি আমাদের সকলকে সেখানে নিয়ে যান।

কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসাই সাফল্যের চাবিকাঠি
তিনি বলেন, বাবা শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন। আমাদের ভাই বোনেদের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। যাতে পড়াশোনা কোনওভাবে বন্ধ না হয়ে যায়, সেই বিষয়ে তিনি জোর দিয়েছিলেন। হালেমি বলেন, তাঁর বাবা-মা কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন বলে তিনি আজকে এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছেন। হালেমি কাসানসুরের একটি আশ্রমিক স্কুল প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। একটি বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে, তিনি যবতমালের সরকারি বিদ্যানিকেতন কেলাপুরে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। গাদচিরোলির একটি কলেজ থেকে বিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর, হালেমি নাগপুরের ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপরে তিনি ২০০৩ সালে নাগপুরের লক্ষীনারায়ণ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রথম থেকে গবেষণা করতে চাইতেন। আমেরিকায় তিনি পিএইচডি করতে যান।

দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে ছাত্রদের অনুপ্রেরণা
হালেমি চিরচাদিতে একটি বাড়ি তৈরি করেছেন। কারণ তাঁর বাবা-মা সেখানে শেষ জীবনটা কাটাতে চেয়েছিলেন। কয়েকবছর আগে তিনি তাঁর বাবাকে হারিয়েছিলেন। ভারতে এলেই হালেমি নিজের প্রাথমিক স্কুল, হাইস্কুলে যান। তিনি বাড়িতে অসংখ্য ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন।












Click it and Unblock the Notifications