হুমকি কেন? ডাক্তারদের তো ভালোভাবেও বলতে পারতেন মুখ্যমন্ত্রী; তাতে কাজও হত

অবশেষে মুখ্যমন্ত্রী কহিলেন। কিন্তু গত কয়েক দিন যাবৎ এনআরএস হাসপাতালে দক্ষযজ্ঞ ঘটার পরে জুনিয়র ডাক্তাররা যে কর্মবিরতি ডেকেছেন, রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক তাকে অন্য চোখে দেখলেন।

অবশেষে মুখ্যমন্ত্রী কহিলেন। কিন্তু গত কয়েক দিন যাবৎ এনআরএস হাসপাতালে দক্ষযজ্ঞ ঘটার পরে জুনিয়র ডাক্তাররা যে কর্মবিরতি ডেকেছেন, রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক তাকে অন্য চোখে দেখলেন। রোগী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ডাক্তারদের উপরে হামলা এবং পরিবহ মুখোপাধ্যায় বলে যে ইন্টার্ন-এর মাথায় গুরুতর আঘাত, তাতে মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ নজর দিলেন না। উল্টে, ডাক্তারদের শাসিয়ে বললেন এখুনি কাজে যোগ দিতে, অন্যথা তিনি বড়সড় পদক্ষেপ নেবেন তাঁদের বিরুদ্ধে। শোনালেন লাখ লাখ টাকা দিয়ে ডাক্তার তৈরীর গল্পও। অভিমানের সুরে বললেন, সেই ডাক্তারদের 'বেইমানি' করার কথাও। আবার অভিযোগও করলেন এই বলে যে ডাক্তাররা ধর্ম দেখে চিকিৎসা করছে। অর্থাৎ, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই বিজেপিকেই নিশানা।

কিন্তু এসএসকেএম-এ মুখ্যমন্ত্রী তাঁর রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ডাক্তারদের কয়েক ঘন্টা সময় দিলেও এনআরএস-এ বিক্ষোভকারী ডাক্তাররা কিন্তু টলেননি। উল্টে তাঁদের দাবি, অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে তাঁর হুঁশিয়ারির জন্যে।

অর্থাৎ, অবস্থা এখন আরও বিগড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তারদের উদ্দেশে বলেন যে জরুরি পরিষেবা ইচ্ছে মতো বন্ধ রাখা যায় না; এব্যাপারে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশও রয়েছে। আর যদি এই প্রতিবাদ চলে, তাহলে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন। চার ঘন্টা সময় দেন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তারদের।

ডাক্তারি পরিষেবা জরুরি সবাই জানে কিন্তু ডাক্তারদের সমস্যা কে দেখবে?

ডাক্তারি পরিষেবা জরুরি সবাই জানে কিন্তু ডাক্তারদের সমস্যা কে দেখবে?

ব্যাপার হচ্ছে, নীতিগতভাবে মুখ্যমন্ত্রী কিছু ভুল হয়তো বলেননি; ডাক্তারদের পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া মানে জীবনের অধিকার খর্ব হওয়া। এই কর্মবিরতি এক অন্যায়ের জবাবে আরেক অন্যায় করারই সামিল। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও ঠিক যে দিনের পর দিন চিকিৎসকদের উপরে হামলা, প্রহারের ঘটনাও বন্ধ হওয়া দরকার এক্ষুনি। ডাক্তাররাও মানুষ এবং অনেক শিক্ষা, ত্যাগের পরে তাঁরাও সেই যোগ্যতা লাভ করেন। তাঁদেরকে কুকুর-বিড়ালের মতো মারধর করাটাও কোনও শিক্ষিত সমাজের কাজ নয়। আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বটিও অবজ্ঞা করা চলে না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বার্তা দিতে পারতেন আরও ভালোভাবে। ডাক্তারদের বিশেষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করতে পারতেন এই বিষয়ে। চিকিৎসকদের গায়ে যাতে কেউ ফের হাত তোলার সাহস না পায়, সেই কঠোরতাও দেখাতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেসবের ধার ধারলেন না। মাইক হাতে বিক্ষোভকারী ডাক্তারদের পাল্টা স্লোগান দিতে থাকলেন এবং মাথা গরম করে ফেললেন। মুখে বললেন ঠিকই যে তিনি সব পক্ষের কথা শুনেই এই ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন, কিন্তু ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি আসলে জনতারই পক্ষে এবং তাঁর হুঁশিয়ারিতে ডাক্তার-ঠেঙ্গানো পার্টির মনোবল যে কিছুটা বাড়ল তাতে কোনওই সন্দেহ নেই।

ডাক্তারদের পক্ষ নিলে ভোটের বাজারে তা নিস্ফল আবেদন হত মাত্র

ডাক্তারদের পক্ষ নিলে ভোটের বাজারে তা নিস্ফল আবেদন হত মাত্র

আসলে মমতা জানেন যে ডাক্তারদের নিরাপত্তার পক্ষ নিয়ে কথা বলাটা রাজধর্মের হিতে গেলেও ভোটের বাজারে তা নিস্ফল আবেদন মাত্র। একদিকে তিনি হিন্দি বলয়ে পিটিয়ে হত্যার বিরোধিতা করছেন; সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলছেন কিন্তু অপরদিকে নিজের রাজ্যে একের পর এক চিকিৎসক প্রহারের ঘটনার পরেও কোনও প্রশাসনিক তৎপরতা দেখাচ্ছে না তাঁর সরকার। তাহলে কতটা আলাদা হয়নি বলয়ের রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের? শুধু মৃত্যুর?

সেই 'আমি মানুষের পক্ষে'-র পপুলিজম-এর রাজনীতি

সেই 'আমি মানুষের পক্ষে'-র পপুলিজম-এর রাজনীতি

আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্রাজ্যের ভিত্তিই হচ্ছে জনপ্রিয়তাবাদ এবং সেই ফর্মুলার ভিত্তিই হচ্ছে যা কিছু চমক লোকের নজর কাড়ে তাই করা। ডাক্তারদের উপরে হামলার ঘটনাটি যথেষ্ট জটিল একটি বিষয়ে এবং আইনের সাহায্য ছাড়া সোজাসুজি এর শিকড়ে পৌঁছনো সহজ নয়। কারণ ডাক্তারদের এবং চিকিৎসা-রোহিত রোগীদের কারও অভিযোগই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু মমতার কাছে ডাক্তাররা হচ্ছেন তাঁর নিজের পপুলিজম-এর নম্বরটি বাড়িয়ে নেওয়ার অবলম্বন মাত্র। সংখ্যালঘু ডাক্তারদের হয়ে কথা বলতে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ রোগী অর্থাৎ তাঁর বৃহত্তর ভোটব্যাঙ্ককে তিনি চটাবেন না কোনওভাবেই। আর এ ব্যাপারে জরুরি পরিষেবার মতো মস্ত কারণ দর্শানোর সুবিধে তো রয়েছেই। তাতে জনসাধারণের আশীর্বাদধন্যা হবেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। আর তার সঙ্গে যদি একটু বিজেপি-বহিরাগত-ধর্মের নামে চিকিৎসা ইত্যাদি অভিযোগের ফিরিস্তি খাড়া করে দেওয়া যায়, তাহলে তো কেল্লাফতে।

মুখ্যমন্ত্রী আজকে কমবয়সী ডাক্তারদের স্নেহভরে কাজে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারতেন; তাতে হয়তো কাজও হত। কিন্তু সংঘাতের পথ নিয়ে তিনি এই সমস্যার সমাধানের পথটি আরও কঠিন করে দিয়ে গেলেন।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+