ভোট না যুদ্ধক্ষেত্র বোঝা দায়, বাংলা নাকি ইউক্রেন- ছবি দেখে ধরতে পারবেন না
ভোট না যুদ্ধক্ষেত্র বোঝা দায়, বাংলা নাকি ইউক্রেন- ছবি দেখে ধরতে পারবেন না
রুশ হানায় বিধ্বস্ত ইউক্রেন। রাজধানী কিয়েভের ছবিতেই স্পষ্ট কীভাবে ধ্বংসস্তূপ হয়ে উঠেছে একটা দেশ। রাশিয়ার বিমান হানা আর মিসাইলের আঘাতের ক্ষত জ্বলজ্বল করছে পুরো দেশজুড়ে। আর রবিবার বাংলার বুকে যা ঘটল, সেটাও কোনও যুদ্ধের থেকে কম নয়। দুই ছবি পাশাপাশি রাখলে বুঝতেই পারবেন না কোনটা ইউক্রেন আর কোনটা বাংলা।

বাংলায় ছিল ১০৮ পুরসভার ভোট। সেই ভোটকে কেন্দ্র করে রণং দেহি মূর্তি নিয়েছিল বাংলা। বুথ দখল, ছাপ্পা, ইভিএম ভাঙচুর তো ছিলই। তার সঙ্গে বোমাবাজি, মারধর, রক্তপাত- কিছুই বাদ গেল না। বাংলার পুরভোটের ময়দান হয়ে উঠল আদতে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। পুলিশকে দেখা গেল লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করতে।
বিশেষ করে বহিরাগত গুন্ডাবাহিনী আর ভুয়ো ভোটারের দাপাদাপিতে বাংলার ভোট-ময়দান হয়ে উঠল রণক্ষেত্র। পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধও বাধল কোথা কোথাও। আক্রান্ত হলেন বিরোধী প্রার্থীরা। নির্দল প্রার্থীরাও বাদ গেলেন না। উচ্চগ্রামেই ভোট হল। বুথে ভোটারদের ভালো লাইন ছিল, তা সত্ত্বেও বহু ভোটার অভিযোগ করলেন, তাঁদের ফিরতে হয়েছে ভোট না দিয়েই।

এদিন যত বেলা গড়িয়েছে, ততই অশান্তি বেড়েছে। রাজপুর-সোনারপুর পুরসভায় বাম-কংগ্রেস-নির্দল প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করা হয়েছে। বহরমপুরেও কংগ্রেস প্রার্থীর এজেন্টকে মেরে বের করে দেওয়া হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনায় বনগাঁ থেকে ভাটপাড়া, উত্তর দমদম থেকে বসিরহাট সর্বত্রই চড়া মেজাজে ভোট হয়েছে।
কোথাও তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ঝামেলা, কোথাও তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট বা নির্দলের। উত্তর ২৪ পরগনায় নির্দল প্রার্থীকে চ্যাংদোলা করে বুথ চত্বর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে ঘাড়ধাক্কা। জলপাইগুড়িতেও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কংগ্রেস প্রার্থীকে বুথ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে অন্য জেলাতেও।

কাঁথি, ভাটপাড়া আবার বহরমপুর পুরসভা ছিল এদিন প্রচারের আলোয়। কাঁথিতে শুভেন্দু-অনুজ সৌমেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বুথে বুথে অবৈধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রভাব খাটাচ্ছেন ভোটার লাইনে। প্ররোচনাও দিয়েছেন। তারই জেরে উত্তেজনা চরেম উঠেছে। বিজেপির দাবি, তৃণমূল বুথ দখল করে ভোট করাচ্ছে, তারই প্রতিবাদ করেছেন সৌমেন্দু।
কাঁথির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে অখিলগিরির সঙ্গে সৌমেন্দু অধিকারী দেহরক্ষীদের সঙ্গে বচসা হয়। বুথ বুথে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সৌমেন্দুর গাড়ি আটকায় পুলিশ। একই ছবি দেখা যায় উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়ায় বিজেপি সাংসদ অর্জুন সিংকে ঘিরে। অর্জুন সিংও বেআইনিভাবে বুথে বুথে ঘিরে উসকানি দিয়েছেন বলে অভিযোগ। তৃণমূলকর্মীকে চড় মারার অভিযোগও উঠেছে অর্জুন সিংয়ের বিরুদ্ধে।
অর্জুন সিং রাস্তায় নামতেই রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ভাটপাড়া। তৃণমূল একা দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, অর্জুন সিং নামতেই প্রতিরোধ শুরু হয়। তাতে আরও গোল বাধে। অনেক বুথে ইভিএম ভেঙে দেন বিজেপি প্রার্থীরা। অর্জুনের প্ররোচনাতেই এসব ঘটেছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের। পাল্টা অভিযোগে বিজেপি জানায়, তৃণমূল ভুয়ো ভোটার এনে ছাপ্পা ভোট দিচ্ছে। তারই জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এলাকা। সংবাদিকরাও প্রহৃত হয়েছেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর-মজিলপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডে কংগ্রেসের প্রাক্তন চেয়ারম্যানকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। শান্তিপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডে আবার তৃণমূল প্রার্থীকে মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে সিপিএমের বিরুদ্ধে। উত্তর ২৪ পরগনায় ইভিএম ভাঙচুরের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে বিজেপি প্রার্থীকে।

বনগাঁয়া রিগিং-ছাপ্পা-বুথ দখলের অভিযোগে রাস্তা অবরোঘ করেন বিজেপি নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। উত্তর ২৪ পরগনার কামারহাটিতে ব্যাপক বোমাবাজি হয়। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিস লাঠিচার্জ করে। ধুলিয়ান পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ ওঠে। বিশাল পুলিশবাহিনী যায় এলাকায়। পুলিশ যেতেই পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। বোমা ছাড়ার অভিযোগ ওঠে। জখম হন বেশ কয়েকজনকর্মী। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কায় এসডিপিও ওয়াসিম খানের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ার অভিযোগ ওঠে।
তবে মোটের উপর ভোট শান্তিপূর্ণ ছিল বলে দাবি তৃণমূল কংগ্রেসের। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, বাংলার ১০৮টি পুরসভার মোট ২২৭৬টি ওয়ার্ডে ভোট হচ্ছে। ভোট হচ্ছে মোট ১১২৮০ বুথে। তার মধ্যে সমস্ত টিভি চ্যানেল ও সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসা অভিযোগ শতাংশের বিচারে মোট বুথের ১.২ শতাংশ। পুলিশও জানিয়েছে, ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণ। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমরা অ্যাকশন নিয়েছি। কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট যখন হয়েছে তখন কী ফল হয়েছে সেটা আপনারা দেখেছেন। এদিন সার্বিকভাবে ভোট পড়েছে ৭৭ শতাংশ। তবে এই হিসেবে আরও একটু বাড়বে। এখনও চূড়ান্ত নয়।












Click it and Unblock the Notifications