আদর্শ নয়, এবারের ভোটে ছাপ ফেলতে কৌশলই অস্ত্র বামেদের কাছে

এরকম নক্ষত্রখচিত নির্বাচন এর আগে বাংলা দেখেছে বলে মনে পড়ে না। নক্ষত্র বলতে শুধুমাত্র সেলুলয়েডের পর্দার নায়ক-নায়িকারা নন, নির্বাচনের মঞ্চে রাজনীতির তাবড় কুশীলবেরা একযোগে চোখের সামনে চোখা চোখা সংলাপ আওড়াচ্ছেন।

এই হাই ভোল্টেজ নাটকে অপেক্ষাকৃত ছোট ভূমিকায় নেমেছে বাম- কংগ্রেস জোট কারণ তারা আপাতত মঞ্চ কাঁপাতে নামেনি, তারা নির্বাচনের পর উল্লেখযোগ্য চরিত্রে নামতে চায়। তারা সরকার গড়তে আগ্রহী নয়, তারা চাইছে সরকার গঠনে অনুঘটের ভূমিকা পালন করতে। আর সেই জন্য তারা নিজেদের আসন সংখ্যা এমন একটি স্তরে নিয়ে যেতে চাইছে যাতে পরবর্তী সরকার তাদের সমর্থন বিনা গঠন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তারা পরবর্তী সরকারে যোগ দিতে ইচ্ছুক নয় কিন্তু চাইছে বাইরে থেকে তাদের সমর্থন ব্যতিরেকে যেন সরকার গঠন সম্ভব না হয়। এই অঙ্ক কষতে গিয়ে প্রাচীন বাম আদর্শের সামনে প্রণিপাত হওয়ার চেয়ে তাদের কাছে অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাথা তুলে দাঁড়ানো। পক্ককেশ-দলের তকমা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে তারা উঠেপড়ে লেগেছে। দলে তাজা রক্তের আমদানি করতে গিয়ে অতীতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পাশে সরিয়ে রেখে টুম্পা সোনা গানেও তাদের এখন আর আপত্তি নেই।

পিছনের সারিতে বামেরা

পিছনের সারিতে বামেরা

দিদির কাছে দীর্ঘদিনের লালিত জমিদারি হারিয়ে প্রায় বছর দশেক আগে বামেরা সেই যে চায়ের ঠেকে পিছনের বেঞ্চে বসে পড়েছিল সেখান থেকে সামনের সারিতে আসার সুযোগ বা সাহস তারা কিছুতেই পাচ্ছিল না। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তারা তেড়েফুঁড়ে উঠতে গিয়ে দিদির পোষ্য সমর্থক এবং কর্মীদের চোখরাঙানির কাছে নতজানু হয়ে পড়েছিল। সেসময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাপটে রাজ্যের সমস্ত বাঘে গরুতে একঘাটে জল পানে বাধ্য ছিল। পরে অবস্থা পাল্টায়। বাজারে হম্বিতম্বি করে নামে ভারতীয় জনতা পার্টি। তৃণমূলের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শুরু করে গোবলয়ের হাট্টাকাট্টা ভাজপা পার্টি। নিচু তলার বাম কর্মী, সমর্থকরাও হালে পানি পায়। তার ফলও মেলে অচিরেই। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বামেদের মেহনতী মানুষের ফসল গিয়ে ঢোকে বিজেপির গোলায়। বামেদের কায়া শীর্ণতর হয় এবং বিজেপি আড়েবহরে স্ফীত হয়।

২০১৬ সালের পর থেকে আরও পতন

২০১৬ সালের পর থেকে আরও পতন

২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে যেখানে বামেদের ভোট ছিল ৩৪ শতাংশের কাছাকাছি সেখানে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় সাত শতাংশের আশেপাশে। অন্যদিকে বিজেপির ভোট একলাফে ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। দক্ষিণবঙ্গে অবাঙালি শ্রমিকদের সিংহভাগ বামেদের ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে নাম লেখায়। সকলেরই স্মরণে আছে আসানসোল-দুর্গাপুর এবং ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলকে মাঠে ভাল করে খেলতেই দেয়নি বিজেপি। বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার মতো অনগ্রসর এলাকায় দরিদ্র জনজাতিদের মধ্যে বামেদের বড় শরিক সিপিএমের একাধিপত্য মুখ থুবড়ে পড়ায় সেখানেও পতপত করে উড়েছে গৈরিক নিশান। আর উত্তরবঙ্গে তো বামেদের ভোট হাওয়ায় উবে গিয়েছে।

কেন হাতছাড়া বাম ভোট?

কেন হাতছাড়া বাম ভোট?

একদিকে সেখানে যেমন তৃণমূলের হাত থেকে বাঁচতে বাম সমর্থকরা দলে দলে বিজেপির খাতায় নাম লিখিয়েছে তেমনই বিজেপির অনুপ্রবেশ বিরোধী ভাষণ শুনে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছে ভোটারদের বিশাল অংশ। সবার উপরে ছিল নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীর 'ভাইয়োঁ অউর বহনৌ' ডাক। সে ডাক উপেক্ষা করতে পারেনি সিংহভাগ ভোটার। এই পরিস্থিতিতে এরাজ্যে দুই প্রতিস্পর্ধী দলের মাঝে বামেরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অতএব এবার বাঁচার তাগিদেই কৌশল বদলাতে হয়েছে বামেদের।

কৌশলী বামেরা

কৌশলী বামেরা

আঙুলের কড় গুনে তারা দেখেছে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি আসন পেলে তারা সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারবে। কাজেই আগামী নির্বাচনে কৌশলের কাছে হার মেনেছে আদর্শ। চটুল গানের প্রচার থেকে বিনোদন জগত, কংগ্রেস থেকে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি, কোনও কিছুতেই না নেই তাদের। এত কিছু করেও দেখা যাচ্ছে জনমত সমীক্ষায় তাদের কপালে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের বেশি ভোট জুটছে না তাদের। এসব জনমত সমীক্ষার ফল প্রকাশ্যে উড়িয়ে দিলেও তারা বুঝে গিয়েছে নির্বাচনের আগে তাদের আরও বেশি হাওয়া তুলতে হবে। শুধু এক ব্রিগেড সমাবেশে তা সম্ভব নয়। সে হাওয়া যদি তারা না তুলতে পারে তাহলে আখেরে লাভ তুলবে বাংলার ঘরের মেয়ে।

বাম বাড়লে ক্ষতি বিজেপির

বাম বাড়লে ক্ষতি বিজেপির

গতবারের বামেদের খোয়া যাওয়া ভোটের সামান্য অংশ ফের বামেদের কোষাগারে ঢুকলে তা ফিরবে বিজেপির ঘর থেকে। সুতরাং তাতে ক্ষতি মোদী-শাহ জুটির ঠিকই কিন্তু লাভ পিসি-ভাইপো সরকারের। আর বামেদের হাতে শুধু পড়ে থাকছে পেন্সিল। অতএব অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই তাদের শেষ হচ্ছে না। ভোটের হার বাড়াতে বামেদের রক্ত-ঘামের লড়াই এখনও অনেক বাকি।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+