নন্দীগ্রাম দ্বৈরথে মমতার পাল্লা ভারী অনেকটাই
নন্দীগ্রাম দ্বৈরথে মমতার পাল্লা ভারী অনেকটাই
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর বিধানসভা এলাকায় গিয়েছিলাম। ওখানকার মাগুরিয়া গ্রামে এইসময় একটা কালীপুজো হয়। খুব বড় কালীপুজো।এখানকার বার্ষিক মহোত্সব। গ্রামের যাঁরা বাইরে কাজকর্ম করেন, তাঁদের বেশিরভাগই এইসময় বাড়ি ফিরে আসেন। সাত-আট দিন ধরে মেলা হয়। কীর্তন, বাউল গান, যাত্রার আসর বসে। সব বাড়িতেই আত্মীয় স্বজনের মেলা। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের নানা দিক থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের কয়েকজন এক জায়গায় হলেই আলোচনার বিষয় আসন্ন ভোট। আর তার কেন্দ্রবিন্দু নন্দীগ্রামে মমতা এবং তাঁর একসময়ের অন্যতম সেনাপতি শুভেন্দু অধিকারীর দ্বৈরথ। কী হবে? মমতা কি এখান থেকে জিতেই আবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন, না কি শুভেন্দু বিরাট ব্যবধানে মমতাকে হারানোর যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, তা রাখতে পারবেন!

কোন মন্ত্রের ভরসায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু
মঙ্গলবার মমতা নন্দীগ্রামে স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের নিয়ে কর্মীসভা করলেন। বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেন। যদিও গোটা রাজ্যে তিনি লড়ছেন। সব প্রার্থী তাঁরই প্রতিনিধি। কিন্তু এটাই একমাত্র কেন্দ্র যেখানে প্রার্থী তাঁর কোনও প্রতিনিধি নয়, তিনি নিজেই লড়ছেন। এদিনের কর্মীসভা প্রায় জনসভায় পরিণত হয়েছিল। মমতার জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠবে না। নন্দীগ্রামে তাঁর কর্মীসভা কিংবা জনসভা দেখে মনেই হবে না যে তিনি এখানে কোনওভাবে হারতে পারেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে যে জনতা তাঁকে দেখার জন্য আকুল হয়ে ওঠে, সেই জনতা তাঁকে হারিয়ে দেবে এমনটা ভাবতেই পারা যায় না। এই মমতাকে নন্দীগ্রামে পঞ্চাশ হাজার ভোটে হারাতে না পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন বলে যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন শুভেন্দু। মমতার জনপ্রিয়তার নিরিখে তা নিষ্ফল প্রমাণিত হতে বাধ্য। তাহলে কি অতি উদ্দীপনায় পাগল হয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু! নাকি তাঁর রাজনৈতিক অংক অন্যরকম। মমতার স্নেহধন্য সেনাপতি হয়ে বহু লড়াই করেছেন তিনি। এবং সাফল্যও পেয়েছেন। সেই সাফল্য যদি তাঁর মাথা ঘুরিয়ে না দিয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবেই অন্যরকম ভোট করানোর মন্ত্র এবং প্রক্রিয়া তাঁর জানা আছে। সেই অঙ্কেই তিনি মমতাকে হারানোর মতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন।

বেশিরভাগ লোকেরই ধারণা নন্দীগ্রামে মমতাই জিতবেন
কিন্তু ওই এলাকার লোকজন তো বটেই সারা রাজ্যের মানুষজন দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছে মমতাই ওখানে জিতবেন। মাগুরিয়ার মেলায় নন্দীগ্রাম থেকে একজন এসেছেন। ভাগ্যচক্র বিক্রির ব্যবসা করেন। মেলায় মেলায় ঘুরে বেড়ান।তাঁর ধারণা শুভেন্দু পাগলের মতো এলোমেলো কথা বলছেন। বাস্তব অবস্থা নিশ্চয়ই বোঝেন শুভেন্দু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী। ওখানে তৃণমূলের অন্য কেউ দাঁড়ালে হয়তো শুভেন্দুর অ্যাডভান্টেজ থাকত। কারণ সত্যিই নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন তাঁকে বিরাট জনপ্রিয়তা দিয়েছে ওখানে। কিন্তু যখন তিনি এই আন্দোলন করেন তখন তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৈনিক। তাঁর নেত্রী মমতা। তিনি এখন দল ছেড়ে অন্য দলে গিয়ে নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সাফল্য দাবি করলে কী হবে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন তাঁর সেইসময়ের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ভদ্রলোক হয়তো বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে নন্দীগ্রামের জয়-পরাজয়ের কথা ভাবছেন। কিন্তু শুধু বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে ভোটে জয় পরাজয় যে নির্ধারিত হয় না তা এখন সকলেই জানেন। ভোট করাতে হয়। সে কাজটা কিন্তু শুভেন্দু ভালোই পারেন বলে এর আগে অনেক প্রমাণ দিয়েছেন।

কী বলছেন মানুষ
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের অনেকের সঙ্গেই এই বিষয়টা নিয়ে কথা হল। তাঁরা বলছেন ঠিকই, ভোট এখন করাতে হয়। প্রার্থী হিসেবে শুভেন্দুও কম জনপ্রিয় নয়। কিন্তু তাঁকে যে ওখানকার ভোটাররা জেতাবে, তা কোন স্বার্থে। যতই বিজেপি নেতারা বাগাড়ম্বর করে এরাজ্যে ক্ষমতা দখল করার স্বপ্ন দেখান না কেন তা বাস্তবে পরিণত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা এখনই আছে বলে তাঁরা মনে করেন না। যদিও মমতার দলের মধ্যেই অনেক ক্ষোভ বিক্ষোভ রয়েছে। অনেকেই এই ভোটে যা আশা করেছিল তা না পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে। তাহলেও সেটা এখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো তীব্র হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া এই ক্ষোভ অল্পদিনেই স্তিমিত যাবে। কারণ, তারা জানে তৃণমূল ক্ষমতায় না এলে তাদের ক্ষোভ দেখানোরও জমি থাকবে না। আর বিজেপিতে গেলে যে তাদের অবস্থা আরও করুণ হবে তাও তারা ভালোভাবে জানে।
রাজ্যের একটা বিরাট অংশের সাধারণ মানুষও মমতার প্রতি এখনো অনেকটাই ভরসা রাখছেন। কাজেই এই ভোটে মমতা ক্ষমতাচ্যুত হচ্ছেন, তা নয়। তাছাড়া দাদার অনুগামীদের হাওয়া তার দল ছাড়ার আগে যতটা দেখা গিয়েছিল দল ছাড়ার পর কিন্তু অতটা দেখা যাচ্ছে না। আর এ রাজ্যে যদি বিজেপি ক্ষমতায় না আসতে পারে তাহলে শুভেন্দু কে জিতিয়ে লাভ কি? বরং মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র হিসেবে নন্দীগ্রাম বিশেষ গুরুত্ব পাবে।












Click it and Unblock the Notifications