রাহুলের ভারত জোড়োর আগে পাঁচটি দীর্ঘ পদযাত্রা হয়েছে, কী ছিল তার ভবিষ্যৎ
ভারত জোড়ো যাত্রা শুরু করেছেন রাহুল গান্ধী। এবারই প্রথম নয়, এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে।
ভারত জোড়ো যাত্রা শুরু করেছেন রাহুল গান্ধী। এবারই প্রথম নয়, এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে। এর আগে পাঁচটি দীর্ঘ পদযাত্রা হয়েছে, সেই পথ চলা পুনরুজ্জীবিত করেছিল রাজনৈতিক কেরিয়ার। এবার ভারত জোড়ো যাত্রায় সাফল্যে কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কংগ্রেস, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।

রাহুলের লক্ষ্য কংগ্রেসকে আলোর সরণিতে ফেরানো
রাহুল গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে ঘুরে দাঁড়াতে পথ চলা শুরু করেছেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত পথ চলার মাধ্যমে কংগ্রেসকে ফের আলোর সরণিতে ফেরাতে চাইছেন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে এটাই রাহুলের মোক্ষম চাল। আর তার আগে বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেসকে উজ্জীবিত করে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।

২০২৪-এর লক্ষ্যে ভারত জোড়ো যাত্রায় রাহুল গান্ধী
কংগ্রেস বর্তমানে এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যে পরিস্থিতি এসেছিল ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সালে। ২০০৪ সালে যখন বিজেপির নিশ্চিত জয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তখন সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসকে অন্ধকারের উৎস থেকে বের করে এনেছিলেন। ২০০৪ সালে জয়ের পর কংগ্রেস ১০ বছর শাসন করেছিল। ২০১৯-এ হারের পর ঠিক সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কংগ্রেস। ২০২৪-এ কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কংগ্রেস। সেই লক্ষ্য নিয়েই ভারত জোড়ো যাত্রায় বেরিয়েছেন রাহুল। এখন তার কী ফল পান তিনি, বলবে ভবিষ্যৎ। তার আগে ফিরে দেখা আগের সব দীর্ঘ পথ চলা কতটা অক্সিজেন দিয়েছিল বিভিন্ন নেতার রাজনৈতিক কেরিয়ারে।

১৯৮৩ সালে চন্দ্রশেখরের পথ চলা
সমাজতান্ত্রিক নেতা চন্দ্র শেখের ১৯৮৩ সালে দীর্ঘ পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে। ৪২০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পদযাত্রায় তিনি চেয়েছিলেন জনগণের আস্থা ফিরে পেতে। কন্যাকুমারী থেকে তিনি পরিক্রমা শুরু করে থেমেছিলেন দিল্লিতে। চার মাসের পদযাত্রায় তিনি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তারপর ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াণ, রাজীব গান্ধীর উত্থান। শেষে রাজীবকে সরিয়ে ভিপি সিংয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা। তারপর ভিপি সিংয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে আট মাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী কুর্সিতে বসেছিলেন চন্দ্রশেখর।

২০০৩-এ ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি
২০০৩ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশে কংগ্রেস তেলেগু দেশম পার্টিকে হারাতে প্রদেশ কংগ্রেস নেতা ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি পদযাত্রাকে আশ্রয় করেছিলেন। তিনি 'প্রজা প্রস্থানম' নামে দুই মাসের পদযাত্রা করেন। রাজ্যের বিভিন্ন জেলাজুড়ে তীব্র গরমেপর মধ্যে ১৫০০ কিলোমিটার হাঁটেন রাজশেখর রেড্ডি। এই জনসংযোগকে পাথেয় করেই তিনি চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টিকে হারিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরেন। ২০০৪ সালে মে মাসে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। তারপর ২০০৯ সালেও জেতেন অন্ধ্রপ্রদেস বিধানসভা নির্বাচনে। এই বছরেই তিনি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

২০১৩ সালের পদযাত্রায় বেরিয়েছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু
ওয়াই এস আর রেড্ডির পদাঙ্ক অনুসরণ করে চন্দ্রবাবু নাইডুও ২০১৩ সালে পদযাত্রায় বের হন। দু-দুবারের পরাজয়ের গ্নানি মুছে ফের জয়ের সরণিতে ফিরতে তিনি রাজশেখর রেড্ডির মতোই কৌশল নেন। চন্দ্রবাবু নাইডু 'ভাস্তুন্না মিকোসাম' (আমি আপনার জন্য আসছি) ব্যানারে ২০৮ দিনের পদযাত্রা করেছিলেন। তার দলকে েই পদযাত্রার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবনের রাস্তা দেখিয়েছিলেন। সেইমতো ২০১৪ সালে এসেছিল সাফল্য। অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্যে বিভাজনের পর জয়ের সরণিতে ফিরেছিলেন চন্দ্রবাবু। ফের অন্ধপ্রদেশে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন তিনি।

২০১৭-য় ওয়াইএস জগনমোহন রেড্ডির পদযাত্রা
২০১৪-য় চন্দ্রবাবু নাইডুর কাছে পরাজয়ের পর ওয়াই এস জগনমোহন রেড্ডি ২০১৭-য় বেরিয়েছিলেন। তার আগে জগনমোহনের সঙ্গে কংগ্রেসের তিক্ততা বেড়ে গিয়েছিল। তার ফলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে নিজের পার্টি তৈরি করেছিলেন। ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি গঠনের পর জগনকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তখন কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার। জগন রাতারাতি গ্রেফতারের পর ২০১৪-য় হেরে গিয়েছিলেন। ২০১৭-য় ৩৪১ দিন ধরে ৩৬৪৮ কিলোমিটার পদযাত্রার পর ২০১৯-এ ফের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি দখল করেছিলেন।

২০১৭-য় দিগ্বিজয় সিং পদযাত্রায় বের হন
মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং ২০১৭ সালে ক্ষমতায় ফিরতে পদযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। নর্মদার তীর থেকে শুরু করেছিলেন ৩৩০০ কিলোমিটার পদযাত্রা। তবে এই পরিক্রমা ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পদযাত্রা হলেও ব্যাপক জনসংযোগ হয়েছিল। তারপর ২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেস সরকার গঠন করে। কিন্তু জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার বিদ্রোহের জেরে সেই সরকারের পতন হয়। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার সমর্থনে ক্ষমতায় ফেরে বিজেপি। তবে এই পদযাত্রা যে কংগ্রেসকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল রাজ্যে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত জোড়ো যাত্রা
এবার সারা দেশে কংগ্রেসকে এক সূত্রে বাঁধতে রাহুল গান্ধী নিলেন তেমনই এক পদক্ষেপ। রাহুল গান্ধী কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত পাঁচ মাসের ভারত জোড়ো যাত্রা শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর যাত্রাই দীর্ঘতম। তিনি এই ভারত জোড়ো যাত্রায় ইতিমধ্যে তামিলনাড়ু, কেরল হয়ে কর্নাটকে প্রবেশ করেছেন। প্রতিটি রা্জযে ব্যাপক জনসংযোগ করছেন তিনি। সাড়া পাচ্ছেন বিস্তর। এখন দেখার এই ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেসকে আলোয় ফেরাতে পারে কি না। কংগ্রেস হারানো জমি ফিরে পায় কি না।

রাহুল গান্ধীকে রাষ্ট্রনায়ক করে তুলবে পদযাত্রা!
এই পদযাত্রার মাধ্যমে রাহুল গান্ধী নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক বা জননেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও করছেন। এখন এর কোনও ফল ২০২৪-এ প্রতিফলিত হয় কি না তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কংগ্রেস এখানেই থেমে থাকছে না ২০২৪-এর আগে ভারত জোড়ো যাত্রার দ্বিতীয় পর্বও শুরু হবে। এবার দক্ষিণ থেকে উত্তর পদযাত্রা হচ্ছে। তারপর পশ্চিম থেকে পূর্ব পদযাত্রাও শুরু হবে। মোট কথা দেশের সমস্ত রাজ্যকে এক সূত্রে জুড়ে দেওয়াই রাহুলের উদ্দেশ্য।












Click it and Unblock the Notifications