সারাভাই থেকে সোমনাথ, চন্দ্রযানের সাফল্য সামগ্রিক ভারতের, কারও একার নয়, কারও থেকে না ছিনিয়েও নেওয়া যাবে না
ভারত বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পা রেখেছে। যা কৃতিত্ব হিসেবে মাউন্ট এভারেস্টের থেকেও উচ্চতম। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা, ইউরোপের তাবড় উন্নত দেশগুলি এতদিন সামর্থ সত্ত্বেও যা করে দেখাতে পারেনি, উন্নয়নশীল ভারত তা করে দেখিয়েছে নিজের দমে। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, শুধু সামর্থ থাকলেই সবটুকু হয় না। চাই সাহস, শৌর্য এবং করে দেখানোর অদম্য ইচ্ছা। সেই সাহস এবং হার না মানা ইচ্ছে ডানাতেই ভর করে ভারত এখন পৌঁছে গিয়েছে চাঁদের অজানা প্রান্তরে। যে কৃতিত্ব কেউ আমাদের থেকে কাড়তে পারবে না কোনওদিন।
যদি চন্দ্রযান মিশনের দিকে তাকাই, তাহলে বলতেই হবে, এটা শুরু হয়েছিল ইসরোর মিশন হিসাবে। তবে ক্রমান্বয়ে তা গোটা দেশকে একাত্ম করে গোটা ভারতবাসীর মিশনে পরিণত করেছে। গোটা ভারত আজ উচ্ছ্বসিত, উদ্বেলিত, আনন্দিত এবং আবেগমথিত। চন্দ্রযানের ল্যান্ডার বিক্রম যখন সফট ল্যান্ডিং করল চাঁদের মাটিতে, সন্ধ্যে ছটা বেজে চার মিনিটের সেই মহেন্দ্রক্ষণে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কলকাতা থেকে কোটা - অসমুদ্রহিমাচল ভারতবাসী কেউ আবেগে আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ উল্লাসে ফেটে পড়েছেন, কারও এই ঘটনা স্বচক্ষে টিভির পর্দায় দেখে গলা ধরে এসেছে। আর এখানেই ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সাফল্য। কারণ তাঁরা এই চন্দ্র অভিযানকে ভারতীয়দের মিশন করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সফল ইসরো
চার বছর আগেও ভারত এভাবেই ইতিহাস ছোঁয়া থেকে এক হাত দূরে থেমে গিয়েছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে চন্দ্রযান ২ মিশন পুরোপুরি সফল হয়নি। তারপরে সাধারণ মানুষ, আমরা ভারতবাসীরা যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ সহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসরোর বিজ্ঞানীরা কিন্তু শান্ত হননি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে তাঁরা কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন তার পরমুহূর্ত থেকে। আর সেই হার না মানা অদম্য ইচ্ছেই তৈরি করেছে আজকের চন্দ্র অভিযানের সাফল্যের সোপান।
ভারতবাসী হিসেবে আমরা কাজের দায়ে কিছুটা বিস্মৃত হলেও মনে রেখেছি চার বছর আগের সেই স্মৃতি। আর সেজন্যই ১৪০ কোটি ভারতীয়র আবেগ ছিল আরও বেশি। কারণ গত কয়েকদিনে যেভাবে আশার জায়গা তৈরি হয়েছিল তাতে ইসরোর বিজ্ঞানীদের থেকেও বেশি আশাবাদী ছিলাম আমরা ভারতীয়রা। কোথাও গিয়ে মনে হচ্ছিল, এবারের চাঁদের মিশন ব্যর্থ হবে না। আমরা পারবই। এবং দেখা গেল, আমরা পেরেছি, একমাত্র আমরাই পেরেছি।
চাঁদের অজানা প্রান্তরে পৌঁছতে আমরাই পেরেছি
২০১৯ এর পরের প্রায় তিনটি বছর কিন্তু আমাদের কাছে সহজ ছিল না। গোটা বিশ্ব মহামারীর মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। লক্ষ লক্ষ সহ নাগরিককে আমরা অকালে হারিয়েছি। বহু পরিবার উজাড় হয়ে গিয়েছে। সেখান থেকে আমরা দেশ হিসেবে, জাতি হিসেবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। তারই কিন্তু প্রতিচ্ছবি আমরা খুঁজে পেতে পারি চন্দ্র অভিযানের মধ্যে। চন্দ্রযান ২ সফল হয়নি। কিন্তু ইসরো হাল ছাড়েনি। ঠিক চার বছরের মাথায় আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছি চন্দ্রযান ৩ এর মাধ্যমে।

ভারতের এই সাফল্য চিরবিস্ময়
মহাকাশ এবং মহাবিশ্ব শুরু থেকেই মানবজাতির কাছে বিস্ময়ের কারণ। অজানাকে জানার বিষয়ে চিরকৌতুহলী মানুষ তাই বারবার বিপদ মাথায় মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে। বিজ্ঞানের যত অগ্রগতি হয়েছে ততই আমরা মহাকাশ, মহাবিশ্ব, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে একের পর এক অজানা, মাথা ঘোরানো বিষয় জানতে পেরেছি। আমাদের সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে প্রিয় চাঁদকে জানাচেনার মধ্যে তাই এক স্বাভাবিক আনন্দ রয়েছে। প্রতিদিন আমরা আকাশে চাঁদ লক্ষ্য করি। আমাদের সবচেয়ে কাছের এবং আমাদের একমাত্র উপগ্রহ। আর সেখানকার সবচেয়ে অন্ধকার দিকে, অজানা অচেনা দক্ষিণ মেরুতে প্রথম দেশ হিসেবে ভারত পৌঁছে গিয়েছে। এর থেকে বড় সাফল্য আর কিছু হতে পারে না।
এই সাফল্য গোটা ভারতের
আজকের এই চন্দ্রযানের সাফল্য কারও একার নয়। আবার কারও থেকে এই সাফল্যকে ছিনিয়েও নেওয়া যাবে না। ১৯৯৩ সালে নরসীমা রাওয়ের সরকারের সময় পিএসএলভি উৎক্ষেপণ সফল হয়নি। ২০০১ সালেও ভারতরত্ন অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারের সময়ও জিএসএলভি উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল। ২০১৯ সালেও এই নরেন্দ্র মোদী সরকারের সময়ও চন্দ্রযান ২ কাঙ্খিত সাফল্য পায়নি। তবে এই প্রত্যেকটি অসফলতাই সাফল্যের সোপান তৈরি করেছে আজকের। আর সেই জন্যই ২০০৮ সালের চন্দ্রযান ১ এবং ২০১৪ সালের মঙ্গলযান কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে। সেই পথে গিয়েই ইতিহাস তৈরি করেছে চন্দ্রযান ৩। বিক্রম সারাভাই যদি ষাটের দশকে এগিয়ে না আসতেন, তাহলে এস সোমনাথের পক্ষে চন্দ্রযানের সাফল্য পাওয়া সম্ভব ছিল না। সেভাবেই গতবারের চন্দ্রযান ২ এর সময় ইসরোর প্রধান এস শিবানের সেদিনের কান্না এবং তারপরের চার বছরের পরিশ্রম না থাকলে বর্তমান ইসরো প্রধান এস সোমনাথ এদিন আনন্দে গা ভাসাতে পারতেন না। তাই এই সাফল্য সামগ্রিকভাবে গোটা ভারতের।












Click it and Unblock the Notifications