কেন নন্দীগ্রামে হারলেন মমতা, শুভেন্দুর প্রতি সমর্থনের কারণ একনজরে
কেন নন্দীগ্রামে হারলেন মমতা, শুভেন্দুর প্রতি সমর্থনের কারণ একনজরে
খেলা হল, খেলায় জিতলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। কিন্তু কোথাও যেন এক বালতি দুধে এক ফোটা লেবুর রস পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নন্দীগ্রামে (nandigram) শুভেন্দু অধিকারীর (suvendu adhikari) কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (mamata banerjee) পরাজয়ের ঘটনা। এই জয়-পরাজয়ের পিছনে বেশ কিছু কারণ উঠে আসছে।

১৪ রাউন্ডে ধাক্কা শুভেন্দুকে
একদিকে যেমন তৃণমূল ২০০ পার করে দিয়েছে, অন্যদিকে বিজেপিকে তিন সংখ্যায় পৌঁছতে দেয়নি তৃণমূল। কৃতিত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একার। তবে গণনার দিন প্রায় প্রথম রাউন্ড থেকেই নন্দীগ্রামে কম বেশি হলেও এগিয়ে থাছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ১৩ রাউন্ড পর্যন্ত এমনটাই চলছিল। ধাক্কা লাগল ১৪ রাউন্ডে গিয়ে। আর তৃণমূলের পালে হাওয়াও লাগল। ১৬ রাউন্ডের শেষে শুভেন্দু অধিকারী ৬ ভোটে এগিয়ে। আর ১৭ রাউন্ডে গিয়ে জয়।

সব লড়াইয়ের কেন্দ্র নন্দীগ্রাম
২০০৬ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যে ফের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই নন্দীগ্রামে গোলমালের শুরু। সেই সময় ইন্দোনেশিয়ার সালেম গোষ্ঠী-র সঙ্গে রাজ্য সরকারের আলোচনা প্রকাশ্যে আসতেই আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। রাজ্য সরকার ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ করা হবে না, তারপরেও আন্দোলন চলতে থাকে। এরপর ২০০৭-এর ১৪ মার্চে পুলিশের গুলি চালনার ঘটনা। এরপর থেকেই বামেদের রাশ আলগা হতে শুরু করে। যা চলে যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে।

মমতা ও শুভেন্দুর মধ্যে গণ্ডগোল
তৃণমূলের অনেকেই বলেছেন, অনেকদিন ধরেই দুই মত ছিল শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে। ২০২০-র ২৩ জুলাইয়ে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। এছাড়াও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রশান্ত কিশোরের কার্যকলাপ তার ভাল লাগেনি। ফলে দল এবং সরকারি নানা বৈঠক এড়িয়ে যেতে থাকেন শুভেন্দু অধিকারী। এর মধ্যে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বহু তৃণমূল নেতা-কর্মীকে শোকজ করা হয়। দলে শুভেন্দু অধিকারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। আর ২৭ নভেম্বর দলের সঙ্গে সব সম্পর্কে ইতি টানেন শুভেন্দু অধিকারী।
এরপর ১৫ ডিসেম্বর জন্মদিনে কৈলাশ বিজয়বর্গী তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। তাঁকে জেড ক্যাটেগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়। ভবিষ্যত রাজনৈতিক পদ পরিষ্কার হয়ে যায়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে অমিত শাহের সমাবেশে বিজেপিতে যোগদান। শুধু মেদিনীপুরেই নয়, রাঢ়বঙ্গেও শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলকে শক্তিশালী করেছেন।

নন্দীগ্রামে তৃণমূল
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম যে লোকসভা কেন্দ্রের অধীন সেই তমলুকে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেন। ৫৫.৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি লোকসভায় যান। সেরকমই ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী করেছিলেন ফিরোজা বিবিকে। তিনিও জিতে যান সেখান থেকে।
২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আস্থা রেখেছিল শুভেন্দু অধিকারীর প্রতি। সেই শুভেন্দু অধিকারীই তমলুক আসন থেকে ৫৩.৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুবছর পর অর্থাৎ ২০১৬-তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে শুভেন্দু অধিকারীকে দাঁড় করান। শুভেন্দু অধিকারী সেই ভোটে ৬৭.২০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এরপর ২০১৬-রতে লোকসভার উপনির্বাচনে সেই তমলুক থেকেই দিব্যেন্দু অধিকারী নির্বাচিত হন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সারা রাজ্যে ভোট পেলেও নন্দীগ্রামে সেরকম সুবিধা করতে পারেনি।

শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষে
নন্দীগ্রামে ভোটের প্রচারের সময়, শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটকে তৃণমূলের ফিক্সড ডিপোজিট বলে বর্ণনা করেন। পাশাপাশি বাকি ৭০ শতাংশ ভোটদাতাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভোট দিতে আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে অনেকেই বলছেন, শুভেন্দু অধিকারীর এই ধর্মভিত্তিক কার্ড তাঁকে নন্দীগ্রামে জিততে বড় সাহায্য করেছে।
পাশাপাশি ভোটের প্রচারে গিয়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেগম বলেও আক্রমণ করেছেন। তিনি(মমতা) বাংলাকে মিনি পাকিস্তান তৈরি করতে চান বলেও অভিযোগ করেন। যার জেরে তিনি নন্দীগ্রামের ৫৩ শতাংশ হিন্দু ভোটকে একজায়গায় আনতে সক্ষম হয়েছেন। তা সত্ত্বেও প্রচারে বেরিয়ে অনেক জায়গায় প্রতিবাদের মুখে পড়েছে। এমন কী জয়ের পরেও এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবার অনেকে বলছেন এবার নন্দীগ্রামে যে বেশি ভোট পড়েছে, তার জেরে লাভবান হয়েছে বিজেপি।
এই পরিস্থিতিতে যদি নন্দীগ্রাম এক এবং দুই নম্বর ব্লকের ৪৬.১৬ শতাংশ মুসলিম ভোটের সবটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ঝুঁকে পড়ত তাহলে তাঁকে হারানো শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষে কঠিন হতো।
তবে এবারের নির্বাচনটা সরাসরি হয়েছে ধর্মীয় এবং জাতপাতের ভিত্তিতে। কেননা বিজেপি ধরেই নিয়েছিল তারা ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটের বেশিটা পাবে না। তাই তারা হিন্দু ভোটের দিকেই ঝুঁকেছে। যা হয়েছে নন্দীগ্রামেও। এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।












Click it and Unblock the Notifications